‘গ্রাম আদালত স্বল্প খরচে অল্প সময়ে ন্যায় বিচার পাওয়ার জনপ্রিয় মাধ্যম’


408 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘গ্রাম আদালত স্বল্প খরচে অল্প সময়ে ন্যায় বিচার পাওয়ার জনপ্রিয় মাধ্যম’
মে ২৯, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥
বাংলাদেশ গ্রাম আদালত দিনের পর দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তৃণমূল পর্যায়ের এই আদালতে দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে নারী এবং বিভিন্ন পেশার পিছিয়ে পড়া সাধারন মানুষ স্বল্পতম সময়ে খুব কম খরচে বিচার লাভ করছেন। এই বিচার ব্যবস্থাকে আরও বেগবান করতে আরও কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার বিকালে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘গ্রাম আদালতকে কার্যকরিকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গনমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক পরামর্শ সভায় আরও জানানো হয়, দেশের ২৭টি জেলায় ১২৮টি উপজেলার ১০৮০ টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প দ্বিতীয় পর্যায় এখন বেশ সক্রিয় অবস্থায়। গত জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাস পর্যন্ত এসব আদালতে ৩২ হাজার ২৬৪টি মামলা এসেছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২০ হাজার ৫৬০টি। অন্য মামলাগুলি চলমান রয়েছে জানিয়ে এতে বলা হয় মামলার রায় বাস্তবায়ন হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৫টি। এর মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা ১৭ কোটি ৬ লাখ টাকারও বেশি ক্ষতিপূরন লাভ করেছেন বলে পরামর্শ সভায় উল্লেখ করা হয়। এতে আরও জানানো হয় মামলার আবেদনকারীদের মধ্যে ১০ হাজার ৫৮৫ জন নারী রয়েছেন। তারা বিচার লাভ করেছেন। নানাভাবে গ্রাম আদালত সম্পর্কে ৪৩ লাখ ৫৬ হাজারেরও বেশী মানুষকে সচেতন করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
পরামর্শ সভায় আরও বলা হয়, সাতক্ষীরা জেলার তালা, আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের এই প্রকল্প চালু হয়েছে। সেখানে ১৬২৭টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৪১টি। এতে আবেদনকারী নারীর সংখ্যা ছিল ৩৩৯ জন। এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরে পরামর্শ সভায় বলা হয়, সাধারন মানুষকে সহজেই গ্রাম আদালত খুব স্বল্পতম সময়ে সুবিধা দিতে পারে। একে আরও কার্যকর করতে হলে সবাইকে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আদালতের কাঠামো গঠিত হয় উল্লেখ করে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারের রায় নিষ্পত্তি হয়। সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না করতে পারলে তা বাতিল হয়ে যায়। ন্যায়বিচার, শান্তিশৃংখলা রক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালত আরও ভূমিকা রাখতে পারে বলেও পরামর্শ সভায় জানানো হয়।
সাতক্ষীরার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শাহ আব্দুল সাদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন। এতে অতিথি হিসাবে আরও বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরিনা আক্তার ও প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ। পরামর্শ সভায় বাংলাদেশের গ্রাম আদালতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা সমন্বয়কারী এসএম রাজু জোবেদ। স্বচ্ছতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্বপূর্ন মাধ্যম গ্রাম আদালত। এই মাধ্যমকে শক্তিশালী করতে গনমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে বলে জানানো হয়।
জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যে বলেন, কোনো কিছুর কার্যকারিতা না থাকলে তার গুরুত্বও থাকে না। গ্রাম আদালতের সুফল তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার আমাদের যেখানেই নিয়ে যাক সব শেষে মানুষের হাত লাগবেই। সমাজে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য দিয়ে মামলা জটিল করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রবনতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে যেমন বাদী বিবাদী দুই পক্ষের ব্যয় বৃদ্ধি পায় তেমনি তা নিষ্পত্তি করতেও বহু ভোগান্তির পাশাপাশি অনেক সময় লাগে। এজন্য গ্রাম আদালতকে আরও বেগবান করতে পারলে তৃণমূল