জগাখিচুড়ির ঐক্য দিয়ে বিএনপি তরী পার হতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী


345 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জগাখিচুড়ির ঐক্য দিয়ে বিএনপি তরী পার হতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী
অক্টোবর ১৪, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নৌকা থেকে নেমে ধানের শীষে মুঠো ধরেছেন ড. কামাল হোসেন গংরা। যে ধানের শীষে শীষ নেই, আছে শুধু চিটা। এই জগাখিচুড়ির ঐক্য দিয়ে বিএনপির তরি পার হতে পারবে না।

শনিবার মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাট টার্মিনালে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবারও সেবা করার সুযোগ দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভোট চেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দেশের মানুষ বারবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছেন। আওয়ামী লীগ সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করেছে।

তিনি বলেন, এই নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ায় এদেশের মানুষ স্বাধীনতা ও ভাষা পেয়েছে, মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছে। এখন উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতিও এসেছে। তাই আগামীতেও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জনগণের সেবা করার সুযোগ করে দেবেন।

এদিন প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রকল্পের মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং সেতু নির্মাণের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন। দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো পদ্মা সেতুকে ‘পদ্মা সেতু’ নামেই এর নামফলকও উন্মোচন করেছেন তিনি। এছাড়া মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজা সংলগ্ন গোলচত্ত্বর এলাকায় সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিকেলে কাঁঠালবাড়ির জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ড. কামাল হোসেনকে সাবাস জানাই, কারণ তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে ও নৌকা থেকে নেমে ধানের শীষের মুঠো ধরেছেন। তিনি একটি সন্ত্রাসী দল বিএনপি ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, যারা দেশে খুনিদের রাজত্ব কায়েম করেছিল। যারা ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হত্যা মামলার আসামি এবং দেশের বড় বড় মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী। অবশ্য কামাল হোসেন এটা করতেই পারেন। কারণ তিনি কালো টাকা সাদা করতে পারেন। খুচরা, সিকি ও আধুলি দিয়ে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ঐক্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, এদেশের মানুষ অনেক আগেই বিএনপি-জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করে নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। তারেক জিয়া, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া কালো টাকা সাদা করার কারখানা তৈরি করেছেন। বিষয়টি ‘রতনে রতন চিনে, শিয়ালে চেনে কচু’। এই কারণেই তাদের সঙ্গে কামাল হোসেন গংরা হাত মিলিয়েছেন। তাদের সঙ্গে ন্যায়ের ঐক্য হতে পারে না।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু কন্য বলেন, আমার বাবা-মাসহ পরিবারের লোকদের যারা খুন করেছিল জিয়াউর রহমান সেই খুনিদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা ছিলেন। বিএনপির সহযোগিতায় এই খুনিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছিল। এই খুনের সঙ্গে বিএনপিও জড়িত। ২১ আগষ্ট বিএনপি-জামায়াত আমার ওপরও গ্রেনেড হামলা চালিয়ে খুন করার চেষ্টা করছিল। আল্লাহর রহমত ও আপনাদের দোয়ায় আমি বেঁচে গেছি। সেদিনের কথা মনে পড়লে চোখে শুধু জল ফিরে আসে।

টানা দুই মেয়াদে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গরীব-দুঃখী মানুষের উন্নয়নের সরকার। তাই এই সরকার গরীব-দুঃখী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বদ্ধপরিকর। এদেশে কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। সব ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়া হবে। যেটা কেউ করতে পারে না, সেটা আওয়ামী লীগ করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আওয়ামী লীগকে ভোট দিন। পদ্মাসেতু সহ আমরা বড় বড় মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। এদেশের মানুষ উন্নয়নে বিশ্বাসী। এ সময় সমবেত মানুষ দুই হাত তুলে নৌকায় ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রধানমন্ত্রী রোববার ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে সকাল সোয়া ১১টার দিকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া পৌঁছান। সেখানে টোল প্লাজা সংলগ্ন গোলচত্ত্বর এলাকায় পদ্মাসেতুর নামফলক উন্মেচন এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পের ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন, এই সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ও পাচ্চর ভাঙ্গা ছয় লেনের এপ্রোচ সড়কের উদ্বোধন ও মূল নদীশাসন কাজের সংলগ্ন স্থায়ী নদীর তীর রক্ষাবাঁধের উদ্বোধন করেন তিনি। পরে সুধী সমাবেশে বক্তৃতা শেষে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতিও পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পদ্মা সেতুর শরীয়তপুরের জাজিরা অংশে গিয়ে সেখানেও নামফলক উন্মোচন ও রেল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া-২ এ দুপুরের নামাজ ও খাবার খান। বেলা ৩টা ৩৫ মিনিটে মাদারীপুরের শিবচর কাঠাঁলবাড়ি ফেরিঘাট এলাকার জনসভায় যান তিনি। তিনি ৪টা ৫ মিনিটে থেকে টানা ৩২ মিনিট বক্তব্য রাখেন। বিকেলে হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।

শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামসুদ্দিন খানের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বি এম মোজাম্মেল হক, এ কে এম এনামুল হক শামীম, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, স্থানীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর পৌর মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক পাভেলুর রহমান শফিক খান প্রমুখ।

সার্বিক পরিচালনা ও সমন্বয়ক ছিলেন মাদারীপুর-১ আসনের এমপি নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। জনসভা পরিচালনা করেন শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ সেলিম।

‘সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে পদ্মার কাজ এগিয়ে চলছে’

মাওয়ার সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্চ মোকাবেলা করেই কোটি মানুষের প্রাণের দাবি পূরণ করতে চলেছি। সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। বিশ্বে প্রমাণ করেছি, আমরাই পারি। বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

তিনি বলেন, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার প্রতিশ্রল্ফম্নত অর্থায়ন দিতে বিরত থাকে। এ অবস্থায় বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দেশের জনগণের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা ছিল বলেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরল্ফম্ন করতে পেরেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি আছে ৭ দশমকি ৮৬ শতাংশ। পদ্মা সেতু চালু হলে বাড়বে আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ। আর রেল সেতু হয়ে গেলে মোট প্রবৃদ্ধি বাড়বে ২ শতাংশ। ফলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় কোনো সমস্যা হবে না। পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হলে যারা এটা নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল, যারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চেয়েছিল, তাদের উপযুক্ত জবাব দেওয়া সম্ভব হবে।

এ সময় নোবেল বিজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের কিছু লোক আছেন যারা দেশের স্বার্থ দেখে না, নিজেদের স্বার্থ দেখে। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ হারানোর পর ড. ইউনূস পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন। এদের কোনো দেশপ্রেম নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ করার জন্য বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবি সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। কিন্তু ড. ইউনুসের প্ররোচনায় বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা কারও সাহায্য না নিয়েই পদ্মা সেতু নির্মান করবো। এরপরই আমি জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিলাম, নিজস্ব অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করার। আমাকে সহযোগিতা করায় বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা’।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কর্মযজ্ঞে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ৬০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্প দেশের সর্ববৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। সেতুটির নির্মাণ কাজ টেকনিক্যাল, সময়সাপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জিং। গুণগতমান শতভাগ রাখার স্বার্থে আমরা ধৈর্য ও সর্তকতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন- রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

এ সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা ছাড়াও অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান, সেতু বিভাগের সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন, পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম, মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদেরসহ মন্ত্রণালয় ও সেতুর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।