জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপেয় পানি


461 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপেয় পানি
মার্চ ২৬, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

 

গাজী মোমিন উদ্দীন ::
ভূমিকা : সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বব্যাপী একের পর এক ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এবং দুর্বিসহ সব প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণ এক ও অভিন্ন বলে বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন জলবায়ুর ক্রমজনিত পরিবেশ বিপর্যস্ততাকে। জলবায়ুর এই অনাকাঙ্খিত এবং নেতিবাচক ভূমিকায় বিশ^ব্যাপী শঙ্কা ও উদ্রেকের কারণ হয়ে দাড়িঁয়েছে। গ্রীনপিস এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, গত ৩ লাখ ৫০ হাজার বছরে বায়ুমন্ডলে কার্বনডাই অক্সাইড যে পরিমাণ বেড়েছে,তার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে গত ৩২৫ বছরে। ফলে বাড়ছে উষ্ণতা ও এই অপ্রাকৃতিক উষ্ণতা জলবায়ুর  ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিবেশকে বিপর্যস্ত এবং বসবাসের অনুপযোগী কওে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের  এই রোষানলে সাধারণ মানুষকে চরম দাম দিতে হচ্ছে সুপেয় পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে। সুপেয় পানি এখন অনেকটা বাঘের পা দেখার মত অবস্থায়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট    : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ত্বরান্বিত হচ্ছে। এরুপ চলতে থাকলে বায়ুমন্ডলে গ্যাসের (গ্রীণহাউজ) পরিমান বৃদ্ধি পেয়ে ভূ-পৃষ্ঠ মারাত্বক উষ্ণ হয়ে উঠবে। উষ্ণায়নের জন্য প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস হতে পারে। এখন যেমনটা ঘটতে শুরু করেছে যে, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বনডাইঅক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রীণহাউজ গ্যাসের পরিমাণ আশংকাজনকহারে বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, আগামী আট বছরে এই গ্যাসের পরিমাণ বর্তমানকে ছাড়িয়ে যাবে দুইগুণ। বায়ুমন্ডলে কার্বনডাইঅক্সাইড বেড়েছে ৩০ শতাংশ। নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ, মিথেনের সেই হার ১০০ শতাংশ। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বায়ুমন্ডলে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২০০ পিপিএম। ১৯৫০ সালে তা ছিল ৩২০ পিপিএম। বর্তমানে তা ৪৫০ পিপিএম ছাড়িয়ে গেছে। এখন প্রতিবছর ৬০০ কোটি টন কার্বনডাইঅক্সাইড বায়ুমন্ডলে যুক্ত হচ্ছে। ১৮৯০ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪.৫০ সে.গ্রেড, ১৯৯০ সালে ১৫.২০ এ দাড়াঁয়। জলবায়ু পরিবর্তনের হার যদি এভাবে বাড়তেই থাকে তাহলে পৃথিবীও মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

