জয়েই হোক শেষ


108 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
জয়েই হোক শেষ
জুলাই ৫, ২০১৯ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

তার অবসরের ঘোষণা দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে মিডিয়ায় কাল এমন পাঞ্জা চলেছে যে, মুখ বুজে সহনীয়তা বাড়ানো এবং নতুন করে প্রতিপক্ষ তৈরি না করার মধ্যেই নিজেকে সংকুচিত করে রেখেছেন। চেনা ক্যামেরাগুলো এড়িয়ে গেছেন। বিদায়ের বিষাদ সুরের মধ্যেও মাশরাফি যেন বুঝতে পেরেছেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন একটি আলোকবৃত্তের মধ্যেই। সেই আলো ড্রেসিংরুমের। যেখান থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন সম্পর্ক বিয়োগের নয়, বিচ্ছিন্নের নয়- সম্পর্কটা সম্মানের। তার শেষ ওয়ানডে কি-না তা মাশরাফি নিজেই জানাবেন দেশে ফিরে, তবে আজই যে বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ, আজই যে এই আসরে বাংলাদেশেরও শেষ ম্যাচ, সেটা তো লর্ডসও জানে। ক্রিকেটের এই তীর্থে এই প্রথম কোনো ওয়ানডে খেলতে নামছে টাইগাররা। একটা সোনালি উপহার নিশ্চয়ই পেতে পারেন তিনি। অনেক ‘শেষ’ এই ম্যাচে তাই প্রিয় অধিনায়ককে স্মরণীয় উপহারটি দেওয়ার জন্যই তেতে আছেন সবাই।

এমনিতে বিশ্বকাপে এটা চুইংগামের শেষ দিকের ম্যাচ। লন্ডনের আগ্রহ এতে কম। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন পাকিস্তান আর ম্যাচটি যখন মাশরাফির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, তখন উত্তেজনার সঙ্গে একটা আবেগও জড়িয়ে আছে লর্ডসে। পাকিস্তানের সঙ্গে গত চার দেখার সব ক’টিতেই জিতেছে টাইগাররা। লাহোর-করাচি থেকে আসা সাংবাদিকরাও মানছেন, টাইগাররাই এগিয়ে। কিন্তু লর্ডস হলেই পাকিস্তান কেন জানি গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। কেউ কেউ একটাকে মোহাম্মদ আমিরের মাঠও বলে থাকে! পাকিস্তান ক্রিকেটের গাদা গাদা সুখস্মৃতি এখানে। হয়তো এ কারণেই আজ লর্ডসের ডান কোনার ব্যালকনিটা পাচ্ছে পাকিস্তান ‘হোম ভেন্যু’ হিসেবে। আর বাঁ দিকেরটা বাংলাদেশ। অ্যাওয়ে ম্যাচ বলেই আজ প্রথমবারের মতো এই আসরে লাল জার্সিটা পরবেন মাশরাফিরা। এই ম্যাচে পাকিস্তানের সেমিতে যাওয়ার একটা কঠিন (কঠিনের চেয়ে কঠিন শব্দ কি আছে, এ মুহূর্তে ঠিক মনে আসছে না) অঙ্ক আছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তান আগে ব্যাটিংয়ে নেমে যদি ৩৫০ রান করে, তাহলে সাকিবদের হারাতে হবে ৩১১ রানের ব্যবধানে। পাকিস্তান ৪০০ রান করলে জিততে হবে ৩১৬ রানের ব্যবধানে। আর ৪৫০ রান করলে পাকিস্তানকে জিততে হবে ৩২১ রানে! লর্ডসের গার্ডেনে গা এলিয়ে বসে এই অঙ্কগুলো নিয়েই গল্প হচ্ছিল কিছু পাকিস্তানি সাংবাদিকের সঙ্গে। হাসির রোল সেখানেই। বাংলাদেশ যদি টস জিতে আগে ব্যাটিং করে তাহলে এই অঙ্কগুলোও মুছে যাবে। কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না পাকিস্তানের।

