টাইগাররা উজ্জীবিত আত্মবিশ্বাসী


468 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
টাইগাররা উজ্জীবিত আত্মবিশ্বাসী
জুলাই ৫, ২০১৫ খেলা
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডেস্ক :
নিজেদের অফিসে বসেই দূরের ছবিগুলো দেখছিলেন দুই নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন আর মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। মাঠের একদিকে বোলিং করছেন রুবেল-মুস্তাফিজরা, আর একাডেমিতে ব্যাটিং করতে যাচ্ছেন সাকিব-তামিমরা। গল্পচ্ছলে সেখানেই উঠে এসেছিল আগের দিন ফতুল্লার প্রস্তুতি ম্যাচটি। কেউ একজন বলছিলেন, প্রোটিয়া পেসাররা যেভাবে বোলিং করেছে, সেখানে মিরপুরে যে কী হবে? নড়ে বসেছিলেন হাবিবুল বাশার- ‘আমাদেরও সৌম্য আছে…।’ আত্মবিশ্বাস ঠিকরে বেরিয়েছিল তার মধ্য থেকে।

ঠিক মনের এ জোরটাই এখন বড় অস্ত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের, যা দিয়ে আজ দুপুরে মিরপুরে আফ্রিকান সিংহদের মুখোমুখি হবে বাংলার টাইগাররা। টি২০ ম্যাচে প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা যেখানে ধারে এবং ভারে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে, অতীত পরিসংখ্যান যেখানে কথা বলছে প্রোটিয়াদের হয়ে, সেখানে মাশরাফি তুড়ি মেরেছেন এই বলে যে, ‘ভারতকে ওয়ানডেতে হারিয়ে যে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে ছেলেদের মধ্যে, সেটা ধরে রাখতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গেও ভালো ফল আসবে।’ মুখে শুধু ‘জয়’ শব্দটি উচ্চারণ না করে মাশরাফি সূক্ষ্ম পার্থক্য এঁকে দিয়েছেন ‘ভালো ফল’-এ! এটা কি সচেতনতা না সতর্কতা? নাকি সিরিজ শুরুর আগে প্রত্যাশার চাপ থেকে দূরে থাকার কোনো কৌশল?

আসলে গত জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে বিশ্বকাপ হয়ে পাকিস্তান, এবং সর্বশেষ ভারত। সব সিরিজেই দারুণ ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে টাইগাররা। তাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগেও সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। কিন্তু যে দলে এবি ডি ভিলিয়ার্সের মতো টি২০ ফরম্যাটের সুপারম্যান রয়েছেন, যে একাদশে ডু প্লেসিস, ডুমিনি, ডেভিড মিলার, ডি ককের মতো আইপিএল বাজিমাত করা ব্যাটসম্যান রয়েছেন, সে দলকে মিরপুরের কন্ডিশনের ভয় দেখিয়ে কতটা কাবু করা যায়, তা নিয়ে ক্রিকেটবোদ্ধাদেরও ঘাম ছুটে যাওয়ার কথা।

তার ওপর এ মিরপুরেই সর্বশেষ দু’দলের দেখায় ৭৮ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার একটা বিশ্রী অতীত আছে সাকিবদের। সেই ২০১১ সালের বিশ্বকাপে। শুধু ব্যাটিংই নয়, ওয়েন পারনেল, রাবাডা, কাইল অ্যাবোটরা মিলিয়ে পেস অ্যাটাকে ভরপুর চার্জ দিয়ে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আবেগে ভাসলেও এই বাস্তবতা তো স্বীকার করতেই হচ্ছে মাশরাফিকে। তা ছাড়া টি২০ হলো ক্রিকেটের সেই ফরম্যাট, যেখানে ব্যাকরণের বাইরে গিয়ে পেশি ফুলিয়ে ব্যাট চালাতে হয়, যেখানে বোলিংয়ের হিসাব লিপিবদ্ধ করতে হয় রান খরচের খতিয়ানে, সেখানে ম্যান্ডেলার দেশের এই ছেলেরা একেবারে ফার্স্ট বেঞ্চের ছাত্র। যদিও টি২০ র‌্যাংকিংয়ে তারা ছয় নম্বরের দল; কিন্তু এই দলটির একাধিক ক্রিকেটার নিয়মিত আইপিএল, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগ, বিগ ব্যাশের মতো বাজারি টুর্নামেন্ট খেলে থাকেন। তাই তাদের বশে আনতে হলে যে গণিতের সাধারণ বই রিভাইস দিলে হবে না, সেটা জেনে গেছেন বাংলাদেশের কোচ হাথুরুসিংহে।