গুপেয় পানির সংকট বিশ্ব প্রেক্ষাপট    : সুপেয় পানির সংকট এখন একটি বৈশি^ক সংকট। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) এর এক রিপোর্টে জানা গেছে, বিশে^র প্রায় ৬৬টি দেশ সুপেয় পানি সংকটে কম-বেশি নিমজ্জিত। তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে,ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে। বিশে^র প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সুপেয় পানি প্রাপ্তিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। সরাসরি ৭৬ কোটি মত মানুষ সুপেয় পানি সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানির অপর নাম জীবন, কেউ কেউ মরণ বললেও এখন তা চরম সত্যে উপনীত হয়েছে। পানের যোগ্য পানি হলো সুপেয় পানি। যদি সংজ্ঞা পরিবর্তন করা না হয়,তাহলে প্রকৃতঅর্থে সুপেয় পানি নেই বললে একেবাওে ভুল হবেনা। পানি ছাড়া মানবজীবন এখন অস্তিত্বসংকটে, বিপদের বর্ডারলাইনে দাড়িঁয়ে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে বিশে^ প্রতিদিন ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪০০ শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্য পরিসংখ্যান বলছে, এই সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। শিশুরাই পানি সংকটের সরাসরি ভিকটিম। সুপেয় পানির সংকট রীতিমত মানবাধিকারকেও লঙ্ঘন করছে। অধিকার তো নেই-ই। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে অনেক আগেই। ২২ মার্চ বিশ^ পানি দিবসের যে প্রতিপাদ্যই থাকুক, তার উদ্দেশ্যই হল পান যোগ্য পানির নিশ্চয়তা পাওয়া। দেশের দক্ষিণ-পশ্মিাঞ্চলে অনেক এনজিও পানি নিয়ে কাজ করছে। সাতক্ষীরার উপজেলার উত্তরণ, সুশীলন, আইডিয়াল, অগ্রগতি, উন্নয়ন প্রচেষ্টা, সাসসহ অনেক এনজিও কাজ করছে। ব্র্যাকের ওয়াস প্রোগ্রামের আওতায় ব্যাপক কাজ হচ্ছে। তাছাড়া যশোরের ড্রিংকিং ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন সুপেয় পানির উৎস বৃদ্ধি এবং বিকল্প উপায়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থার কৌশল নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলার ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিক জননেত্রী শেখ হাসিনা তার দশ অগ্রাধিকারের মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিষয়গুলোর সাথে খাপ খাওয়ানোর নানা প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশে-বিদেশে জনমত সৃষ্টির কাজও তিনি করেন। এখনই সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে মহামারী রুপ ধারণ করলে তা নিয়ন্ত্রন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়বে। নিরাপদ পানি বঞ্চিত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই আবার চরম দারিদ্রের শিকার ও গ্রামের মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার শিশু ও নারীরা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি। ইউনিসেফের এক জরিপ বলছে, চীনে ১০.৮ কোটি, ভারতে ৯.৯ কোটি, নাইজেরিয়ায় ৬.৩ কোটি মানুষ সুপেয় পানি সংকটের ঝুঁিকতে মারাত্বকভাবে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার ৪,৩ কোটি, ইন্দোনেশিয়ায় ৩.৯ কোটি, পাকিস্তানে ১.৬ কোটি, মানুষ সুপেয় পানি সংকটে পড়ার আশঙ্কায় আছে। নদীবিধৌত বাংলাদেশে যখন গড় বৃষ্টিপাত ২০৩ সে.মিটার, সেখানে প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি সুপেয় পানির আড়ালে বসবাস করছে। বিশে^ সুপেয় পানির বন্দোবস্ত ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে এখুনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপেয় পানির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ    ঃ জার্মানির মিউনিখে ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি কনফারেন্সে ৫৩তম আসওে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “ জলবায়ু এখন নিরাপত্তারও হুমকি। বিশ^কে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জণবায়ু পরিবর্তন।” তিনি আরও বলেন, নিজেদের সম্পদ থেকে ২০০৯ সালে আমরা ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছি। উপকূলীয় ৯০০ কিলোমিটার এলাকায় গ্রিণবেল্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছি, সারা বাংলাদেশের প্রায় চার মিলিয়ন সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশে^র সবচেয়ে বড় সোলার নেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ” তবে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে, যেখানে বিশে^ও গড় তাপমাত্রা আর মাত্র ১০০ সেন্টিগ্রেড বাড়লে বাংলাদেশের মোট ভূ-ভাগের ১১ শতাংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। ফলে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সন্দেহের অবসান হওয়ার সম্ভাবনার আলো ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে উঠছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়    ঃ আমাদের করণীয় অত্যন্ত সীমিত কারণ, গায়ের জোর কিংবা অর্থশক্তি দিয়ে এই সমস্যা মোকাবেলা করা যাবেনা। প্রয়োজন হবে জনসচেতনতা ও অভিযোজনক্ষমতা বাড়ানো। আমাদের কার্বন নিঃসরন কমাতে উদ্যোগী হতে হবে। আজ হুমকির মুখে কঠিন বাস্তবতার পাদদেশে দাড়িঁয়ে থাকা বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সামস্টিক স্বার্থকে প্রাধাণ্য দিতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে আওয়াজ তুলতে হবে, তোমরা জেগে ওঠো, তোমরা বাঁেচা।

শেষকথাঃ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় শেষ কথা বলতে কিছু নেই। পরিবেশ ও ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণই প্রধান । শিল্পোন্নত দেশসমূহকে বুঝিয়ে কার্বন নিঃসরনসহ ক্ষতির কারণগুলিকে কমিয়ে আনার জনমত তৈরিতে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার দেশ নয়, মাত্র ৯ মাসে দেশ স্বাধীন করার ঐতিহাসিক নজির যাদের, তারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় সকল শক্তিকে একত্রিত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই একটি সম্ভাবনাময় অবস্থানে পৌছানো সম্ভব।
লেখক: সহকারী শিক্ষক,সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়