অবশ্য এসব অঙ্ক নিয়ে কোনো আগ্রহই নেই টাইগারদের। তাদের জন্য এই ম্যাচ লর্ডসের বারান্দায় জয়োল্লাস করার। এর আগে এ মাঠেই তামিম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন। অনার্স বোর্ডে তার নামটিও রয়েছে। লর্ডসের সঙ্গে একটি মিষ্টি সম্পর্ক আছে তামিমের। গতকাল মাঠে এসেই প্রথমে পিচের কাছে চলে যান তিনি। খুব কাছ থেকে সময় নিয়ে দেখতে থাকেন তামিম। কোনো কথা হয়েছিল কি ওই বাইশ গজের সঙ্গে? প্রেসবক্সে বসে তা বোঝা যায়নি। তবে এটা আন্দাজ করা যেতেই পারে যে, একটি বড় ইনিংস, একটি ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলতে চাইছেন তিনি। ভারতের সঙ্গে আগের ম্যাচে ক্যাচ মিস করে এমনিতেই খুব কথা শুনতে হয়েছে। সেই সঙ্গে দল তার কাছে যে প্রত্যাশা করেছিল, সেটাও দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে লর্ডসে একটি সেঞ্চুরি অনার্স বোর্ডে আবারও নাম উঠতে পারে তামিম ইকবালের। তামিমের মতো মুশফিকও এসেছিলেন কাল ওই পিচের কাছে। এজবাস্টনের মতো বাদামি নয়, দূর থেকে সবুজ ঘাসের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। এটা কি তাহলে মোহাম্মদ আমিরের জন্যই অপেক্ষা করছে? নাকি তামিমের জন্য? নাকি মাশরাফির মঞ্চ হয়ে থাকবে লর্ডস সাহেব!

ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে পাকিস্তান কিন্তু নিজেদের বেশ উজ্জীবিত রেখেছে। ভারত যদি সেদিন ইংল্যান্ডের সঙ্গে হেরে না যেত তাহলে আজকের এ ম্যাচটিই হতে পারত বিশ্বকাপের অলিখিত ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’ ম্যাচ। ওই ম্যাচ ঘিরে পাকিস্তানের আক্ষেপ এখনও প্রবল। প্রথম চার ছেড়ে দিয়ে আজকের ম্যাচটি তাই ‘পঞ্চম’ হওয়ার। যে সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে রাজি নয় টাইগাররা। ‘হতে পারে বিশ্বকাপের আসরে এটা অর্থহীন ম্যাচ; কিন্তু আমাদের কাছে এটা মর্যাদার ম্যাচ। পাকিস্তানকে হারিয়ে আমরা আসরের শেষটাও স্মরণীয় করে রাখতে চাই। তাদের হারানোর অভিজ্ঞতা একেবারে টাটকা আমাদের। এশিয়া কাপেই পাকিস্তানকে হারিয়েছি আমরা’- গতকাল লর্ডসের সংবাদ সম্মেলনে এসে খুব জোরের সঙ্গেই কথাগুলো বলেছেন টাইগারদের ইংলিশ কোচ স্টিভ রোডস। ইসলামাবাদ থেকে আসা এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে হাসতে হাসতেই বলেছেন, ‘আমরা শুরুটা করেছিলাম দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর মধ্য দিয়ে এই লন্ডন থেকেই। সেই লন্ডনেই শেষটাও পাকিস্তনাকে হারিয়ে একটা সুখী মন নিয়ে দেশে ফিরতে চাই। বাংলাদেশের সতেরো কোটি মানুষের ভালোবাসার এই দল। চাপ থাকবেই; কিন্তু সেটা কাটিয়েই আমরা শেষ ম্যাচটি জিতে ফিরতে চাই।’

আজ পাকিস্তানকে হারালে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়বে টাইগাররা। এর আগে ২০০৭ আর ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ তিনটি করে ম্যাচ জয়ের স্বাদ আছে। এবার এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আফগানিস্তানকে হারিয়ে সেটা ছাপিয়ে গেছে। শ্রীলংকার ম্যাচটি বৃষ্টিতে ধুয়ে না গেলে সংখ্যাটি অবশ্যই বাড়তে পারত। আজ পাকিস্তানকে হারিয়ে চার জয়ের রেকর্ড নিয়েই বাড়ি ফিরতে চায় টাইগাররা। তবে কাল অনুশীলনের সময় কনুইয়ে চোট পাওয়া মুশফিক যখন তোয়ালে দিয়ে হাত বেঁধে ড্রেসিংরুমে ফেরেন, যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে স্ক্যান করাতে যান- তখন মনে হচ্ছিল, আজ মাশরাফির বিদায়ী মঞ্চে খেলতে পারবেন কি মুশফিক। যদি তিনি না-ই খেলতে পারেন তাহলে হয়তো লিটনকে কিপিং গ্লাভস দিয়ে দলে ফেরানো হবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে যা বলা হয় তাই বলা হয়েছে- আজ ম্যাচের আগে মুশফিককে সর্বশেষ দেখা হবে।

বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ বলেই অযথা কোনো ঝুঁকি নেওয়া হবে না, কেননা কালই ঢাকা থেকে খবর এসেছে, ২৫ জুলাই কলম্বো যেতে হবে, সেখানে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ রয়েছে শ্রীলংকার সঙ্গে। সেই যাত্রায় মাশরাফি সঙ্গী হবেন কি-না, কেউ বলতে পারছেন না। তাই আজ রাজসিক লর্ডসেই তার বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচেই দলের প্রত্যেকে কিছু না কিছু দিতে চান। কান কথা নয়, ড্রেসিংরুমের টাইগাররা তাদের হৃদয়ের কথাতেই সাড়া দিতে চান।