জঙ্গি অর্থায়নে স্বীকারোক্তি তিন আইনজীবীর


324 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জঙ্গি অর্থায়নে স্বীকারোক্তি তিন আইনজীবীর
আগস্ট ২৪, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনের অ্যাকাউন্টে চার ধাপে এক কোটি আট লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে গতকাল বাঁশখালীর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন ঢাকায় গ্রেফতার তিন আইনজীবী। এ টাকার উৎস সম্পর্কেও কথা বলেছেন তারা। তাদের জবানবন্দিতে নতুন ক্লুও পেয়েছে র‌্যাব। আলোচনায় নতুন করে আসছে হেফাজতে ইসলামের নামও। হেফাজতের মামলা পরিচালনার টাকা কেন জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের অ্যাকাউন্টে গেল, হেফাজতের সঙ্গে এ সংগঠনের কারা কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করত- নতুন এসব প্রশ্ন উঠে আসছে জবানবন্দি থেকেই। জবানবন্দি শেষে তিন আইনজীবীকে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী থেকে গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় নতুন মামলায় তিন আইনজীবীকে ফের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানাবে র‌্যাব।

গ্রেফতার তিন আইনজীবীর মধ্যে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে। ওয়াহিদুল আলম হেফাজতের ঘাঁটি হাটহাজারীর সাবেক সাংসদ। শহীদ হামজা ব্রিগেডের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পও ছিল হাটহাজারীতে। তিন আইনজীবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে ব্যারিস্টার শাকিলার অ্যাকাউন্ট থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে শাকিলার কাছে হেফাজতে ইসলামের মামলা যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে হেফাজতের মামলা ইস্যুতে নেওয়া টাকা কেন শহীদ হামজা ব্রিগেডের নেতা ডনের অ্যাকাউন্টে গেল- র‌্যাবের কাছে বড় প্রশ্ন এখন সেটিই।

তিন ঘণ্টার জবানবন্দি: বাঁশখালীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাজ্জাদ হোসেনের খাস কামরায় পৃথকভাবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে প্রায় অভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন তিন আইনজীবী। সকাল ১০টায় তাদের আদালতে আনা হলেও জবানবন্দি শুরু হয় সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে। প্রায় দেড়টা পর্যন্ত তিন আইনজীবী আলাদাভাবে জবানবন্দি দেন। এ জবানবন্দি যাতে ফাঁস না হয় সে জন্য কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে র‌্যাব। আদালতের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি আসামিদের কারাগারে পাঠানোর পরও জবানবন্দি যাতে ফাঁস না হয় সে ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ছিল তারা। আদালতে থাকা আইনজীবী ও সরকারি কেঁৗসুলিদের মাধ্যমে জানা গেছে, তিন আইনজীবী অর্থায়নের বিষয়টি কিছুটা কৌশলে স্বীকার করেছেন।

ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা জানান, মনিরুজ্জামান মাসুদ জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা কি-না তা তার জানা ছিল না। তবে তার অ্যাকাউন্টে দুই ধাপে ৫২ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন তিনি। হেফাজতের মামলা পরিচালনা করতে গিয়েই মক্কেলরা তাকে এ টাকা দিয়েছিল। মামলা পরিচালনা না করায় পরে এ টাকা ফেরত দেন তিনি। প্রায় অভিন্ন বক্তব্য দেন আইনজীবী মাহফুজ চৌধুরী বাপন ও হাসানুজ্জামান লিটনও।

জবানবন্দিতে তারা জানান, হেফাজতে ইসলামের মামলায় কয়েকজন আসামির জামিন নেওয়ার জন্য কয়েক দফায় তারা টাকা পেয়েছিলেন। তবে হাইকোর্ট থেকে তারা আসামিদের জামিন নিতে ব্যর্থ হন। পরে সেই টাকা তারা কয়েক দফায় তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডনের হিসাব নম্বরে ফেরত দেন। ডন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি-না তা তাদের জানা নেই। যে তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে তিন আইনজীবী এক কোটি আট লাখ টাকা লেনদেন করেছেন সেগুলো হচ্ছে- ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।

আদালতে থাকা বাঁশখালী আদালতের সহকারী পিপি অ্যাডভোকেট বিকাশ রঞ্জন ধর বলেন, ‘জবানবন্দিতে তিন আইনজীবী মনিরুজ্জামান ডনকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ডন কোনো জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা কি-না তা তাদের জানা নেই বলেছেন। টাকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তারা।’ তিন আইনজীবী হেফাজতে ইসলামের মামলা পরিচালনা, বিভিন্ন সময় অর্থ নেওয়া, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সর্বশেষ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতে বিস্তারিত বলেছেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাবেক চট্টগ্রাম মহানগর পিপি আবদুচ ছাত্তার বলেন, ‘জোর করে জবানবন্দি নেওয়ায় কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া এ জবানবন্দির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন তারা।’ গতকালের শুনানিতে সরকারপক্ষে অংশগ্রহণ করেন অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট বিকাশ রঞ্জন ধর ও বাঁশখালী বার কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আ ন ম শাহাদত আলম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাবেক মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট আবদুচ ছাত্তার ও জেলা পিপি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিনসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী শুনানিতে অংশ নিয়ে জামিন আবেদন করেন।