তাই তিনি ভারত-বধের পেস তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের সেই সনাতনী স্পিন তত্ত্বের শরণাপন্ন হয়েছেন। একটি হিসাব কষে তিনি বের করেছেন, ২০১১ সালের পর উপমহাদেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা দল মোট ১৩টি ওয়ানডে খেলেছে, যার মধ্যে পেস বোলিংয়ের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেট পড়েছে ৩৯টি আর স্পিনারদের সামনে ৬২টি। মিরপুরের কিউরেটর গামিনি ডি সিলভাকে এরই মধ্যে বলে দেওয়া হয়েছে সেভাবে পিচ প্রস্তুত রাখতে। বল যাতে ধীরে নিচু হয়ে আসে, সে দিকটাও খেয়াল রাখতে বলেছেন হাথুরু।

সেভাবে প্রস্তুতও করা হয়ে গেছে মিরপুরের মঞ্চ। গতকাল দুপুরে দক্ষিণ আফ্রিকা দল যখন অনুশীলনে আসে, মিরপুরে তখন প্রথমেই সেন্টার উইকেটের পাশে একটি পিচ বেছে নিয়েছিলেন ডু প্লেসিস। সেখানে পারনেল আর রাবাডার বল পরে নিচু হয়ে আসছিল, যা দেখেশুনে প্রোটিয়া পেস বোলিং কোচ ল্যাঙ্গাভেল্ট নির্দেশ দেন সবাইকে ইয়র্কার অনুশীলনের। বাংলাদেশ দলও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। তিন পেসার- মাশরাফি, রুবেল আর মুস্তাফিজের সঙ্গে লেগস্পিনার জুবায়ের আহমেদ। এ ছাড়া সাকিব, নাসির তো থাকছেই। প্রয়োজনে সোহাগ গাজীকেও নামানো হতে পারে।

স্পিনারদের তৈরি করার পাশাপাশি এদিন বোলারদের টি২০ নতুন নিয়ম সম্পর্কেও আরও একবার অবহিত করেছেন কোচ হাথুরু। আইসিসির নতুন নিয়ম অনুযায়ী আজই প্রথম আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচ খেলা হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি নো বলেই ফ্রি হিটের সুবিধা থাকছে। আগে কেবল ওভার স্ট্যাপিং করলেই ফ্রি হিট পাওয়া যেত, আজকের ম্যাচে বুকের ওপর ওঠা বল যদি ‘নো’ ডাকা হয়, তাহলেও তার পরের বলটি ফ্রি হিট পাবেন ব্যাটসম্যানরা। এ ব্যাপারে সতর্ক থেকেই বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে একটি লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমে ব্যাটিং পেলে তাদের ১৪০-১৫০-এর মধ্যে আটকে রাখতে হবে।

১৬০ ছুঁলেও বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা তা তাড়া করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেটা যদি ১৮০-১৯০ হয়ে যায়, তাহলে তা ব্যাটসম্যানদের জন্য একটু কঠিনই হয়ে যাবে, ‘আমি এখনও মনে করি, বোলাররাই টি২০ ম্যাচ জেতানোয় বড় ভূমিকা রাখে। আমরা যদি ভিলিয়ার্সকে দ্রুত ফেরাতে পারি এবং ওদের স্কোর দেড়শ’ কাছাকাছি রাখতে পারি, তাহলে আমাদের ব্যাটসম্যানরা ভালো একটা সুযোগ পাবে।’ মাশরাফি মনে করেন, প্রোটিয়াদের রুখতে হলে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলতে হবে, যেমনটা খেলে এসেছেন তারা গত সিরিজগুলোতে। কেননা, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের রেকর্ড খুবই নগণ্য। টেস্ট, ওয়ানডে আর টি২০ মিলিয়ে আফ্রিকান এই প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোট ২৫টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। জয় এসেছে কেবল একটিতে, ২০০৭ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক জয়, ‘অতীত কখনও আমাকে অনুপ্রেরণা দেয় না। সেটা ভালো হলেও না।

আমি বিশ্বাস করি, ম্যাচের দিন কে কতটা ভালো খেলছে তার ওপর ফল নির্ভর করে। যদি অতীতের পরিসংখ্যান দেখেন, তাহলে পাকিস্তানকেও তো আমরা এবার টি২০ ম্যাচে হারিয়েছি, যেটা অধরা ছিল। আসলে ম্যাচের দিন মাঠে কে কতটা ভালো খেলছে তার ওপরই নির্ভর করে ফলাফল। আমরা এটুকু বলতে পারি, সর্বোচ্চ দিয়ে লড়ব আমরা…।’ সংবাদ সম্মেলনে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন ডু প্লেসিস, বাংলায় বলা মাশরাফির এ কথাগুলো তার বোঝার কথা নয়। কিন্তু মাশরাফির চোখের আগুন নিশ্চয় বুঝে নিয়েছেন তিনি। সেখানে জ্বলজ্বল করছিল আত্মবিশ্বাস।
সূত্র : সমকাল অন লাইন