তালের শাঁস বিক্রির ধুম, সাতক্ষীরায় বীজ সংকটের শঙ্কা


132 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
তালের শাঁস বিক্রির ধুম, সাতক্ষীরায় বীজ সংকটের শঙ্কা
মে ১৫, ২০২২ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

সাতক্ষীরার বাজারে আসতে শুরু করেছে তাল। এই গরমের সময়ে তালের শাঁস দেদারসে বিক্রিও হচ্ছে। কাঠ ফাটা গরমে কচি তালের শাঁস বাঙালির এক প্রশান্তিময় খাদ্য। এই তাল আষাঢ়ি তাল হিসেবেও পরিচিত। অত্যান্ত
সুস্বাদু ও হাতের নাগালে পাওয়ায় সকল শ্রেণির লোক এই তালের শাঁস ক্রয় করে খাচ্ছেন। গাছের মালিকরা ভাল দাম পাওয়ায় পাকার আগেই গাছ থেকে তাল বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর ফলে পাকা তালের অভাবে বীজ সংকটে পড়ে তাল গাছের বংশ বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশংকা করছেন বৃক্ষপ্রেমীরা। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, তালগাছ বাড়ানোর জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা শহরের প্রেসক্লাব গেট, হাটের মোট, পিএন স্কুল মোড়, ডে নাইট স্কুল মোড়সহ উপজেলা সদরের বিভিন্নস্থানে প্রতিদিন ভ্রাম্যমান তালের দোকান নিয়ে বসছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। এক কুড়ি তালের শাসের মূল্য ৮০-১০০ টাকা আর এক কুড়ি আস্ত তাল ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। মৌসুম এ ফল কেউ কিনে দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন আর কেউবা নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ১৯ হাজার ৭৭৮টি তাল গাছ রয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩৬৭১টি, কলারোয়া ২৯২২টি, তালা ৩৭১৯টি, দেবহাটা ১১২২টি, কালিগঞ্জ ১৭১৯টি, আশাশুনি ২৩৭২ ও শ্যামনগর উপজেলায় ৪৩৭৩টি। তালের শাঁস শুধু মিষ্টি সুস্বাদু তা নয়। এর রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ ও শরীরে জন্য উপকারী। তাল শাঁস কাঁচা অবস্থায় সবুজ ও পেকে যাওয়ার পর হলদে হয়ে যায়। এটি পেটের উত্তাপকে শীতল করে। এই ফলে অনেকগুলি ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এছাড়া তালগাছ প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহনশীল। তালের শাঁস বিক্রেতা সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নের মনিরুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে এ ব্যবসা করছি। প্রতিদিন চারশত থেকে পাঁচশত তাল বিক্রি করেন সে। চলতি বছর তিনি ২০টি গাছের তাল ক্রয় করেছেন। তিনি সবগুলির শাঁস বিক্রি করবেন। সদর উপজেলার ধূলিহর ইউনিয়নের মৌসুমী ফল ব্যবসায়ী হায়দার আলী ২৪ বছর ধরে তালের ব্যবসা করেন। তিনি জানান, প্রথম দিকে তালের কুড়ি ছিল ৬ টাকা। এরপর বাড়তে বাড়তে বর্তমানে এক কুড়ি তাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, আর শাসের কুড়ি ৮০-১০০ টাকা। আমি প্রতিটা গাছ কিনেছি ৩০০ টাকায়। সেই গাছের তাল বিক্রি করছি ৩০০০-৩১০০ টাকায়। প্রতিটা গাছে ২৮০০ টাকা লাভ হয়।

একই ইউনিয়নের মৌসুমী ফল ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, আমি চার বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। গত দুই বছর করোনার কারণে সেভাবে ব্যবসা করতে পারিনি। এ বছর তালের দাম খুব। গাছ সব কেঁটে ফেলছে। তাল গাছ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের ঝুটিতলা এলাকার বাসিন্দা ক্রেতা এস এম হাবিবুল হাসান জানান, তাল একটি মৌসুমী ফল। এটি অনেক সুস্বাদু ও উপকারী। বছরের প্রথম আজই তাল খাচ্ছি। তালগাছ কমে যাওয়ায় আগের থেকে এখন দাম বেশি। তালের স্বাদ ধরে রাখা ও গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমি সবাইকে তাল গাছ লাগানোর জন্য অনুরোধ জানাবো।

পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল গফফার জানান, আগে রাস্তার পাশে তালের রস নিয়ে বসতো সেটির এখন আর দেখা মেলে না। এখন আর আগের মতো তাল পাওয়া যায় না। এখন তালের শাঁস খেতে পারছি কিছুদিন পর এটিও আর খেতে পারবো কিনা ঠিক নেই। কেননা যেভাবে তালের গাছ কেটে নিচ্ছে তাতে বেশিদিন আর এগুলো খাওয়া হবে না। সামনের দিনে এটি স্বপ্ন হয়ে থাকবে। আগে এক কুড়ি তাল কিনতে পারতাম ৩০-৪০ টাকায় এখন ১০০ টাকায়ও মিলছে না।
সাতক্ষীরা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিমের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল ইসলাম বলেন, একসময় সাতক্ষীরার সর্বত্রই বড় বড় তাল গাছ ছিল। এসব গাছে বাস করতো শকুন, চিল, বাজ, বাবুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। তাল গাছ না থাকার কারনে এসব পরিবেশ বান্ধব পাখিগুলি হারিয়ে গেছে। তালগাছ বজ্রপাত নিরোধ, পরিবেশ বান্ধব, মাটির ক্ষয়রোধসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী গাছ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া অল্প জায়গায় সর্ববৃহত গাছটি বেঁচে থাকে অনেকদিন। তিনি বলেন, গাছের মালিকরা ভাল দাম পাওয়ায় পাকার আগেই গাছ থেকে তাল বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর ফলে পাকা তালের অভাবে বীজ সংকটে পড়ে তালগাছের বংশ বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে তালগাছ কাটা হলেও বীজের অভাবে রোপন করা হচ্ছে না। এর ফলে আমরা দ্রুতই তালগাছ বিলিন হওয়ার আশঙ্কা করছি।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ির উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো: নুরুল ইসলাম জানান, তালের শাস সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এটি মৌসুমি ভিত্তিক একটি ফল শরীরের জন্য উপকারী। তালের রসও অনেক উপকারী। তালের রস দিয়ে গুড়, মিছরি এসব তৈরী হয়। খেজুরের গুড়ের মতো এটিও পুষ্টিকর। বজ্রপাতের হাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করতে গেলে তালের গাছ দিয়ে গ্রীন বেস্টনী গড়ে তোলা জরুরী বলে আমি মনে করি। দিন দিন তালগাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রামঞ্চলের মানুষ তালগাছের গুরুত্ব না বুঝে তালগাছ কেটে ফেলছে। যেহেতু তাল গাছে বছরে একবার ফলন হয় লাভজনক কম সেকারণে তালগাছ কেটে অন্য ফল বা অন্যকিছুর আবাদক রছে। সেকারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। তালগাছ ফলন কম হলেও দূর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করে, এটি দূর্যোগ সহনশীল একটি গাছ।

কৃষিবিদ নুরুল ইসলাম আরও জানান, বৈশ্বিক আবহাওয়ার কারণে তাল গাছ সাতক্ষীরায় দিন দিন কমে যাচ্ছে। তবে আমরা কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তালগাছ বাড়ানোর জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। সাত উপজেলার কৃষি অধিদপ্তরকে একটি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়ে বজ্রপাত সহনশলী এই তালগাছের বীজ ও চারা রোপন করা হবে।