গুজব এবং পদ্মাসেতু


90 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
গুজব এবং পদ্মাসেতু
জুলাই ১২, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

গুজবভিত্তিক ঘটনা থেকে অপ্রীতিকর অবস্থা; এমনকি খুনখারাবি! ভিত্তিহীন ও অনেকটা প্রচলিত এমন মিথ্যার প্রচারণায় এবার যোগ হয়েছে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা কেটে তা ব্যবহারের গুজব।

গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও এ নিয়ে সরব। অনেকের ইনবক্সেই সতর্ক থাকতে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছেন কেউ কেউ। বিভিন্ন গ্রুপ এবং অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে এসব গুজব।

দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনের ঘটনায় বলা হচ্ছে– পদ্মাসেতুতে মাথা লাগানোর জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কোনও কোনও এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখলে সেতুর জন্য মাথা সংগ্রহকারী হিসেবে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রাণহানির খবরও পাওয়া গেছে এমন ঘটনায়।

সেতু কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ বলছে, এসব অভিযোগ নিতান্তই ভিত্তিহীন ও গুজব। সবাইকে সচেতন থাকার জন্য আহ্বান করেছে তারা।

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় সেতুর মূল নির্মাণ কাজ ও নদী শাসন কাজের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমেই সেতুর মূল কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

পদ্মাসেতুতে মানুষের রক্ত বা মাথা লাগার গুজবের শুরু গত বছরের আগস্টে। ওই সময় রাজবাড়ী সদর উপজেলায় ১৫ দিনের মধ্যে তিন নারী ও এক শিশুকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পদ্মা সেতুর জন্য রক্ত লাগবে বলে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে জানিয়ে অপপ্রচার চালানো হয় তখন।

সম্প্রতি আবার হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়ে পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগার গুজব। বিভিন্ন স্থানে বলা হয়, সেতুতে মানুষের মাথা লাগছে; এজন্য নানা জায়গায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।বিষয়টি নিয়ে গণপিটিনিতে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া গুজবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কেউ কেউ। রঙ মাখিয়ে বিভিন্ন ছবি আর কথা যোগ করে বিভিন্ন মহল এ গুজব ছড়াচ্ছে। ইউটিউবেও ছড়িয়ে এমন গুজব।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে পদ্মাসেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর ঘটনায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পদ্মাসেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত চারজনেক আটক করা হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে তাদের আটকের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান।

তিনি জানান, পদ্মাসেতু নিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারজনকে আটক করা হয়েছে। শহীদুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবককে নড়াইল থেকে র‌্যাব-৬, আরমান হোসাইনকে (২০) চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব-৭, ফারুককে (৫০) মৌলভীবাজার থেকে র‌্যাব-৯ এবং হায়াতুন নবী (৩১) নামে একজনকে কুমিল্লা থেকে র‌্যাব-১১ এর সদস্যরা আটক করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে (নিরাপত্তা আইন) সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়েছে।

তবে যেকোনও দিক দিয়ে চিন্তা করলেই বোঝা যায় পদ্মাসেতুতে মাথা লাগার গুজবের কোনও ভিত্তি নেই। কোনও বিশেষ গোষ্ঠী হয়তো সুযোগ নিয়ে এমন প্রচারণা চালাচ্ছে। এসব বিষয়ে সচেতনতার আহ্বান জানিয়েছেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।

গত মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পরিচালক মো.শফিকুল ইসলাম গুজবের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব। এর কোনো সত্যতা নেই।’

এমন অপপ্রচার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ জানিয়ে তিনি এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করেন।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার সমকালকে বলেন, পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগার যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে তা ভিত্তিহীন। এমন গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। দেশে অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর লক্ষ্যে এমন গুজব রটানো দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি বলেন, ফেসবুসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যারা এসব গুজব ছড়াচ্ছে তাদের খুঁজে বের করতে এবং আইনের আওতায় আনতে দেশব্যাপী পুলিশের বেশ কয়েকটি দল তৎপরতা শুরু করেছে।

এমন গুজবের পেছনে দেশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারা কে দায়ী করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী।

সফলভাবে সেতু তৈরি করতে পিলারের নিচে মানুষের মাথা দিতে হবে – আবহমান কাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই কুসংস্কার নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বেশকিছু গল্পও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে,পদ্মা সেতুর বিভিন্ন বিষয়কে বিতর্কিত করতে এবং সেতুর নির্মাণকাজ পণ্ড করতে একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে।

শুধু পদ্মাসেতু নির্মাণ নিয়ে নয়; গত কয়েক বছরে দেশে গুজব ছড়িয়েছে নানা বিষয় নিয়ে। এ নিয়ে নানা সময় তাণ্ডবও চলেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থী নিহতের গুজব ছড়ানোর পর হামলা চালানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে হুমকি এবং কর্তৃপক্ষকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয় ওই গুজবে।

যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে নাশকতা চালানো হয়েছিল ২০১৩ সালের মার্চে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ওইসব তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা হয়েছে।