চাল আমদানিতে কৃষকের সর্বনাশ


492 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
চাল আমদানিতে কৃষকের সর্বনাশ
মে ২০, ২০১৯ কৃষি জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

৬ মাসের জন্য আমদানি বন্ধ ও শুল্ক্ক বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

অনলাইন ডেস্ক ::

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। কৃষকের বাড়ি ও হাটে গড়াগড়ি খাচ্ছে এখন ধান। আমন মৌসুমের প্রায় ৩০ হাজার টন চাল উদ্বৃত্ত। এর মাঝে বোরো ধান কাটা শেষ। বোরো থেকে উৎপাদন হবে পৌনে দুই কোটি টন চাল। গত ছয় মাসে আমদানি হয়েছে প্রায় ৩৭ লাখ টন। এলসি খোলা আছে আরও ১৬ লাখ টনের। দেড় বছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৬১ লাখ টন। বাম্পার ফলন ও অতিরিক্ত চাল আমদানিতে কৃষকের হয়েছে সর্বনাশ। ধানের দাম পড়ে গেছে তলানিতে। অর্ধেক দামও পাচ্ছেন না কৃষক। ধানের দাম এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।

আমনের পর এবার বোরো ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ কৃষক। পড়তি দামের তেতো অভিজ্ঞতায় ক্ষেতের ধান আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাস্তায় ধান ফেলে প্রতিবাদ করছেন। কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। কৃষকের পক্ষে শিক্ষার্থীরাও নেমেছে মাঠে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি। এ বছর এক বিঘা বোরো জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১৫ মণের মতো। হাটে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪শ’ থেকে ৫০০ টাকা। তাতে গড়ে কৃষক পাচ্ছেন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় লোকসান ৬ হাজার টাকা। এ ছাড়াও একজন কৃষি শ্রমিকের পারিশ্রমিক হিসেবে রয়েছে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা।

দেশে চাহিদার তুলনায় মজুদ বেশি থাকার পরও চলছে চাল আমদানি। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৭ মাসে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের ১৬ তারিখ পর্যন্ত ভারত থেকে চাল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ১৭০ টন। চলতি মাসের ১৬ দিনে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪১১.৮৫ টন চাল আমদানি হয়েছে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে এসেছে আরও ৩ লাখ টন।

২০১৭ সালে হাওরে পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির পর সরকার চালের আমদানি শুল্ক্ক প্রত্যাহার করে নেয়। সরকার ১০ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করলেও চালকল মালিকরা প্রায় ৬০ লাখ টন নিম্নমানের চাল আমদানি করেছে। গত ডিসেম্বরে চাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৮ শতাংশ শুল্ক্ক আরোপ করা হয়েছে। তারপরও চাল আমদানি ঠেকাতে পারেনি সরকার।

এ বিষয়ে কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, ‘দেশে বছরে তিন কোটি টনের বেশি খাদ্য দরকার হয়। অথচ সরকারের মজুদ রাখার ক্ষমতা আছে ১৫ লাখ টনের। মজুদ রাখার সক্ষমতা না বাড়ালে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দুর্যোগ পরিস্থিতিও মোকাবেলা সম্ভব হবে না। তাই দ্রুত মজুদ রাখার গুদাম বাড়াতে হবে। ব্যাংক ঋণ নেই, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করছে না। ফলে ধানের বাজারে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্ষতি শুধু কৃষকের।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘দেশে সংকট না থাকা সত্ত্বেও চাল আমদানি করায় বাজারে ধানের দাম কম। চাল আমদানিতে কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে। এখনই তিন বা ছয় মাসের জন্য আমদানি বন্ধ না করলে কৃষক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘নভেম্বরের আগেই আমদানি বন্ধ করা উচিত ছিল। ৬০ লাখ টন চাল কীভাবে আমদানি হলো, তা খতিয়ে দেখা উচিত। আমদানির মধ্যে কোথাও ঘাপলা আছে। তা না হলে এখনও ১৬ লাখ টনের এলসি খোলা আছে কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘মোটা চাল তো কোনো দেশ নেবে না। সরু চাল রফতানি করতে হলে, তা কিনতে হবে। এর পর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্যাকেটজাত করতে হবে। তার পর বাজার খুঁজতে হবে। দাম ও গুণগত মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই ছয় মাস চলে যাবে। চাল রফতানি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এটা সোজা কথা নয়। এর মধ্যে খাদ্যমন্ত্রী ধানের দাম কম বিষয়ে ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। সত্যি দুঃখজনক। কৃষকের পাশে কেউ নেই।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, দেশের কৃষকদের বাঁচাতে চাল আমদানি বন্ধ করা হবে এবং ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল রফতানি করা হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, আপাতত চাল আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। কৃষক বাঁচাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারনির্ধারিত মূল্যে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে।