পর্যায়ে শান্তিশৃংখলা রক্ষা সহজ হয়। বিশ্বের বেশী আইনের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আইন না মানার এক ধরনের সংস্কৃতি রয়েছে। আইনকে কেবলমাত্র কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তার প্রয়োগকে বাস্তবায়ন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আমাদের অভিভাবক প্রবীনরা গ্রাম এলাকায় উল্লেখযোগ্য সফলতার সাথে গ্রামীন সমাজের নানা বিচার আচার করেছেন এবং তা গ্রহনযোগ্যতা লাভ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে সর্বগ্রাসী অবক্ষয় আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে সকলকেই কাজ করতে হবে। প্রচারেই প্রসার উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এ ব্যাপারে গনমাধ্যমকে আরও ভূমিকা নিতে হবে। তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের ঘটনায় মিথ্যাকে সত্য এবং সত্যকে মিথ্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমই রয়েছে। ফলে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ খুব কম খরচে বিচার লাভ করতে পারেন।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরিনা আক্তার বলেন, আইনি কাঠামোর মধ্যে গ্রাম আদালতের বিচার খুব সহজ এবং ঝামেলামুক্ত। আদালত ও পুলিশের কাছে আসার আগেই স্থানীয় পর্যায়ের বিষয়গুলি নিষ্পত্তি করতে ব্যয় যেমন কম তেমনি সব মানুষ সহজেই তা লাভ করতে পারেন। গ্রাম আদালতগুলিকে আইনগতভাবে আরও শানিত করা গেলে গ্রামের মানুষ আরও লাভবান হবেন। সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে স্থানীয় সরকার উপপরিচালক শাহ আব্দুল সাদী বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আদালত গঠিত হয়ে থাকে। শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির বড় সুযোগ গ্রাম আদালত। এই আদালতে ন্যায়বিচার লাভ করা অনেকটাই সহজ। তিনি বলেন, অপরাধের ধারা অনুযায়ী বিচার হবে। এতে দেশের গনমাধ্যম ভূমিকা রাখলে তা আরও বেগবান হতে পারবে। প্রকল্পের ফ্যাসিলিটেটর এসএম রাজু জোবেদ বলেন, দরিদ্র মানুষ, নারী এবং বিপদাপন্নরা প্রতিকার চাইতে পারেন। স্বল্প খরচে স্বচ্ছতার সাথে তারা গ্রাম আদালতে বিচার লাভ করছেন। প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ বলেন, গ্রামীন বিচারে মিথ্যা তথ্য প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থরা ন্যায়বিচার পেতে পারেন। বিচারকদের সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থেকে বিচার করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে আদালত সমূহে মামলার জট যেমন কমবে তেমনি গ্রামে শান্তির সুবাতাস বইবে। উন্মুক্ত আলোচনায় আরও অংশগ্রহন করেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী, সাবেক সাধারন সম্পাদক মিজানুর রহমান, সাবেক সাধারন সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল, সাবেক সাধারন সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, বিভিন্ন গনমাধ্যমের প্রতিনিধি এ্যাড. অরুন ব্যানার্জী, মোঃ আবুল কাশেম, গোলাম সরোয়ার, দিলীপ কুমার দেব, ফারুক মাহবুবুর রহমান, আহসানুল হক রাজীব ,মো. সাখাওয়াতুল্লাহ এবং কালিগঞ্জের মৌতলা ইউপি চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে বিচারের নোটীশ গ্রহন না করা, প্রভাবশালীদের বিচারের আওতায় আনার অন্তরায়, সম্পদের মূল্য বৈষম্য, বিচারকদের ভোটের রাজনিিত , বিচারকদের নির্বাচন রাজনীতি, বিচারকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিচারে নিরপেক্ষতা বজায়ে অন্তরায়সহ নানা বিষয়। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয় পরামর্শ সভায়।
পরামর্শ সভা চলাকালে গ্রাম আদালতের সুফল তুলে ধরে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ফয়লাবাদ গ্রামের দরিদ্র গৃহবধূ ফজিলা খাতুন তার ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বলেন, ‘আমার একটি ছাগল হারিয়ে গিয়েছিল, আমি ইউনিয়ন পরিষদে ১০ টাকা জমা দিয়ে বিচার চেয়েছিলাম। বিচারে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আমি ছাগলটির দাম পেয়েছি। এতে আমি সন্তুষ্ট।’ ফজিলা খাতুনের এই সরল বক্তব্য প্রমান করে গ্রাম আদালত স্বল্প খরচে অল্প দিনে ন্যায়বিচারের তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানকে বেগবান করতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
##