চিকিৎসক পদোন্নতি বন্ধ নেতাদের দ্বন্দ্বে


423 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
চিকিৎসক পদোন্নতি বন্ধ নেতাদের দ্বন্দ্বে
জুলাই ৭, ২০১৫ জাতীয় স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

 

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডেস্ক :
চিকিৎসক নেতাদের দ্বন্দ্ব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তিন শতাধিক চিকিৎসকের পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে আছে। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে এসব চিকিৎসক পদোন্নতি পাবেন। দেড় বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা সভা করার পর এক মাস আগে পদোন্নতির তালিকা চূড়ান্ত করে তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রমার্জনার জন্য ফাইল রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানোর কথা থাকলেও তা হয়নি। অবশ্য জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি প্রদানের মহোৎসব শুরু হয় বিএনপি সরকারের আমলেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৩৮ বিভাগের মধ্যে ৭০টিতে ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতির তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ষষ্ঠ থেকে ১৮তম ব্যাচ পর্যন্ত চিকিৎসকরা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হয়েছেন। তবে ১৮তম ব্যাচের নিচে কেউ পদোন্নতি পাচ্ছেন না। বেসিক সায়েন্স, ফরেনসিক মেডিসিন, অ্যানেসথেশিয়াসহ কয়েকটি বিভাগে চাহিদা অনুযায়ী পদের তুলনায় বেশি সংখ্যক চিকিৎসক পদোন্নতির তালিকায় আছেন। এ ছাড়া সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর, এমএস, এমডি, ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন ডিগ্রি ও এসিআর বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি পাবলিকেশন নেই এমন কাউকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়নি। এসব বিষয় নিষ্পত্তি করে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে ৩৪৬ চিকিৎসকের পদোন্নতি তালিকা চূড়ান্ত করে প্রায় এক মাস আগে ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে নিয়মিত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিন বছর হয়নি এমন ২৫৬ চিকিৎসকের রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা লাগবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) বাসুদেব গাঙ্গুলী বলেন, অধিদপ্তরের দেওয়া তালিকা ধরেই মন্ত্রণালয়ে পদোন্নতি প্রক্রিয়া হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ে কেবল উচ্চতর যাচাই-বাছাই করা হয়। আর চূড়ান্ত পদোন্নতি দেয় বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি।

পদোন্নতি প্রার্থী ও চিকিৎসক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ, বিএমএ এবং স্বাধীনতা পরিষদের সাবেক নেতা ও এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু, বিএমএর সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. জুলফিকার আলী লেলিন চিকিৎসকদের পদোন্নতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণেই পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে। এ ক্ষেত্রে ডা. ইকবাল আর্সলান ও ডা. লেলিন সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।

জানা গেছে, চিকিৎসকদের পদোন্নতি কমিটিতে স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্বে আমলারা কাজ করেছেন। বিএমএর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান তাদের আন-অফিসিয়ালি সহায়তা করেন। ডা. ইকবাল আর্সলান আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদেরও (স্বাচিপ) মহাসচিব।

পদোন্নতিবঞ্চিত চিকিৎসকদের অভিযোগ, ইকবাল আর্সলান স্বাচিপের অন্য গ্রুপের চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেননি। নিজের গ্রুপের পাশাপাশি তিনি বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের পদোন্নতিতে সহায়তা করেছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. আর্সলান। তিনি সমকালকে বলেন, জ্যেষ্ঠতার বিচারে তিনি পদোন্নতির জন্য চিকিৎসকদের নাম সুপারিশ করেছেন।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ডা. ইকবাল আর্সলান ও ডা. জুলফিকার আলী লেলিনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরেই মূলত পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে আছে। ডা. লেলিন ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতির জন্য ৩৭ চিকিৎসকের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ১৫ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের নয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের তিন, রাজশাহীর দুই ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের তিনজনসহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজের ৩৭ জন রয়েছেন। তার দেওয়া তালিকার মধ্য থেকে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা পদোন্নতির চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অভিযোগ করেন। পরে তিনি স্বাস্থ্য সচিব, ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও ডা. জুলফিকার আলী লেলিনকে মুখোমুখি করান এবং নিয়ম অনুযায়ী তালিকা চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইকবাল আর্সলান বলেন, সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমিটি যে তালিকা চূড়ান্ত করেছিল, ডা. লেলিন তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেননি। পরে চূড়ান্তকৃত ওই তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তিনি প্রমার্জনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন।

ডা. আর্সলান বলেন, লেলিনের সুপারিশ করা চিকিৎসকের মধ্যে বেশির ভাগই বিসিএস ক্যাডার নন। তারা বিভিন্ন প্রজেক্টে চাকরি করতেন। পরে আত্তীকরণের মাধ্যমে সরকারীকরণ করা হয়। বিসিএস ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা করলে লেলিনের সুপারিশ করা প্রার্থীদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে ডা. জুলফিকার আলী লেলিন বলেন, ডিপিসিতে যাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, যোগ্যতা না থাকলে তারা সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতেন না। নিজের অনুসারী নয় বলেই ইকবাল আর্সলান তাদের পদোন্নতির বাইরে রাখতে আমলাদের পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকে যোগ্য হওয়ার পরও বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু  বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রমার্জনা দেওয়া হয়। কিন্তু একযোগে এত সংখ্যক চিকিৎসকের প্রমার্জনার বিষয়টি নজিরবিহীন। পদোন্নতি নিয়ে ইকবাল আর্সলান কাজ করেছেন। কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে সে জন্য তিনি দায়ী।

বিএমএর সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ডা. ইকবাল আর্সলানের একক সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসকদের পদোন্নতির বিষয়টি চূড়ান্ত করা সঠিক হয়নি। সবার মতামত নিলে যোগ্যরা বঞ্চিত হতেন না। পাশাপাশি পদোন্নতির বিষয়টি আবারও বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

বিএমএর যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ডা. ইকবাল আর্সলান ছাড়া বিএমএর অন্য কোনো নেতা চিকিৎসকদের পদোন্নতির বিষয়ে জানেন না। এককভাবে সবকিছু প্রভাবিত করে তিনি জিম্মি করে ফেলেছেন। সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পরও আমার সঙ্গে কোনো বিষয়ে তিনি আলোচনা করেন না। তিনি বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের পদোন্নতি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন ডা. আজিজ।
ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে চিকিৎসকদের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যেত।

জানা গেছে, মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১১ সাল থেকে ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশনাল কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া শুরু হয়। মহাজোট সরকারের শেষ দিকে এসে আবারও ডিপিসির মাধ্যমে চিকিৎসকদের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে মহাজোট সরকারের আমলে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে ডিপিসির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও তৎকালীন মন্ত্রীর অসম্মতির কারণে তা হয়নি। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পর আবার ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্বে কয়েকজন আমলা চিকিৎসকদের পদোন্নতির বিষয়টি চূড়ান্তও করেছিলেন। পদোন্নতির ওই তালিকায় দেখা যায়, সিনিয়রদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

বিষয়টি নজরে আসার পর চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাচিপ ও চিকিৎসক নেতাদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অভিযোগ করা হয়। তিনি জ্যেষ্ঠতা অনুসারে চিকিৎসকদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে তিনি স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠন করেন। ওই কমিটিতে বিএমএর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানও ছিলেন। এ কমিটি গত বছরের জুলাইয়ে ডিপিসির মাধ্যমে চিকিৎসকদের পদোন্নতির তালিকা আবারও চূড়ান্ত করে। কমিটিতে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান ভঁূইয়া ডাবলু, স্বাচিপের সাবেক সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, স্বাচিপ নেতা অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদসহ স্বাচিপের বিভিন্ন গ্রুপের চিকিৎসকদের নাম না থাকায় তারা বিরোধিতায় নেমে পড়েন।
সূত্র : সমকাল