জবানবন্দি দেওয়ার আগে-পরে কাঁদতে দেখা গেছে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে। তবে পুরুষ দুই আইনজীবী কিছুটা স্বাভাবিক ছিলেন আদালত চত্বরে।

টাকা গেছে চার ধাপে: নতুন জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা ডনের অ্যাকাউন্টে চার দফায় টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন গ্রেফতার তিন আইনজীবী। ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা প্রথম দফায় ২৫ লাখ ও দ্বিতীয় দফায় ২৭ লাখ টাকা জমা দেন। মাহফুজ চৌধুরী বাপন ৩১ লাখ টাকা ও হাসানুজ্জামান লিটন ২৫ লাখ টাকা জমা দেন ডনের অ্যাকাউন্টে। তবে ডনকে জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের নেতা নয়, হেফাজতে ইসলামের মামলা প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি হিসেবে তারা চেনেন বলে জানান আদালতকে।

জড়িয়ে পড়ছে হেফাজত: হেফাজতে ইসলাম কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয় দাবি করলেও শহীদ হামজা ব্রিগেডের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তাদের নাম। হেফাজতে ইসলামের মামলা পরিচালনার টাকা কেন শহীদ হামজা ব্রিগেডের শীর্ষ নেতা ডন দিল, আবার ডনের অ্যাকাউন্টেই কেন বা আইনজীবীরা টাকা ফেরত দিলেন এখন তা জানতে চাচ্ছে র‌্যাব। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী থেকে গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গিদের সঙ্গে গ্রেফতার আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা আছে বলে ধারণা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হাটহাজারীতে ‘আল মাদরাসাতুল আবু বকর’ নামে একটি কওমি মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। এ ঘটনায় দায়ের মামলায় নতুন করে রিমান্ড চাওয়া হবে তিন আইনজীবীর। এর আগে বাঁশখালী উপজেলার লটমণি পাহাড়ে শহীদ হামজা ব্রিগেডের গোপন সামরিক আস্তানা থেকে অস্ত্র-বিস্টেম্ফারক উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় রিমান্ড চাওয়া হয় তাদের।

খোঁজা হচ্ছে লাট ভাইকে: শহীদ হামজা ব্রিগেডকে টাকা দেওয়ার কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও তিন আইনজীবী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ডনের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার কথা স্বীকার করায় আলোচিত এ মামলাটি নতুন মোড় নেবে বলে ধারণা র‌্যাবের। র‌্যাব চট্টগ্রাম জোনের পরিচালক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিন আইনজীবী ডনের অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করায় মামলা পরিচালনায় তা তাদের কাজে লাগবে। তিন আইনজীবীর সঙ্গে হাটহাজারী থেকে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদেরও একটি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তাই হাটহাজারী থানার মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা গেছে, শহীদ হামজা ব্রিগেডের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এর নেপথ্যে পৃষ্ঠপোষকের (লাট ভাই) কথা জানা গেছে। এই লাট ভাইকে ধরতে আরও কিছু ফাঁদ পেতেছে র‌্যাব। আইনজীবীদের পুনরায় রিমান্ডে নিলেও এ ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর।

কঠোর নিরাপত্তাবলয়: তিন আইনজীবীকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার দিনক্ষণ আগে থেকে চূড়ান্ত থাকায় বাঁশখালীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ছিল কঠোর নিরাপত্তাবলয়। বাঁশখালী প্রতিনিধি আবদুল মতলব কালু জানান, রোববার সকাল ১০টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-৭-এর এএসপি রহুল আমিন তিন আইনজীবীকে আদালতে নিয়ে আসেন। এর আগেই সেখানে অবস্থান নেন র‌্যাব সদস্যরা। ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কাউকেই ঢুকতে দেয়নি র‌্যাব। আইনজীবীদের প্রবেশেও ছিল কড়াকড়ি। সাংবাদিকদেরও আদালতের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। জবানবন্দির তথ্য যাতে ফাঁস না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্কও থাকতে বলেছে র‌্যাব। রিমান্ড শেষে তিন আইনজীবীকে কারাগারে পাঠানোর পরও নিরাপত্তা জোরদার ছিল বাঁশখালীর আদালতে।