ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের জন্য শিশু শিক্ষাকেন্দ্র


156 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের জন্য শিশু শিক্ষাকেন্দ্র
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

‘আমি হব সকাল বেলার পাখি। সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি। সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে, হয়নি সকাল, ঘুমো এখন, মা বলবেন রেগে!……..’ দূর থেকেই কানে ভেসে আসছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি হব’ কবিতাটি। কাছে গিয়ে দেখা গেল, টিনশেড একটি ঘরে বিভিন্ন বয়সী ৩০/৩৫ জনের মতো শিক্ষার্থী। ছোট ছোট কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বসেছে তারা। এ শিক্ষার্থীদেরই একটি দল আবৃত্তি করছিল ২য় শ্রেণির এই কবিতাটি। অন্যদের দেখা গেল, আঁকাআঁকি-লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। কেউ আবার কোনো কিছু বুঝতে না পারলে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করছে, ‘স্যার এটা কী?’ স্যারও হাসিমুখেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন সব। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের ঝাপালী গ্রামের শিশুকেন্দ্রের চিত্র এটি।
বে-সরকারী সংস্থা উত্তরণের Educo (Prevention and Elimination of Hazardous From of child labour in Costral Areas of Bangladesh) প্রকল্পের বাস্তবায়নে এবং এডুকো বাংলাদেশ-এর অর্থায়নে বিপদজনক শ্রম চিংড়ী, কাঁকড়া ও মাছ ধরার কাজে জড়িত শিশুদের নিয়ে কাজ করা শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি, মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা ইউনিয়নের ৪ গ্রামে ৪ টি শিশুকেন্দ্র পরিচালনা হচ্ছে। ৪টি শিশুকেন্দ্র সকাল ও বিকাল দুই শিফটে ২য় থেকে ৪র্থ শ্রেণির ক্লাস পরিচালনা করা হয়।
একযোগে চলছে শিশুদের ঝরেপড়া রোধে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম। গ্রামের ভাড়া করা ছন-বাঁশ-টিনের স্কুল ঘরগুলোর কাঁচা মেঝেতেই শিশুরা সুশৃঙ্খলভাবে ক্লাস করছে। শিশুকেন্দ্র গুলোর শিক্ষার মান এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুন্দর আচরণে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। বিপদজনক কাজে নিয়োজিত বিশেষ করে এতিম, পিছিয়ে পড়া ও ঝরেপড়া শিশুদের কাছে এখন আদর্শ বিদ্যাপীঠ ৪টি শিশুকেন্দ্র।
উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার অলোক পাল জানান, প্রকল্পের আওতায় ৫-১৭ বছর বয়সী চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে শ্যামনগর দুর্গম এলাকায়। চলতি বছরের শুরুতেই অত্র প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় কিন্তু জানুয়ারী ২০২১ থেকে বিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও করোনা কালীন সময়ে সরকারী নির্দেশনা মোতাবেক সকল বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সেপ্টেম্বর ২০২১ মাসে অত্র উপজেলায় ৪টি ইউনিয়নে ৪টি শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩৫০ জন শিশুকে নিয়ে শিশুকেন্দ্রের কার্যক্রম চালু হয়েছে। এই ৩৫০ জন শিশুর মধ্য থেকে ১৪-১৭ বছর বয়সের উপরের ৫০ জন শিশুকে ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল সার্ভিসিং ও দর্জি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এখানে সকল শিক্ষার্থী কাজের পাশাপাশি তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক মিলে একটি ২১ সদস্য বিশিষ্ট শিশু সুরক্ষা কমিটি রয়েছে। তারা শিক্ষা কেন্দ্রর ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয় তদারকি করে থাকেন।
উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমরা প্রথমে ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি ৫-১৭ বছর বয়সী ঝুঁকিপূর্ণ চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রমের শিশুদের ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর হার কেমন। আর্থিক অসচ্ছলতা, স্থানান্তরিত হওয়া, পরীক্ষাভীতিসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে কিংবা স্কুলে যায় না। এরপর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলা হয়। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষাকেন্দ্রে আনা হয়। এছাড়া প্রতিটি কার্যএলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠন করা হয় সিবিসিপিসি বা শিশু সুরক্ষা কমিটি।
তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রে দুই শিফটে প্রায় ৯০ জন বাচ্চাকে ভর্তি করানো হয়। ৪টি কেন্দ্রে ৮ জন শিক্ষক রয়েছে, এরমধ্যে ৬ জন নারী ও ২ জন পুরুষ শিক্ষক। দৈনিক সকালে তিন ঘণ্টা ও বিকালে তিন ঘন্টা করে মোট ৬ ঘন্টা শিশুদের শেখানো হয়। এখানে শিশুদের শিক্ষাটা তার জীবনে স্থায়ী হয় বলে মনে করেন তিনি।
কাশিমাড়ি ইউনিয়নের ঝাপালী গ্রামে শিশু শিখন কেন্দ্রে আরও দেখা যায়, প্রায় ২০ হাত লম্বা একটি দোচালা টিনের ঘর। ঘরটির ভেতর ৩০/৩৫ জন শিশু। সবাই পড়া লেখায় ব্যস্ত। মোঃ আরিফুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। এ শিখন কেন্দ্রের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা খাতুন, নাহিদা মীম, ফয়সাল হোসেন, আহসান হাবীবসহ কয়েকজন জানায়, শিশু শিখন কেন্দ্রে পড়তে তাদের ভালো লাগে। কারণ বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি তারা এখানে পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছে। উপকূলীয় এলাকার এই শিশু আয় করার পাশাপাশি শিখন কেন্দ্রে বাচ্চাদের পড়াতে পেরে স্থানীয়দের মাঝেও উৎসাহ দেখা যায়।
স্থানীয় শিশু সুরক্ষা কমিটির সভাপতি মোঃ জামাত আলী বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা বিদ্যালয়টি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা অনেক স্বপ্নের মাঝে এলাকার প্রতিটি শিশুর হৃদয়ে শিক্ষার আলো জ্বেলে দেওয়ার স্বপ্নও দেখি। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ঝরেপড়া শিক্ষাবিমুখ শিশুদের কাছে এখন আদর্শ শিক্ষার বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে শিশুকেন্দ্রটি। উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের প্রকল্প শেষ হয়ে গেলেও আমাদের শিশুদের জন্য এই শিখন কেন্দ্রটি চালু রাখতে হবে। প্রয়োজনে আমরা গ্রামবাসী মিলে চাঁদা দিয়ে শিশু শিখন কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে চালু রাখবো।’
আরেক শিক্ষিকা মাশকুরা খাতুন জানান, প্রতিদিন সকাল এবং বিকাল দুই শিফটে ২ জন শিক্ষক মিলে দুটি ক্লাস নেয়া হয়। স্থানীয় শিশু সুরক্ষা কমিটি ও অভিভাবকগণ শিশুদের মূল্যায়ন দেখতে আসেন এবং খোঁজ-খবর নেন। উক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনসহ কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
শ্যামনগর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সোহাগ হোসেন জানান, মূলত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত স্কুল বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটি দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া উপকূলীয় এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, এখানে ২ জন শিক্ষক মিলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। ফলে শিক্ষককে শিক্ষার্থী সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যেটা পাঠের ক্ষেত্রে খুবই কাজে লাগে।
কাশিমাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান এসএম আব্দুর রউফ বলেন, উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের এই কার্যক্রম উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। আমারা উক্ত শিখন কেন্দ্রের কার্যক্রমের নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি। উক্ত স্কুল যাতে স্থায়ী রূপ পায় সেজন্য সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলে জানান তিনি।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি