জেলে সবজি বাগানের শখ ছিল প্রধানমন্ত্রীর, পেঁপে খেতে পছন্দ করতেন খালেদা জিয়া : সেই ডিআইজি শামসুল হায়দার সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার


437 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জেলে সবজি বাগানের শখ ছিল প্রধানমন্ত্রীর, পেঁপে খেতে পছন্দ করতেন খালেদা জিয়া : সেই ডিআইজি শামসুল হায়দার সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার
জানুয়ারি ২৯, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
ওয়ান-ইলেভেনে সাব-জেলে দায়িত্ব পালন করা সেই আলোচিত ডিআইজি প্রিজন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী (অব.) বলেছেন, দুই নেত্রীই একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আমার মাধ্যমে সবসময় পরস্পরের খোঁজখবর নিতেন। কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ মন্তব্য করতেন না। জেলখানায় লাউ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি বাগান করার শখ ছিল প্রধানমন্ত্রীর। আমি হাসতে হাসতে একদিন বলেছিলাম, ‘স্যার, গাছ লাগাবেন, ফল খেয়ে যাবেন না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জানি না কত দিন থাকতে হবে, তাই সবজি বাগান করছি। মনে হয় অনেক দিন থাকতে হবে।’ অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খেতেন খুবই সামান্য। তবে তিনি পেঁপের তরকারি খেতে পছন্দ করতেন। নিজে থেকে অন্য কোনো মেন্যু দিতেন না। থাকতেন পরিপাটি হয়ে। কথা বলতেন খুবই কম। সেই বিভীষিকাময় ওয়ান-ইলেভেনে দুই নেত্রীর সাব-জেলে দায়িত্ব পালনের স্মৃতি নিয়ে গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। ডিআইজি প্রিজন হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর অবসর নেন। এরপর তিনি আমান গ্রুপের একটি কোম্পানিতে জিএম হিসেবে চাকরি করেন কিছুদিন। বর্তমানে তিনি সাভারে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘বিল্ডট্রেড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’—এ জিএম (অ্যাডমিন ও লজিস্টিকস) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের পাশেই বাউনিয়ায় বসবাস করছেন অবসর নেওয়া সেই আলোচিত ডিআইজি প্রিজন। সাব-জেলে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিচারণ করে শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, আমার মনে আছে, প্রধানমন্ত্রী শখ করে গরুর মাংস রান্না করতে চেয়েছিলেন। লেখালেখির জন্য চেয়েছিলেন একটি কম্পিউটার। কিন্তু জেলকোডের বাধ্যবাধকতায় সেদিন দিতে পারিনি। এ নিয়ে অবশ্য তিনি মনোক্ষুণ্নও হননি। বুঝতে পেরেছিলেন আমার সীমাবদ্ধতা। আমাকে যেভাবে দুই নেত্রী সহযোগিতা করেছিলেন, তাতে তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। তাদের নেতৃত্বসুলভ আচরণে আমিও বিমোহিত হই। কথা বলার একপর্যায়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মা তৈয়বা মজুমদার যখন মারা যান, শেষবারের মতো দেখতে সুযোগ দেওয়া হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। কিন্তু তার দুই ছেলে পৃথকভাবে নানীকে দেখতে যান। কিন্তু মা-ছেলেদের একসঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ ছিল না। এ নিয়ে জেলখানায় দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আমাকে বলেছিলেন, খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলেকে একসঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। হাজার হোক মায়ের মৃত্যুতো। আবার প্রধানমন্ত্রীর যখন কানে সমস্যা হয়, তার উন্নত চিকিত্সা করাতে আমাকে অনুরোধ জানিয়েছেন বিএনপিপ্রধান। দুই নেত্রীর পরস্পরের প্রতি এই সহানুভূতি আমাকে খুবই বিমোহিত করে। শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, আজকের প্রধানমন্ত্রীকে আমি ‘স্যার’ বলতাম। মাঝেমধ্যে অবশ্য ‘ম্যাডাম’ও বলতাম। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সবসময় ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতাম। কোনো বার্তা নিয়ে যখন বিএনপিপ্রধানের কাছে যেতাম, তখন তিনি খাটে উঠে আমাকে বসতে দিতেন চেয়ারে। আমি বিব্রতবোধ করলেও তিনিই আমাকে বসার জন্য বলতেন। দুই নেত্রীর পারিবারিক বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ ও ডা. দীপু মনি, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান ও অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কোনো বিশেষ বার্তা থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই দুই নেত্রীকে জানিয়ে দিতাম। অবশ্য সবকিছুই হতো জেলকোড অনুযায়ী। তিনি বলেন, আমার মনে আছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার মা যখন মারা যান, তখন বিএনপিপ্রধানকে ৬ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয় মাকে দেখতে। মাকে শেষবারের মতো দেখতে যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রম করে, তখন আমার ওপর নির্দেশ আসে তাকে নিয়ে যেতে। আমি জানতাম না, বাসায় তাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়েছে। আমি বাইরে ছিলাম। যখন তাকে বার্তা দেওয়া হয়, চলে যেতে হবে, তখন তিনি না খেয়েই চলে আসেন। বিষয়টি পরে আমি জানতে পেরেছি। এ বিষয়টি নিয়ে আজও আমি অনুতপ্ত। কিন্তু বেগম জিয়া আমাকে এ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। আরেক দিন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে খবর জানালাম, তার ছেলে তারেক রহমান বাথরুমে পড়ে গিয়ে সামান্য আহত হয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। শুধু এটুকুই বললেন, ঠিক আছে। প্রধানমন্ত্রীসুলভ আচরণে আমি খুবই খুশি হই।  শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গরুর মাংস রান্না করতে চাইতেন। কিন্তু সাব-জেলে তা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কোনো অঘটন ঘটলে আমাকেই জবাবদিহি করতে হতো। জেলকোডের বিধিতেও তা ছিল না। তাই আমি আমার অপারগতার কথা বলি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা হাসিমুখে মেনে নেন। একটি কথাও আমাকে বলেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ আমার আরও বেড়ে যায়। একদিনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আমার বড় মেয়ের যখন এসএসসি পরীক্ষা দেয়, আমি তখন সাব-জেলে দায়িত্ব পালন করি। প্রথম পরীক্ষার দিন যখন আমি সাব-জেলে ডিউটিতে আসি, তখন প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি খুবই মনোক্ষুণ্ন হন। তিনি বলেন, মেয়ের প্রথম পরীক্ষায় অভিভাবক হিসেবে আপনার যাওয়া উচিত ছিল। ওটাই আপনার বড় দায়িত্ব ছিল। তার উদারতায় আমি বিমোহিত হই। আরেক দিনের চিত্র তুলে ধরে সাবেক এই ডিআইজি প্রিজন বলেন, একদিন চিকিত্সার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। কৌশলগত কারণে সাব-জেল থেকে বেশ কয়েকটি গাড়ি নিয়ে আসা হয়। আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সব শেষে কালো গ্লাসের একটি গাড়িতে। সামনে কয়েকটি কালো গ্লাসের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা স্লোগান দেন। ফুল ছিটিয়ে দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে গাড়িতে ছিলেন, তা নিয়ে কারোরই আগ্রহ ছিল না। নেতা-কর্মীদের ভিড়ে যখন গাড়ি বহর হাসপাতালে প্রবেশে বিলম্ব হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে হেসে বলেছিলেন, চলেন, আমরা পেছন দিক থেকে ঢাকা শহর ঘুরে আসি।

এসব কথা আজও আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, পেশাধারিত্বের জায়গা থেকে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি দুই নেত্রীকে সার্বিক সহযোগিতার। শুধু দুই নেত্রীই নন, শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাই যখন জেলে, তখনো আমি দায়িত্বে ছিলাম। জেলকোড অনুযায়ী তাদের সঙ্গেও আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া কয়েক নেতার দায়িত্বেও আমি ছিলাম বেশ কিছুদিন। তাদের সঙ্গেও সমান আচরণ ছিল আমার। সবাই আমার ব্যবহারে খুশি হতেন। আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কাজ করিনি। পেশাধারিত্বের প্রতি সবসময় সতর্ক ছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমার ব্যবহারে কেউ যেন আহত বা কষ্ট না পান— সে চেষ্টাই সবসময় করেছি। শোনা যায়, দলীয় রাজনীতি করলে বেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু তা আমি কখনই করার চেষ্টা করিনি। মনে আছে, দুই নেত্রীই আমাকে বলেছেন, আপনার মতো অফিসার পেলে কোনো সরকারই সহজে ছাড়তে চাইবে না। কিন্তু আমি যথাসময়ে অবসরের পর পরই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। নিয়মিত রোজা রাখতেন। কোরআন খতম দিতেন। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনও নামাজ পড়তেন। সারা রাত জেগে নামাজ পড়তেন। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যেতেন। কখনো কিছু লেখার জন্য কাগজ-কলম চাইলে নিয়ে যেতাম। জেলকোড অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগই দুই নেত্রীকে দেওয়া হতো। আজকের প্রধানমন্ত্রী জেল থেকে চলে যাওয়ার দিন সবকিছুই ঘুরে দেখাই। যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, সবকিছু দেখে যান। আমরা কীভাবে আছি, কী করি। হাসিমুখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা চাইলে আমাকে থেকে যেতে হবে। এ সময় বলি, নো স্যার। ভালো থাকবেন।