জিআই স্বীকৃতির মূল্য পাচ্ছেন না ক্ষীরশাপাতি আমচাষিরা


62 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জিআই স্বীকৃতির মূল্য পাচ্ছেন না ক্ষীরশাপাতি আমচাষিরা
জুন ১১, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

কী করছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

অনলাইন ডেস্ক ::

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে এখন স্বীকৃত বাংলাদেশের ক্ষীরশাপাতি আম। সুস্বাদু এ আম বাজারে হিমসাগর নামেই জনপ্রিয়। দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য হিসেবে গত জানুয়ারিতে এ সনদ দেয় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। এই স্বীকৃতি সনদ পাওয়ার প্রায় ছয় মাস পরে ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর পাকা আম এখন বাজারে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু এই আমের জিআই সনদ পেলেও বাড়তি মূল্যে বিক্রি বা রফতানির সুযোগ এবার চাষির ভাগ্যে মেলেনি।

জানা যায়, বিশ্বজুড়েই জিআই নিবন্ধিত পণ্য আলাদা ট্যাগ ব্যবহার করে বিক্রি হয়। ক্ষীরশাপাতি আমের এ স্বীকৃতি থাকলেও মান নিশ্চিত করে আলাদা জিআই ট্যাগে বিক্রি হচ্ছে না। এ পণ্যের জিআই থাকায় আলাদা কদর এবং দাম বেশি পাওয়া যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ক্ষীরশাপাতি আম এ দেশের জিআই পণ্য হিসেবে কেবল নিবন্ধিত হয়েছে। এর পরে অন্যান্য প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। গত ছয় মাস ধরে সনদ নিয়ে ঘুমিয়ে আছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। জিআই নিবন্ধনের জন্য উদ্যোগ নিলেও পরে কোনো উদ্যোগ নেয়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনও। এ কারণে এবার চাষিরা জিআই ট্যাগ ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে অন্য বারের মতো এবার কম দামেই স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রফতানি করতে হবে। এ আমে জিআই নিবন্ধন ট্যাগ ব্যবহার করতে পারলে বেশি দাম পেতেন চাষিরা। সাধারণত বিশ্বজুড়ে জিআই নিবন্ধিত পণ্যের ট্যাগ দেখে ৩০ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে কেনেন ক্রেতারা।

এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৯ বছর আগে লক্ষ্মণভোগ ও ক্ষীরশাপাতি আমের জিআই নিবন্ধন হয়েছে। এর ফলে জিআই সুবিধা নিয়ে বিশ্ববাজারে ক্ষীরশাপাতি আম রফতানি করছে ভারত। পাশাপাশি আগে নিবন্ধন করে পণ্যের পরিচিতি বা ব্র্যান্ডিং সুবিধা নিচ্ছে। এদিকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

ডিপিডিটির কর্মকর্তারা জানান, জিআই নিবন্ধিত পণ্যের মালিকানা স্বত্ব সুরক্ষায় উৎপাদক ও ব্যবহারকারীকে আলাদা সনদ নিতে হয়। তেমনি ক্ষীরশাপাতি আমের মালিকানা স্বত্ব পেতে আম চাষিদেরও সনদ নিতে হবে। সাধারণত সনদ ছাড়া কেউ বৈধভাবে জিআই নিবন্ধিত আম উৎপাদন এবং বাজারজাত করতে পারে না। চাষিরা সনদ নিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে আম উৎপাদন করে সব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে বাজারজাত করলে সুবিধা পেতেন। জিআই নিবন্ধিত হলে এ আমে জিআই ট্যাগ ব্যবহার করে বিক্রি করতে পারতেন। তাতে আমের ভালো মূল্যও পেতেন চাষিরা। ক্রেতারাও নিশ্চিত হয়ে ভালো আম খেতে পারতেন। রফতানিতেও বেশি দাম পাওয়া যেত। জিআই চিহ্নিত হলে প্রতারণাও বন্ধ হতো। এখন নিবন্ধিত না হওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছেন চাষি ও ক্রেতারা।

দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় ক্ষীরশাপাতি নামে পরিচিত হলেও সাতক্ষীরা ও যশোর এলাকায় এটি হিমসাগর হিসেবে পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বত্ব সংরক্ষণে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন ২০১৭ সালে ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে। ওই অঞ্চল ক্ষীরশাপাতি আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। দেশের ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী ফল এটি। আইন অনুযায়ী, সব কিছু যাচাই করে ক্ষীরশাপাতি আমের জিআই সনদ দেয় ডিপিডিটি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সনদ নেওয়ার পরে কোনো অগ্রগতি নেই। এ বিষয়ে আমচাষিসহ সংশ্নিষ্টদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল। যাতে চাষিরা এ বিষয়ে অবগত হয়ে সুফল নিতে পারেন। কিন্তু ডিপিডিটি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সভা করে অবহিত করেনি। তিনি বলেন, জিআই ট্যাগ ব্যবহারের আগে উপযুক্ত আম উৎপাদনে পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিকভাবে যে সব চাষি আম উৎপাদন করবে কেবল তাদের নিবন্ধন করা হবে।

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, দেশে এটি একটি নতুন প্রক্রিয়া। এই কাজ শেষ করতে সময়ের প্রয়োজন। এখানে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের জনবল সংকটের কারণে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, জিআই ট্যাগ ব্যবহার করে আম বিক্রি করতে হলে আগে মান নিশ্চিত করতে হয়। এখন মান নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ চলছে। এতে সময় লাগবে। তবে আগামী মৌসুমের আগে চাষিদের জিআই নিবন্ধন করে সনদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে প্রায় ২০ লাখ আম গাছ রয়েছে। জেলায় আড়াইশ’ জাতের আমের চাষ হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় জাত ক্ষীরশাপাতি। ১৯৫৫ সালের প্রাচীন লোক সংস্কৃতি ‘আলকাপ’ গানের ছড়ায় ২শ’ জাতের আমের মধ্যে এ ক্ষীরশাপাতির নাম রয়েছে। এ ছাড়া জেলার গেজেটেও এ ক্ষীরশাপাতি আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বীকৃতি রয়েছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া সুস্বাদু এ আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে গত তিন বছর ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এ কারণে আমচাষি, বাগান মালিক, ব্যবসায়ীরা ক্ষীরশাপাতি আমকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবিতে এই আমের স্বত্ব সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জাতের আম মাঝারি আকারের এবং অনেকটা ডিম্বাকৃতির। প্রতিটি গড়ে লম্বায় ৮ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার ও ওজন ২৬৩ দশমিক ৯ গ্রাম। পাকা আমের ত্বকের রঙ সামান্য হলদে এবং শাসের রং হলুদাভ। শাঁস আঁশবিহীন, রসাল, গন্ধ আকর্ষণীয়, বেশ মিষ্টি ও গড়মিষ্টতা ২৩ শতাংশ। এসব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে আলাদাভাবে জিআই নিবন্ধন হয়েছে।

জানা যায়, বছরে প্রায় সাড়ে ১১ থেকে ১২ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। বর্তমানে ২৩ জেলায় আমের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আমের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি ক্ষীরশাপাতি আম উৎপাদন হচ্ছে। গত মৌসুমে বাগানে প্রতিকেজি ক্ষীরশাপাতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা ও ব্যাগিং পদ্ধতির ক্ষীরশাপাতি ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়।

ক্ষীরশাপাতি আমের আগে বাংলাদেশে প্রথম জিআই পণ্য জামদানি। এর পরের জিআই পণ্য ইলিশ। এ দুটি পণ্যের মধ্যে জামদানি উৎপাদনকারী ৬৬ তাঁতি মালিকানা স্বত্ব পেয়েছেন। তারা এখন আলাদা ট্যাগ ব্যবহার করে বাজারজাত করতে পারছেন। কিন্তু ইলিশের ক্ষেত্রে এখন জেলেদের সনদ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের পদক্ষেপ না থাকায় তেমন অগ্রগতি হয়নি।

প্রসঙ্গত, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হচ্ছে মেধাসম্পদের অন্যতম শাখা। কোনো একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া, জলবায়ু এবং ওই দেশের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি অনন্য গুণমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে ওই দেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই গুণমানসম্পন্ন সেই পণ্য শুধু ওই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয়।