বোরো মৌসুম থেকে দেশের চাহিদার ৬০ শতাংশ চাল আসে। এই সময়ে দেশের ১৬ হাজার চালকল দারুণ ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এবার চালকলগুলো বন্ধ। শুয়ে-বসে দিন পার করছে শ্রমিকরা।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘আমনে ভালো ফলন হওয়ার পরই আমদানি বন্ধ করা উচিত ছিল। অতিরিক্ত আমদানিতে কৃষকের সর্বনাশ হলো। দ্রুত ধান কেনা শুরু করা উচিত। যদিও সরকার খুব সামান্য কিনে থাকে। বাজার চাঙ্গা করতে হলে কমপক্ষে ৫০ লাখ টন ধান কেনা দরকার। সরকার প্রতি বছর বলে, গুদাম সংকট। দীর্ঘ দিনেও নতুন গুদাম হচ্ছে না। এখন যেসব চালকল ধান কিনছে না, সেগুলো ভাড়া নিয়ে সরকার ধান মজুদ করতে পারে। আর কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দিতে পারে।’

জাতীয় কৃষক সমিতির সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কৃষিমন্ত্রী চাল রফতানির কথা বলছেন। কিন্তু একবারও চাল আমদানি বন্ধ বা আমদানি শুল্ক্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন না। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকা ছাড়া অন্য কোনো দেশ সিদ্ধ চালের ভাত খায় না। সরকারের কাছে তো আতপ চালের কোনো মজুদ নেই। এ ছাড়াও চাল রফতানির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। দীর্ঘ তিন বছর আলোচনার পর বাংলাদেশ ২০১৪ সালে শ্রীলংকায় দুই দফায় ৫০ হাজার টন চাল রফতানি করেছিল।’

সরকার চলতি বছর ১০ লাখ টন সিদ্ধ বোরো চাল কিনবে প্রতি কেজি ৩৬ টাকায়, যা গতবারের থেকে দুই টাকা কম। এ ছাড়া ৩৫ টাকা কেজি দরে আরও দেড় লাখ টন বোরোর আতপ চাল, ২৬ টাকা কেজিতে দেড় লাখ টন বোরো ধান কিনবে। এ হিসাবে এক মণ ধানের দাম হয় ১০৪০ টাকা। গত ২৫ এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে এই ধান-চাল সংগ্রহ করা কথা। গত ২৭ মার্চ পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা ভুয়া নামে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছে। আর চালকল মালিকরা আমদানি করা পুরনো নিম্নমানের চাল সরকারি গুদামে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কৃষি বিষয়ক পরামর্শক কৃষিবিদ ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এ থেকে এক কোটি ৯৬ লাখ টন চাল উৎপাদিত হওয়ার কথা। ১২ লাখ ৫০ হাজার টন মাত্র সরকারিভাবে ক্রয় করা হবে, যা উৎপাদনের তুলনায় খুবই অপতুল। সামান্য পরিমাণ ধান-চাল কিনে বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। বেশি পরিমাণে কিনে রাখার জায়গাও নেই সরকারের। সরকার চাইলে ঘোষিত মূল্যে ধান ক্রয় করে চালকল বা কৃষকের গোলায় রাখতে পারে। যখন সরকারের গুদাম খালি হবে তখন বুঝে নেবে।’

বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষক বাঁচাও ফোরামের সভাপতি কৃষিবিদ ড. আবুল কালাম বলেন, ‘ব্রি ২৮ জাতের প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৫১০ টাকা এবং ব্রি ২৯ জাতের ধান ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষক ধান নিয়ে রীতিমতো বিপদে পড়েছে। উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করছে কৃষক। চাল আমদানি বন্ধ না করে রফতানির কথা সত্যিই হাস্যকর।’

এ বিষয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চাল আমদানি বন্ধ অথবা শুল্ক্ক বাড়ানো যেতে পারে। চাল আমদানির নামে অর্থ পাচার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে দ্রুত সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে হবে। আর উৎপাদন খরচ কমাতে আগামী কৃষি উপকরণে সরকারকে প্রণোদনা আরও বাড়াতে হবে।’

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধানের দাম নিয়ে যে সংকট চলছে, এ বিষয়ে সরকার সচেতন। কৃষকদের জন্য সবকিছু করা হবে। নানা বিষয় ভাবা হচ্ছে। রফতানির মাধ্যমে ভারসাম্য আনা হবে। শুধু ধান কিনে দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। দেশে চালের চাহিদা উদ্বৃত্ত হওয়ায় বেসরকারিভাবে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে উচ্চ শুল্ক্কহার আরোপ করা হয়েছে। চাল আমদানি ও রফতানি নিয়ে শিগগিরই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসবে।

#