তালায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধি


446 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
তালায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধি
আগস্ট ১, ২০১৫ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

বি. এম. জুলফিকার রায়হান, তালা :
টানা কয়েক দিনের বর্ষার পানি নিস্কাসন না হওয়ায় তালা উপজেলার প্রায় ৭০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। সর্বশেষ গত ২৪ ঘন্টায় বর্ষার পানিতে এলাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মৎস্য ও কৃষিতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে ব্যবসা-বানিজ্যসহ স্যানিটেশন ও শিক্ষা ব্যবস্থার। অনেক এলাকায় রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এলাকায় সু-পেয় পানি সংকট ও পানি বাহিত রোগ দেখা দিচ্ছে। পানিবন্ধি দরিদ্র মানুষ’র কাজ কর্ম না থাকায় তাদের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। টানা বর্ষায় জন-জীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য শনিবার তালা উপজেলায় ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়। এদিকে কপোতাক্ষ নদের একাধিক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যাওয়ায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার সার্বক্ষনিক ভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রকাশ, তালা সহ কপোতাক্ষ নদ অববাহিকায় পানি নিস্কাসনের প্রধান মাধ্যম কপোতাক্ষ নদ। কিন্তু কপোতাক্ষ নদ’র কপিলমুনি এলাকা থেকে ভাটি অভিমূখে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিকল্পিত ভাবে খনন না করায় নদের ওই অংশ দিয়ে পানি নিস্কাসন বন্ধ রয়েছে। যে কারনে তালাসহ উজান অঞ্চলে কপোতাক্ষ নদ পানিতে ডুবে রয়েছে। বর্ষার পানি নিস্কাসন হতে না পারায় ইতোমধ্যে তালা উপশহর, উপজেলা পরিষদ চত্বরসহ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টি ইউনিয়ন জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহাবুবুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে বর্ষার পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতার আরও অবনতি হয়েছে। তিনি জানান, আবহাওয়া ভাল হবার আশায় হাজার হাজার মানুষ নিজ বাড়িতে কয়েক দিন ধরে পানিবন্ধি জীবন-যাপন করছে। কিন্তু এভাবে বর্ষা চলমান থাকলে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে আসা ছাড়া বিকল্প আর কোনও পথ থাকবে না। শনিবার দূর্যোগপূর্ন আবহাওয়া এবং বিদ্যালয়’র শ্রেণি কক্ষ পানিতে প্লাবিত হওয়ায় উপজেলার ৩৫ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়। এদের মধ্যে ৩১ টি প্রাথমিক বিদ্যায়সহ মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজ রয়েছে। এদিকে, শুক্রবার রাত থেকে কপোতাক্ষ নদের পানির চাপে উপজেলার খেশরা, জালালপুর, খলিলনগর, ইসলামকাটী ও তালা সদর ইউনিয়নের একাধিক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ধসে যায়। শনিবার সকাল থেকে বাঁধগুলো সংস্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়ে বাঁধ সংস্কারে কাজ শুরু করে। বাঁধ সংস্কার কাজের সামগ্রিক তদারকি করেন, তালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার। জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম. মফিদুল হক লিটু জানান, বর্ষার পানিতে তাঁর ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের ৩০হাজার মানুষ পানিবন্ধি রয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে কপোতাক্ষ নদের পানির চাঁপে এবং অতি বর্ষার ফলে কানাইদিয়া-কৃষ্ণকাটি এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যায়। শনিবার সকাল থেকে প্রায় ৪শত শ্রমিক নিয়ে স্বেচ্ছা শ্রমের মাধ্যমে বাঁধটি সংস্কার করা হয়। তবে, নদের পানির চাঁপ এবং অতি বর্ষা অব্যাহত থাকলে উক্ত বাঁধটি আবার ভেঙ্গে যেয়ে আশপাশের গ্রামে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারেÑ বলে তিনি আশংকা ব্যক্ত করেছেন। খলিলনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রণব ঘোষ বাবলু জানান, কাশিমনগর থেকে ঘোষনগর পর্যন্ত এলাকায় কপোতাক্ষ নদের পানি বাঁধ উপচে এসে তাঁর ইউনিয়নের ঘোষ নগর, গঙ্গারামপুর, মহান্দি, প্রসাদপুর ও দাশকাঠি সহ একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। নদের পানি লোকালয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে স্কেভেটর মেশিন দিয়ে ওই এলাকায় খুলনা-পাইকগাছার পীচের রাস্তার পাশে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অন্য পাশ দিয়ে এলাকায় নদের পানি প্রবেশ করায় ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহতায় রুপ নিচ্ছে। তিনি অবিলম্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মান সহ পানি নিস্কাসন করার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানিয়েছেন। ইসলামকাটী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রঞ্জন রায় জানান, বর্ষার পানিতে তাঁর ইউনিয়নের ১০/১২টি গ্রামের পায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্ধি রয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে কপোতাক্ষ নদের পানির চাপে পরানপুর এবং গোপালপুর শ্মশান ঘাট এলাকায় প্রায় ২০০ ফুট বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যায়। শনিবার সকাল থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়ে বাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। তবে তা পুরোপুরি ঝুকিমুক্ত নয়Ñ বলে জানিয়েছেন। তালা সদর মডেল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাংবাদিক এস.এম. নজরুল ইসলাম জানান, বর্ষার পানিতে উপজেলা পরিষদ চত্বর, ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর, তালা বাজার, উপশহরের মহল্লাপাড়া, মোবারকপুরসহ ১১টি গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে। এসব বিষয়ে তালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার জানান, অতি বর্ষার পানিতে তালা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ৭০ থেকে ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। এভাবে বর্ষা চলতে থাকলে তালায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারেÑ বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, কপোতাক্ষ নদের পানির চাঁপে ৪টি ইউনিয়নে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যায়। শনিবার স্থানীয় চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে বাঁধগুলো স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহাবুবুর রহমানকে সাথে নিয়ে পানিবন্ধি এলাকা সহ ধসে যাওয়া বাঁধের এলাকা পরির্দশন করা হয়েছে। তিনি জানান, পানিবন্ধি মানুষের জন্য সরকারি ভাবে ১০ মেট্রিক টন জিআর চাউল এবং উপজেলা পরিষদের তহবিল থেকে ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন খাল খনন, নেট-পাটা অপসারন কাজ চালানো হচ্ছে। স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ সরকারি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নানাবিধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।