তালার তেঁতুলিয়ায় ‘সিকান্দার মেলা’ উদ্ভোদন


441 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
তালার তেঁতুলিয়ায় ‘সিকান্দার মেলা’ উদ্ভোদন
মার্চ ২০, ২০১৭ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আব্দুর রহমান ::

সঙ্গীত রচয়িতা, কথা সাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন গণ মানুষের কবি। দীপ্তপ্রভায় আলোকিত হয়ে তিনি লেখকদের লেখক হিসেবে পরিচিত। কবি সিকান্দার আবু জাফর শুধু একজন সাহিত্যিক ছিলেন না, তাঁর হাতে বহু সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে। তাঁর অসাধারণ লেখাগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুকাল। বহু কারণে তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। কবি সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন বাংলা ও বাঙালী’র এক অনাবদ্য সৃষ্টি। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণের এক উজ্জল নক্ষত্র। সমাজ সচেতন কবি সিকান্দার আবু জাফর রাষ্ট্র জীবনের পরিবর্তে সুস্থির, লিলুয়া বাতাসে শীতল, ভোরের নির্মল আলোয় ¯œাত পরিবার থেকে এসেছিলেন। তিনি সামাজিক জীবনে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন অশুভ ও অন্ধকারের শক্তির মোকাবেলায়। নিরন্তর শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন সমাজের নিভৃত মানুষদের। তিনি একটি আলোকিত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে নিজের আলোয় নিজেই আলোকিত হয়েছেন।
খুলনা জেলার (বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার) তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের আ¤্রকাননের ‘হাশেমী বাড়ি’তে ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। পূর্ণ নাম সৈয়দ আল্ হাশেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকান্দার। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মঈনুদ্দীন হাশেমী ও মাতা জাহেদা খাতুন। তাঁর চাচা সৈয়দ জালালুদ্দীন হাশেমী ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের ডেপুটি স্পিকার। পিতামহের নাম হাশেমী সৈয়দ আলম শাহ।
স্থানীয় বি.ডি ইংরেজি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত কলকাতার ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্যদিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। সিকান্দার আবু জাফর ছাত্রজীবন থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা শুরু করেন এবং সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৩ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’র সহযোগী সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে ‘দৈনিক মিল্লাত’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ থেকে আজীবন দেশের প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র ‘সমকাল’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তিনি তাঁর ‘সমকাল’ পত্রিকা ব্যবহার করতেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। এ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ত্রিশোত্তর ধারার প্রগতিশীল মুক্ত সাহিত্য ধারার বিকাশ, আন্দোলন এবং নতুন লেখক সৃষ্টিতে প্রেরণা দিতেন। সফল সম্পাদক হিসেবেও  সিকান্দার আবু জাফর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
তার প্রকাশিত রচনাবলী : প্রসন্ন প্রহর (১৯৬৫), বৈরী বৃষ্টিতে (১৯৬৫), তিমিরান্তিক (১৯৬৫), বৃশ্চিক লগ্ন (১৯৭১) ও বাংলা ছাড়। নাটক : শকুন্ত উপাখ্যান (১৯৫২), মাকড়সা (১৯৬০), সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৫) ও মহাকবি আলাওল (১৯৬৬)।
উপন্যাস : মাটি আর অশ্রু, পূরবী, নতুন সকাল এবং কিশোর উপন্যাস জয়ের পথে ও নবী কাহিনী।
অনুবাদ : রুবাইয়াৎ-ওমর খৈয়াম, সেন্ট লুইয়ের সেতু ও বারনাড মালামুডের যাদুর কলস।
গান : মালব কৌশিক। তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এ ভূষিত হন।
কবির জন্মভিটা আ¤্রকাননে কবির অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। গাছের নিচে আপনমনে বসে লিখতেন ও পড়তেন তিনি। তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০১১ সালে আম বাগানের পাশেই করা হয়েছে সিকান্দার আবু জাফর ফাউন্ডেশন। দ্বিতলা এই ভবনে কবি সিকান্দার একাডেমি ও পাঠাগারও রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে কবির জন্ম-মৃত্যুর মিল রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্ম ১৭ মার্চ (১৯২০) ও মৃত্যু ১৫ আগস্ট (১৯৭৫) এবং কবির জন্ম ১৯ মার্চ (১৯১৯) ও মৃত্যু ০৫ আগস্ট (১৯৭৫)।
এজন্য কবি ও বঙ্গবন্ধুর জন্ম মাস মিলিয়ে সিকান্দার আবু জাফর ফাউন্ডেশন ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায়  ১০ দিনব্যাপী লোকজ মেলার আয়োজন করে থাকে। এটি ‘সিকান্দার মেলা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এ মেলা সরকারিভাবে আয়োজন করা হয়।
একজন বিপ্লবকামী, শব্দ সচেতন ও সমাজ সচেতন কবি হিসেবে তিনি অসংখ্য গণসঙ্গীত লিখেছেন। তাঁর রচিত গান ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি কবিতা ও সাহিত্যকর্মে এনেছিলেন আধুনিকতার পরশ। সিকান্দার আবু জাফর ১৯৭৫ সালের ৫ আগষ্ট ঢাকার পি.জি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।