চোখে চোখ রেখে খেলবি


595 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
চোখে চোখ রেখে খেলবি
আগস্ট ১৭, ২০১৫ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
পরের দিন কোচিং সেন্টারে ট্রায়াল, ঘুম আসছিল না ছোট ভাইটির স্বপ্নালু দুটি চোখে। দাদা পই পই করে বলে দিয়েছেন_ ভুলেও বলবি না, তুই কিপিং করিস! ওখানে অনেক ছেলে আছে, যারা অনেক দিন থেকেই কিপিং প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু গ্গ্নাভস হাতে নিলেই যে নেচে ওঠে তার ইন্দ্রিয়গুলো, বেড়ে যায় রক্ত চলাচল। তাই সেদিন মিঠু স্যার যখন জিজ্ঞেস করলেন_ তোমাদের মধ্যে কে কে কিপিং জানো? ভিড়ের মধ্যে থেকে তখন কেবল একটি হাতই উঠেছিল। লিটন কুমার দাস। সেদিনই প্রথম নামটি লেখা হয় ক্রিকেটের কোনো অফিসিয়াল খাতায়। তার পর তো সবই গোছানো এক চিত্রনাট্য। দিনাজপুরের রাজবাটি থেকে বিকেএসপি হয়ে মিরপুরের শেরেবাংলা। অনূর্ধ্ব ১৩,১৬, ১৯ থেকে সবার মন জয় করে সরাসরি মাশরাফি ভাইয়ের সুখী সংসারের ব্রিগেডে। জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমের সেই লাল সোফাটিতে, যেখানে অনেকেই বসেন না ‘আনলাকি’ বলে! সেখানেই এখন নিয়মিত লিটন দাস। সেদিন অধিনায়কের একটি আওয়াজই তাতিয়ে দিয়েছিল তাকে_ ‘ভয় পাবি না, চোখে চোখ রেখে খেলবি…’। মুশফিক গ্গ্নাভস তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘মন খুলে খেলে যা।’ কোচ হাথুরুসিংহে কাঁধ চাপড়িয়ে বলেছিলেন_ ‘তুমি পারবে, যাও নিজের খেলাটা খেল…। ভাবনার কিছু নেই।’ যেদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে অভিষেক ম্যাচে নেমেছিলেন সেদিনের টুকরো টুকরো কথাগুলো যেন মনের ভেতর গেঁথে নিয়েছেন।

‘ছুটি কেমন কাটছে?’ জানতে চেয়ে ফোন করা হয়েছিল লিটনকে। মুস্তাফিজের মতো তাকে ঘিরে হয়তো গ্রামে উৎসব হয়নি, সৌম্যর মতো বন্ধুরাও এসে বাইকে চাপিয়ে ঘুরতে নিয়ে যায়নি। তবে জাতীয় দলের নতুন এই মুখের আগমনে রাজবাটির গুঞ্জাবাড়ির বাচ্চু চন্দ দাসের বাড়িতে অন্তত বড়পুজার আনন্দ। ‘কোচ বলে গেছেন তোমরা সবাই ছুটিটা পরিবারের সঙ্গে উপভোগ কর। বাড়িতে এসে ভালোই লাগছে। তবে মা অনেক কিছু রেঁধে খাওয়াচ্ছেন, মনে হয় আমাকে মোটা বানিয়ে ছাড়বেন…। তাই বিকেলে এলাকার ছেলেদের সঙ্গে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলছি।’ যে মাঠটির পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন লিটন, সেখান থেকেই আট বছর আগে শুরু হয়েছিল তার ক্রিকেট যাত্রা

রাজবাটির সেই ক্রিকেট কোচিং
বাবা ব্যস্ত থাকেন স্বর্ণের দোকানে, কারিগর তিনি। মা ব্যস্ত সংসার সামলানোয়। বড় ছেলে বাপ্পি দাস টুকটাক ক্রিকেট খেলতে যায় এদিক-ওদিক, সঙ্গে নিয়ে যায় তার ছোট ভাইটিকে। কিন্তু ব্যাটসম্যান কিংবা বোলার হিসেবে নয়, লিটনকে রাখা হয় উইকেটের পেছনে। কিন্তু কিপারের তো প্যাড পরতে হয়, তার যে অনেক দাম। উপায় বের করে এলাকার ছেলেরাই, কলার খোলা কেটে প্যাড, ক্রিকেট বলের ভেতর থেকে কালো রাবারটি বের করে ‘বল’ আর আমের কাঠ দিয়ে ব্যাট! এভাবেই চলছিল বেশ। একদিন বাপ্পি খবর পায়, দিনাজপুর অনূর্ধ্ব-১৩ দল গড়ার জন্য ক্রিকেটার নির্বাচন করা হবে। ভাইকে নিয়ে চলে যান আবু সামাদ মিঠুর