টিকা কর্মসূচিতে হোঁচট


135 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
টিকা কর্মসূচিতে হোঁচট
এপ্রিল ২৬, ২০২১ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আজ থেকে প্রথম ডোজ বন্ধ

দ্বিতীয় ডোজেও ঘাটতি ১৪ লাখের বেশি

অনলাইন ডেস্ক ::

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকাদান কর্মসূচি হোঁচট খেল। আজ সোমবার থেকে প্রথম ডোজ টিকাদান কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে সরকার। তবে প্রথম ডোজ যারা নিয়েছেন, তারা দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এমএনডিঅ্যান্ডএইচ) ডা. শামসুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গতকাল প্রথম ডোজ টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। দেশের সব জেলার সিভিল সার্জন, সিটি করপোরেশনগুলোর প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সব উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তার কাছে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা প্রদান সাময়িক বন্ধ থাকবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মজুদ কমে আসা ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে চুক্তি অনুযায়ী কেনা টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রথম ডোজ দেওয়া স্থগিত রাখা হচ্ছে। প্রথম ডোজ যারা নিয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা না এলে দুটি ডোজ চলমান রাখলে দ্বিতীয় ডোজে গিয়ে ঘাটতি পড়বে। এ কারণে শুধু দ্বিতীয় ডোজ চলমান থাকবে। আবার টিকা এলে দুটি ডোজ একসঙ্গে চলবে।

দ্বিতীয় ডোজে ঘাটতি ১৪ লাখের বেশি: ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা ও উপহার মিলিয়ে এ পর্যন্ত এক কোটি দুই লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা কোভিশিল্ড পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দিতে হলে এক কোটি ১৬ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ ডোজ টিকার প্রয়োজন।

গতকাল রোববার পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ জন। প্রথম ডোজ নেওয়ার আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত ৮১ লাখ ৪৫ হাজার ২৬৬ ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য আরও ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৪ ডোজ টিকার প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারের হাতে মজুদ আছে ২০ লাখ ৫৪ হাজার ৭৩৪ ডোজ টিকা। ফলে আরও ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ ডোজ টিকার ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ২১ লাখ ডোজ টিকা আসবে বলে তার উদ্ৃব্দতি নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এটি সঠিক নয়।

মহাপরিচালক বলেন, ‘প্রথম ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার মতো টিকা মজুদ আছে কিনা- একজন সাংবাদিক তা জানতে চেয়েছিলেন। তার জবাবে আমি বলেছিলাম, প্রায় ২০ লাখ ডোজের মতো ঘাটতি আছে। তখন ওই সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ওই ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে? এর জবাবে আমি বলেছি, বেক্সিমকোর সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা বলেছে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ২০ লাখ ডোজ টিকা সেরাম পাঠাবে বলে জানিয়েছে। ওই টিকা পেলে দ্বিতীয় ডোজে ঘাটতি থাকবে না। একই সঙ্গে কোভ্যাক্স থেকে আরও এক লাখ ডোজ ফাইজারের টিকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আশা করি, ওই টিকা পেয়ে যাব।’

গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু করে সরকার। প্রথম ডোজ টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ শুরু হয় ৮ এপ্রিল। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা বাংলাদেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ওই টিকার তিন কোটি ডোজ কেনার জন্য সরকার, সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকোর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ছয় মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা বাংলাদেশে সরবরাহ করার কথা সেরাম ইনস্টিটিউটের। এ হিসাবে টিকার প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ আসে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। এর আগে ভারত সরকারের উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে ২০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ২০ লাখ ডোজ টিকা। অর্থাৎ ৩০ লাখ ডোজ কম আসে। এরপর ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার ফলে সে দেশের সরকার টিকা রপ্তানি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ফলে মার্চে কোনো টিকা আসেনি। ফলে মার্চ পর্যন্তই চুক্তি অনুযায়ী ৮০ লাখ ডোজ টিকা কম পেয়েছে বাংলাদেশ। এপ্রিলে টিকা না এলে এই ঘাটতি এক কোটি ৩০ লাখে দাঁড়াবে।

কূটনৈতিক স্তরে আলোচনায় যে তথ্য এসেছে, তাতে বলা হয়েছে আপাতত টিকা রপ্তানি করবে না ভারত। সুতরাং বাংলাদেশের টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলো। এরপরই গতকাল প্রথম ডোজ টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় সরকার।

ভারতের টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার ফলে বাংলাদেশ টিকা সংগ্রহে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া ও চীন। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি টিকা পেতে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। ওই চুক্তি অনুযায়ী, টিকার প্রযুক্তি সরবরাহ করবে রাশিয়া আর টিকা উৎপাদন করবে বাংলাদেশ। তবে প্রযুক্তির বিষয়টি গোপন রাখতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের চাহিদা মিটিয়ে যে টিকা উদ্বৃত্ত থাকবে তা বাংলাদেশ-রাশিয়া যৌথভাবে রপ্তানি করবে।

বাংলাদেশের ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, পপুলার ও হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের টিকা উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ল্যাবটির প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই চারটি প্রতিষ্ঠানে একযোগে টিকা উৎপাদন হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি এখন রাশিয়াকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এর সঙ্গে চীনের টিকাও নিতে চাইছে বাংলাদেশ। এজন্য চীনের নেতৃত্বে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। জরুরি প্রয়োজনে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকা সংগ্রহ করা যাবে। চীনের ছয়টি টিকা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বাইরে মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন ও ফাইজারের টিকা পেতেও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মোট কথা টিকা নিয়ে একটি কিংবা দুটি উৎসের ওপর আর নির্ভরশীল থাকতে চায় না সরকার।

তবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং ফাইজার ছাড়া অন্য কোনো টিকা এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএসহ সাতটি দেশ ও সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো ওষুধ ও টিকা বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সরকার ওই নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।

দেশে টিকা ব্যবহারের সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ কমিটি ন্যাশনাল ইম্যুনাইজেশন টেকনিক্যাল গ্রুপের (নাইটেগ) পক্ষ থেকেও সরকারকে নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছে। নীতিমালায় পরিবর্তন আনলে যে কোনো দেশের টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা থাকবে না। নাইটেক বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যে টিকাটি গুণগত মানসম্পন্ন মনে করবে সেটি গ্রহণ করতে পারবে বাংলাদেশ। তবে ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে প্রয়োগের পর তার কার্যকারিতা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের বাইরে কোনো টিকা গ্রহণ করা হবে না- এটি সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ফাইজার, মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ছাড়া আর কোনো টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়নি। কিন্তু অক্সফোর্ড ছাড়া অন্য টিকাগুলোর সংরক্ষণ সুবিধা আমাদের দেশে নেই।

একমাত্র অক্সফোর্ডের টিকাটির সংরক্ষণ সুবিধা আছে। এ হিসেবে এই টিকাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিন কোটি ডোজ কিনতে সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী টিকা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আমাদের হতাশ করেছে। টিকা পেতে ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করি পজিটিভ রেজাল্ট আসবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সেরাম থেকে টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আমরা বিকল্প উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ, সরকারের লক্ষ্য সব মানুষকে টিকার আওতায় আনা। এজন্য একাধিক উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগের পর কার্যকারিতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। যে টিকাটির কার্যকারিতা ভালো এবং দ্রুততম সময়ে পাওয়া যাবে, সেই টিকাগুলো নেওয়া হবে। এতে ভবিষ্যতে টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে আর কোনো সংকটে পড়তে হবে না বলে মনে করেন তিনি।