তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক


385 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক
আগস্ট ২০, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভেয়স অব সাতক্ষীরা ডটকম :
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে আইনটি ২০০৬ সালে যে উদ্দেশ্যে করা হয় তারও বিপরীত এ ধারাটি। দেখা গেছে, ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে বর্ণিত মানহানির মামলার চেয়েও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একই অপরাধের জন্য শাস্তির মেয়াদ অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনে এ ধারাটি অসঙ্গতিপূর্ণ। ফলে এর অপব্যবহার হচ্ছে বেশি। যে কারণে পুরো আইনটি বিতর্কিত হচ্ছে। তারা অবিলম্বে ৫৭ ধারা বাতিল অথবা সংশোধনের মাধ্যমে অপরাধের ধারাগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তিজনিত অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। না হলে শুধু আইন দিয়ে এ ধরনের অপরাধ দমন সম্ভব হবে না। বরং লঘুপাপে গুরুদণ্ডের শিকার হবে সাধারণ মানুষ। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করা উচিত। তা না হলে এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হয়রানির আশঙ্কা থেকে যাবে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন, সংবিধান ও ফৌজদারি দণ্ডবিধি :সংবিধানের ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের

দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
অন্যদিকে ২০০৬ সালে প্রণীত এবং ২০১৩ সালে সংশোধিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(১) উপধারায় বলা হয়, ‘কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যাহা মিথ্যা, অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃংখলার অবনতি ঘটে বা ঘটার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ ৫৭(২) উপধারায় বলা হয়, ‘কোন ব্যক্তি উপধারা(১) অনুযায়ী অনধিক ১৪ বছর, নূ্যনতম ৭ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
এই ধারায় বর্ণিত মানহানির বিষয়ে শাস্তি ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫০১ ধারাতেও বর্ণনা করা হয়েছে। ৫০১ ধারায় বলা হয়, ‘কেউ যদি এমন কিছু মুদ্রণ করে এবং যা বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গতভাবে কোন ব্যক্তির মানহানির কারণ ঘটিয়েছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে মুদ্রণকারী সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

এ ব্যাপারে ব্যাখা দিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিবুল আলম সমকালকে বলেন, সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার সীমা আইন দ্বারা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে তার সীমারেখা নির্ধারণ করে শাস্তির মেয়াদও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে আবারও মানহানির সীমারেখা নির্ধারণ অযৌক্তিক এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, যারা কোনো ব্যক্তির আপত্তিকর বা বিকৃত ছবি বা ভিডিওচিত্র প্রকাশ করেন, যেটা তার জন্য, জীবনের জন্য নিরাপত্তার হুমকি হয় কিংবা বড় ধরনের সামাজিক সংকট সৃষ্টি করে, তবে সেটা গুরুতর অপরাধ। কিন্তু কারও সমালোচনা করাকে একইভাবে গুরুতর অপরাধ বলা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, শাস্তি হয় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় অপরাধের গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে শাস্তির বিধান করা হয়নি। আপনি কারও মতের সমালোচনা করলেন, কোনো সংগঠন বা দেশের নীতির সমালোচনা করলেন, সেক্ষেত্রে কেউ যদি মনে করে তার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন তাহলে এ আইনের আওতায় তার বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ আছে যার নূ্যনতম শাস্তি সাত বছর। এ কারণেই এই ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ এই ধারার মাধ্যমে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। যদি এ আইন সংশোধন করা হয়, তাহলে অবশ্যই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনার বিষয়টি আগে সুনির্দিষ্ট করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, একই অপরাধের জন্য মুদ্রিত বিষয়বস্তুর জন্য ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে এক ধরনের শাস্তি আর তথ্যপ্রযুক্তি আইনে আর এক ধরনের শাস্তির বিধান হতে পারে না। এ ধরনের আইন দুনিয়ার কোথাও নেই।

প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার জানান, ২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনটি করা হয়েছিল ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিষয়ের জন্য। এক্ষেত্রে ৫৭ ধারাটি একেবারেই সঙ্গতিহীন। এ ধারাটি এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে অপব্যবহারের অবারিত সুযোগ রাখা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমেই প্রবীর সিকদারের মতো সাংবাদিককে হয়রানি করা হয়েছে, যেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। তিনি আরও জানান, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামে নতুন একটি আইন হতে যাচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তার বিষয়গুলো আরও বেশি সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট রাখা হবে। ৫৭ ধারার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি পক্ষ তাদের জানিয়েছেন।

সাইবার প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন সাবির এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন মতপ্রকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানহানির অস্বচ্ছ ধারণা দিয়ে কঠোর শাস্তির প্রয়োগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে যারা অপরাধ দমন করবেন, তাদের প্রযুক্তি বিষয়ে আরও বেশি দক্ষ হতে হবে। অপরাধকে প্রচলিত ব্যবস্থার মতোই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিকে মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করে সেই বিবেচনায় শাস্তি নির্ধারণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ব্যবহার :২০১৩ সালে এ আইনের ৫৭ ধারায় শাস্তির মেয়াদ বাড়ানোর সময় তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র প্রকাশের মাধ্যমে নারীদের ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা বেড়ে গেছে। এর জন্য অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করছেন, এ ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনের জন্যই আইনটি কঠোর করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ দমনে এ আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে উগ্র মতাদর্শ প্রচার, বিশিষ্ট ব্যক্তি বা মুক্তমনা ব্লগারদের হত্যার হুমকিদাতাদের ৫৭ ধারায় অভিযুক্ত করতে দেখা যায়নি। বরং এ আইনে আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার দায়ে মুক্তমনা ব্লগারদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সর্বশেষ এ আইনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য ‘সুনাম ক্ষুণ্নের’ অভিযোগে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ঢাকা থেকে ফরিদপুরে নিয়ে পুলিশ রিমান্ডে পাঠানো হয়। এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠায় গতকাল বুধবার তিনি জামিনে মুক্ত হন। এ ঘটনায় সমাজের সর্বস্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি আবারও জোরালো হয়েছে।

সূত্র- সমকাল অনলাইন