‘চিকিৎসক সুরক্ষিত থাকলে দেশ সুরক্ষিত থাকবে’


145 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘চিকিৎসক সুরক্ষিত থাকলে দেশ সুরক্ষিত থাকবে’
মার্চ ২৩, ২০২০ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক ::

বিশ্বে মহামারী আকার ধারণ করা আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। বিশ্বের উন্নত দেশের তালিকায় যে সকল দেশ আছে তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি মুহুর্তে হু হু করে বাড়ছে। চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, স্পেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া বাদ যাচ্ছে না কোন দেশ। করোনাকে মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা।সারাবিশ্বে দক্ষ ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়তে চীন, কানাডা, আমেরিকার অবস্থান রয়েছে শীর্ষে। উন্নত বিশ্বের কাতারে শক্তিমান প্রত্যয়ী ভূখন্ড যুক্তরাস্ট্র, চীন, সুইজারল্যান্ড।উন্নত প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিদ্যা থাকার পরেও করোনার ছোবলে তারাই পড়েছে দুমড়ে-মুচড়ে।চীন অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও বহু জীবনের বিনিময়ে প্রাণঘাতী রোগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। জাতীয় বীরের বেশে ফিরেছে সে দেশের চিকিৎসকরা। একমাত্র চিকিৎসরাই জীবন বাজী রেখে সকল প্রকার চিকিৎসা বিদ্যা প্রয়োগ মরণঘাতি এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। চীনের চিকিৎসকরাও আবার বিশে^র মডেল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। তারা প্রথমে নিজেদের সুরক্ষা করে পরে দেশ ও দেশের মানুষকে সুরক্ষা করেছে।
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। লক ডাউন করা হয়েছে দেশের দুটি উপজেলা। যশোর জেলা শহরও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ২৫-৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশের সুপার মার্কেট, বিপণি বিতান ও মার্কেটসমূহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ১০ জন চিকিৎসক আইসোলেশনে আছেন। এখানে এখনো কোভিড-১৯ এর কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়নি। দেশে লেভেল-৩ ট্রান্সমিশন চলছে। যারা বিদেশ ফেরত বা বিদেশ ফেরতদের সংস্পর্শে এসেছেন তারাই আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের দেশে যদি কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে ইতালি বা চীনের মতো অবস্থায় যায়, আর সমান তালে চিকিৎসক, নার্সরা আক্রান্ত হতে শুরু করে তাহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হাসপাতালগুলো চিকিৎসক ও নার্স-শূন্য হয়ে যাবে। তারাও আগ্রহ হারাবে চিকিৎসা দিতে। এটি একটি বড় আশঙ্কার ব্যাপার। তখন বিপদের আর শেষ থাকবে না।
আমাদের দেশে এখনো সব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। জেলা ও উপজেলা শহরে তো নেইই। যার ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসকরা সর্দি কাশি জ্বরের রোগীদের চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছে; অন্যদিকে বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসা না পাওয়ার ভয়ে বিদেশ ভ্রমণের কথা গোপন করছে। রোগীদের ধারণা বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস থাকলে তারা আর চিকিৎসা পাবে না, প্রকৃতপক্ষে সেটাই ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হবে।
আমাদের দেশে করোনাভাইরাস যেভাবে বিস্তার করছে তার মেটিভ মোটেও সুখকর নয়। এটা একমাত্র মানুষের সচেতনতা ও চিকিৎসা সেবা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। করোনাভাইরাস যেহেতু হাচি-কাশির মাধ্যমে বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়ায় তাই চিকিৎসকরাও নিরাপদ নয়। চিকিৎসার সাথে জড়িন নার্স, ব্রাদার, ওয়ার্ড বয় কেহও নিরাপদ বোধ করবে না। এ ক্ষেত্রে আগে তাদের সুরক্ষিত করতে হবে। লেভেল-১ প্রোটেকশনে সার্জিক্যাল মাস্ক, ডিসপোজেবল গ্লাভস, সার্জিক্যাল ক্যাপ, ওয়ার্কিং ইউনিফর্ম সরবরাহ করতেই হবে। মহামান্য হাইকোর্টও আদেশ দিয়েছেন।
কোয়ারিন্টিনে যে সকল চিকিৎসক, সেবিকা-সেবকসহ সংশ্লিস্টরা সেবা প্রদান করবেন তাদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের এই জাতীয় দুর্যোগ থেকে তারাই কান্ডারীর ভুমিকা পালন করবে। চাকরি সকল সেক্টরে করে কিন্তু চিকিৎসক-নার্সরা তাদের জীবন বাজি রেখে আমাদের জীবন রক্ষা করছে। আমরা যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দর সোফায় বসে টিভিতে নিউজ দেখছি ঠিক তখনই জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকরা দিন-রাত নিরন্ত্রন পরিশ্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে ছন্দের বাংলাদেশ উপহার দিতে। প্রেসার দিয়ে নয়; প্রেষণা দিয়ে কাজ আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ প্রেষণার ব্যবস্থা করতে হবে।
আজকে করোনার বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। কিন্তু অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ করতে পাঠান তো কোন মানুষকে, একটা হেলমেট ছাড়া যাবে কেউ যুদ্ধ ক্ষেত্রে? তাহলে ডাক্তারও স্বাস্থ্যকর্মীরা কীভাবে চিকিৎসা করবে? আমাদের ডাক্তাররা তো চিকিৎসা দিচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চারজনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে; করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন এই সন্দেহে। তাদের সুরক্ষিত করে চিকিৎসার যুদ্ধে পাঠাতে হবে।
সরকারের প্রতি চিকিৎসকদের আস্থা বাড়ানোটা বেশি জরুরী। গত বছর ডেঙ্গুতে চিকিৎসকদের একটি করুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই সময়ে শতাধিক চিকিৎসক-নার্স আক্রান্ত হয়েছে। যারাই সেবা দিবে তারাই যদি আক্রান্ত হয় তবে আস্তার যায়গাটা কোথায়? তাই তাদের আস্থা রাখার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। না হলে একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।। জাতি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। চিকিৎসকদের হাত ধরেই আবারও ভয়-শঙ্কার আধার কেটে আলো আসবেই।

লেখক: নাজমুল হক, প্রাক্তন খুলনা বিভাগীয় সিনিয়র রোভার মেট প্রতিনিধি