কাছে। পরের দিন ট্রায়ালে আসতে বলেন তিনি। সেখানেই প্রথম ক্রিকেট বলের সঙ্গে পরিচয় লিটনের। ‘কোচ জানতে চেয়েছিলেন তোমাদের মধ্যে কে কিপার? আমি হাত তুলেছিলাম। তারপর দিনাজপুর অনূর্ধ্ব-১৩ দল থেকে রাজশাহী বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৩ দলে সুযোগ পাই। ছোট বেলায় টেলিভিশনে খেলা দেখতে বসলে আমার গিলক্রিস্টকে খুব ভালো লাগত, ম্যাককুলাম আর মার্ক বাউচারকে দারুণ লাগত। সেখান থেকেই কিপিং গ্গ্নাভস তুলে নেওয়া।’ সঙ্গে ব্যাটিংটাও চলছিল সমানতালে। ছাত্রকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন কোচ সামাদ মিঠু। তিনিই একদিন লিটনের বাবার কাছে বললেন ছেলেকে বিকেএসপিতে ভর্তি করাতে।
বিকেএসপি ও স্কুল ক্রিকেট
বিকেএসপিতে ভর্তি হতে খুব একটা সমস্যা হয়নি লিটনের। ততদিনে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে ডাক এসে গেছে। দলের সঙ্গে ভারতও সফর করেছেন। ‘ওই সফরে একটি ম্যাচ ছিল কলকাতার ইডেন গার্ডেনে, খেলার খুব ইচ্ছা ছিল; কিন্তু আমি একাদশে সুযোগ পাইনি। পরে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি ফিল্ডিং দিতে নামি।’ অনূর্ধ্ব-১৫-তে ডাক পাওয়ার তিন দিন পরই বিকেএসপিতে ভর্তি হয় লিটন। ‘ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছিলাম বিকেএসপিতে। আমাদের দুই ব্যাচ সিনিয়র ছিল বিজয় ভাই (এনামুল হক বিজয়)। একদিন আমাদের ওখানে প্র্যাকটিস করতে আসেন মুশফিক ভাই। ওই প্রথম তাকে সামনা-সামনি দেখি আমি। কাছে গিয়ে সালাম দিয়েছিলাম। কিপিং করি বলে কিছু টিপসও চেয়েছিলাম। মুশফিক ভাই আগ্রহ নিয়েই কিছু টিপস দিয়েছিলেন। এরপর যখন ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ খেলতে নামি তখন মুশফিক ভাই আমাকে নামে চিনে নেন।’ বিকেএসপির হয়ে স্কুল ক্রিকেটে অনেক রান করেছিলেন লিটন। মূলত ওই ২০০৮ সালেই প্রথম নিজেকে উইকেটকিপার কাম ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত করেন। মারকুটে ব্যাটিং করতেন। স্কুল ক্রিকেটে ওই বছর সর্বোচ্চ রান করেন তিনি। তার পরই ডাক আসে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে। ওই বছর অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ভালো কোনো কিপার ছিল না বলে লিটনকে অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে বেছে নেওয়া হয়। অনূর্ধ্ব-১৬ না খেলেই এক ধাপে ১৭! ‘সত্যিই চমক ছিল ওই ডাক পাওয়াটা। ওই দলের হয়ে ভারত সফরে চারটি সেঞ্চুরি করেছিলাম। এরপর অধিনায়কত্বও করি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের।’ সিঁড়ির ধাপ পেরোনোর মতো অবশ্যম্ভাবী ছিল অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ডাক আসাটা। এরপর তো ২০১২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া, তারপর ২০১৪ আরব আমিরাতে আরেকটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া। ততদিনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জড়তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন লিটন। ‘মনে আছে অস্ট্রেলিয়ায় একটা সেঞ্চুরি আর দুটো হাফ সেঞ্চুরি করেছিলাম। পরের বার অবশ্য সেঞ্চুরি হয়নি, দুটো হাফ সেঞ্চুরি ছিল।’ মূলত বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পরপরই আবাহনীর মতো বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ চলে আসে লিটনের সামনে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ততদিনে মারকুটে ওপেনার আর বিশ্বস্ত কিপার হিসেবেও পরিচিতি মিলেছে। জাতীয় লীগে সর্বোচ্চ রান, ঢাকা লীগে পঞ্চাশের ওপর গড় রান করে নির্বাচকদের নজরে চলে এসেছেন। কোচ হাথুরুসিংহেও খুঁজছিলেন একজন কিপার কাম ব্যাটসম্যানকে। যিনি কি-না গ্গ্নাভস হাতে নিয়ে মুশফিকের দায়িত্ব কিছুটা হালকা করতে পারবেন। এমন অপশন যদিও ছিল এনামুল হক বিজয়ের জন্য, কিন্তু তুলনায় লিটনের মধ্যেই ব্যাটিং টেকনিকটা নিখুঁত দেখতে পেয়েছিলেন হাথুরুসিংহে। আর তার পরই একদিন ফোন আসে বিসিবি থেকে।
‘সেরাটা এখনও দিতে পারিনি ‘
অভিষেকে উত্তরসূরির মাথায় ক্যাপটি পরিয়ে দিয়েছিলেন মুশফিক নিজেই। ভারতের বিপক্ষে ফতুল্লায় টেস্ট অভিষেক হয় লিটনের। সেই টেস্টে তার ৪৪ রানের ইনিংসটি প্রশংসিত হয়েছিল। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও ৫০ রানের ইনিংসটির জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু ওয়ানডেতে এখনও সেভাবে বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ‘আমি নিজেও এটা নিয়ে সন্তুষ্ট নই। এখনও নিজের সেরাটা দিতে পারিনি। তবে আমি মনে করি না, সেঞ্চুরি করলেই সেরা ইনিংস হয়। আসলে ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী দলকে সেরাটা দিতে পারাটাই আসল। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কিছু পার্থক্য আমি এরই মধ্যে বুঝতে পেরেছি। ঘরোয়া ক্রিকেটে কোন বোলার কেমন করবে, তা খেলতে খেলতে কিছুটা বুঝেছি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এ জন্য কিছুটা সময় লাগে। তবে আমি ভাগ্যবান যে, আমি এমন একটি দলের সদস্য হয়েছি, যে দলটি সিরিজ জয়ের মধ্যে রয়েছে। যেদিন মাশরাফি ভাই বললেন_ ভয় করবি না, প্রতিপক্ষে যতই বড় বড় নাম থাকুক না কেন, চোখে চোখ রেখে খেলবি। ওই আত্মবিশ্বাসটা আমার দারুণ কাজে দিয়েছে। কোচও আমাকে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করতে বলেন। আমি সেটাই করে যাচ্ছি। এখানে ব্যক্তিগত লক্ষ্য তেমন কিছু নেই। আমি দলের জন্য কিছু করতে পারলেই খুশি।’ টেস্টে নিয়মিত গ্গ্নাভস হাতে নিলেও ওয়ানডেতে এখনও সেটা পাকা হয়নি। ছয় ওয়ানডের মধ্যে মাত্র দুটিতে কিপিং করেছেন। ভারতের বিপক্ষে ওই দুটি ম্যাচেই ছয়টি ক্যাচ নিয়েছেন উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে। যখন গ্গ্নাভস হাতে আপনি, আর মিড অফে মুশফিক ফিল্ডিং করেন, তখন কি একটু হলেও জড়তা হয় না? উত্তর জানার কৌতূহল তাড়াচ্ছিল। ‘মোটেই না, মুশফিক ভাই নিজেই আমাকে ডেকে বলেছেন। কোনো চিন্তা করবি না, পেছনে তাকাবি না। তুই শুধু বলের দিকে চোখ রাখবি। মনে রাখবি বল যেন ছুটে না যায়। আসলে কি কিপিং, কি ফিল্ডিং_ আমি সব সময়ের জন্যই তৈরি থাকি সেরাটা দেওয়ার জন্য।’ আস্থার জায়গাটি কোচ হাথুরুসিংহে নিজেই দিয়ে রেখেছেন লিটনকে, মুশফিকও ভরসা দিয়েছেন আর অধিনায়ক মাশরাফি আত্মবিশ্বাসের এক বারুদ যেন ঠেসে দিয়েছেন দলের এই নবাগতের মধ্যে। অপেক্ষা শুধু একটা বিস্ফোরণের।–সুত্র সমকাল