তোয়াব খান সাংবাদিকদের সাংবাদিক


593 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
তোয়াব খান সাংবাদিকদের সাংবাদিক
ডিসেম্বর ১৭, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

॥ লিখেছেন সুভাষ চৌধুরী ॥

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলতে যা বুঝায় তার শেষ সলতে তোয়াব খান। যিনি গত ছয় দশক ধরে যতো না লিখেছেন তার চেয়ে ঢের বেশি লিখিয়েছেন। সংবাদ জগতে নিজেকে একজন পন্ডিত শিক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। কারণ ৮৪ বছর বয়সের জীবন একেবারে মামুলি জীবন নয়। একটি ইতিহাস। এই ইতিহাস আরও প্রলম্বিত হবে । তোয়াব খান একুশে পদক লাভ করেছেন। জীবনের প্রতিটি বাঁকে দিয়েছেন সফলতার পরিচয়। সংবাদ জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন নিজের মেধা মনন ও মানসে।
এমন একজন ক্ষণজন্মা মানুষ তার শেকড়ের সন্ধানে এসেছিলেন জন্মস্থান সাতক্ষীরার আলোকিত গ্রাম রসুলপুরে। সেই সুযোগে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ঘুরে গেলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব। যেখানে শৈশবে খেলাধুলা করেছেন। কাছেই লেখাপড়া করেছেন পিএন হাইস্কুলে। সেই তোয়াব খান মাত্র দুই ঘন্টার দরশনে অনেক শিক্ষাবাক্য ছড়িয়ে দিলেন সংবাদ কর্মীদের মাঝে। পিনপতন নীরবতার মধ্যে তার বাক্যগুলি অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ করার চেষ্টা করলেন আজকের নবীন প্রবীন সাংবাদিকরা। তিনি বললেন ‘সেই ১৫ বছর আগে যখন এসেছিলুম তখন এতো সাংবাদিক এতো সংবাদপত্র ছিলো না’। তিনি জানলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এখন প্রায় একশত সাংবাদিক কর্মরত রয়েছেন। আর তার প্রাণের শহর সাতক্ষীরা থেকে এখন প্রকাশিত হচ্ছে আটটি দৈনিক। এ তথ্য তোয়াব খানকে মোটেও বিস্মিত করেনি , কারণ এখন জনসংখ্যা বাড়ছে। সংবাদে বৈচিত্র্য এসেছে, সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে অবাধ গতিতে। অনিয়মিত হলেও মাসিক ৬০ টাকা বেতনে  তোয়াব খান ১৯৫৫ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দিয়েছিলেন নবীন হাত নিয়ে বার্তা সম্পাদক পদে। এরপর কেটেছে ছয় দশক । তোয়াব খান পরিনত হয়েছেন এক মহীরুহে। সর্বশেষ কর্মস্থল দৈনিক জনকন্ঠকে নিজ হাতে গড়েছেন। যেখানে তিনি হাত দিয়েছেন সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন দক্ষ সংবাদ কর্মী। আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় বলতে পারি তোয়াব খান সাংবাদিকতার শিক্ষাগুরু।  সংবাদ লিখন থেকে শুরু করে বাংলা  ভাষার যাবতীয় ব্যকরণে সিদ্ধহস্ত মানুষটির ধারে গেলেই বুঝা যায় আমাদের অজ্ঞতার কথা। ভুল বানান , ভুল বাক্য, ভুল শব্দ, আর ভুল তথ্য তোয়াব খানের যেনো চক্ষুশূল। তাই এখনও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব লেখা পড়েন , সংশোধন করেন , তারপর ছাপার জন্য ছেড়ে দেন। তবু তোয়াব খান মনে করেন ‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’। তাই এখনও নিয়মিত পড়াশুনা করেন। হাতের কাছে কিছু পেলেই চেষ্টা করেন তা থেকে কিছু শিক্ষা নিতে । বুধবার সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে হৈমন্তি সন্ধ্যার আসরে তিনি অতিথির আসনে বসে  আড্ডার ছলে বয়ান করেছেন সংবাদ নিয়ে । সংবাদের গঠন , সংবাদের প্রকৃতি , সংবাদের স্বরূপ বিশ্লেষন করেছেন। বলেছেন আজকের দিনে তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে। তথ্যের বিকাশ ঘটেছে। প্রেক্ষাপট , মতাদর্শ ও বাস্তব অবস্থা যাই হোক , রাষ্ট্রের পরিস্থিতি যাই হোক সাংবাদিকের দায়িত্ব সঠিক তথ্য তুলে ধরে জনগনকে অবহিত করা এবং খবরের পেছনে ফিরে দেখা। একই সাথে খবরের শেষ পরিনতি দেখে পাঠকের ক্ষুধা নিবৃত্তি ঘটানো।  মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাঁচ প্রত্যাশা বাঙ্গালির স্বাধিকার, বাংলা ভাষা, আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি , কথা বলার স্বাধীনতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার চেতনাকে ধারন করে সংবাদকর্মীদের কাজ করতে হবে। তিনি কোনোভাবেই এর বিরোধীতা করতে পারবেন না। তোয়াব খান শিক্ষা দিলেন যে কোনো সাংবাদিক বা সংবাদপত্র  বিচার করা অধিকার রাখেন না। তিনি কেবলমাত্র সংবাদ লিখন কৌশলের মধ্যে যাবতীয় তথ্যের সমন্বয় করতে পারবেন। বিষয়বস্তুর ওপর গুরুত্ব দিতে পারবেন , কিন্তু বিচারের দায়িত্ব আদালতের। সংবাদপত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত  নিয়ে কথা বলেন এই নক্ষত্র মানুষ। নিষেধ করলেন সিন্ডিকেটেড নিউজ করতে। বললেন আত্ম সচেতন হোন, দায়িত্ববোধ ধারন করুন, পেশার বাহন নিজের গনমাধ্যমকে বিপথে নিয়ে যাবার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। সকালের সংবাদই শেষ সংবাদ নয় , বিকালের , সন্ধ্যার সংবাদও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার নির্দেশনা দিলেন তিনি। কোনো রিপোর্টকে নিজের মত মতো অন্যদিকে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে নানা প্রশ্ন করবেন না। উদাহরন তুলে ধরে তিনি বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ট্রুম্যানের কাছ থেকে দায়িত্বভার গ্রহন করছিলেন। এসময় ক্যামেরা পার্সনরা ছবিও ধারন করেন। কিছুক্ষন পর আবার ক্যামেরা পার্সনরা বললেন আরেকবার এইভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন , এইভাবে ছবি নিতে চাই। তোয়াব খান শিখালেন এমনটি করবেন না।  সংবাদ মাধ্যমে ট্রুথ ইজ দ্য লাস্ট ওয়ার্ড। এর বিকল্প নেই।তিনি জানালেন বাঙ্গালি সব সময় আড্ডাবাজ। এই আড্ডাবাজি থেকে অসাম্প্রদায়িকতার বিকাশ ঘটেছে। তোয়াব খান ছোট ছোট কথায় বললেন ১৯৬০ সালে ওয়েজ বোর্ডএর মৌলিক কাঠামো তৈরি হয়। ১৯৭২ -১৯৭৩ সালে সংবাদপত্রে ওয়ার্কিং কনডিশন আইন তৈরি হয়। সংবাদপত্রকে শিল্প হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। ১৯৯৬ তে টেলিভিশনকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন সংবাদ মাধ্যম প্রকাশে কোনো বাধা নেই। যে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলে সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করার আইনি সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশের সংবাদ জগত এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানালেন এই মহীরুহপ্রতীম সম্পাদক। সংবাদপত্রের জন্ম  মানুষের সেবা করার জন্য। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় সব কথা লেখা যেতো না।  এখন তাতে বৈপরীত্য এসেছে।  সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটছে।  মহান মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকার পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতারে ‘ পিন্ডির প্রলাপ’ উপস্থাপন করেছেন তোয়াব খান। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ‘ সত্যমিথ্যা মিথ্যা সত্য’ কলাম লিখেছেন । প্রকাশিত হয়েছে তার একমাত্র বই ‘ আজ এবং ফিরে দেখা কাল’।  স্বদেশিকতার উতল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা তোয়াব খান এখন এক জীবিত কিংবদন্তী। দেখেছেন ১৩৫০ এর মন্বন্তর। মড়া ফেলা গাড়ি ঠেলতে দেখেছেন ডোমদের। দেখেছেন  বৃটিশ শাসন, দেখেছেন কুইট ইন্ডয়া মুভমেন্ট । ৪৭ এ দেশভাগ। পাকিস্তানের  ঔপনিবেশিক শাসন শোষন। ৫২ তে ভাষার জন্য সংগ্রাম। ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। ৫৮ তে আইয়ুবের ক্ষমতা দখল, মার্শাল  ল।   অংশ নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে , স্বাধিকার আন্দোলনে।  নিজেকে গড়েছেন সময়ের সাহসী সন্তান হিসাবে। তারপর তিনি হয়ে উঠেছেন একজন বহুদর্শী সাংবাদিক। হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর প্রেসসচিব । এরশাদ ও প্রথম তত্ত্বআবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের প্রেস সচিব। হয়েছেন  চীফ ইনফরমেশন সেক্রেটারি, পিআইবির ডিজি। সম্পাদনা কবরেছেন দৈনিক বাংলার।  নিজ  হাতে গড়েছেন বহু সাংবাদিক। এই চুরাশিতেও  কুচকানো ভ্রু, শ্বেতশুভ্র চুল আর দেহের ঢিলা চামড়ার মধ্যে নিজের তারুন্য বজায় রেখেছেন।  নিশ্চিতভাবেই তিনি সাংবাদিকদের সাংবাদিক। তিনি সাংবাদিকদের অভিভাবক।  আরও  যেনো প্রলম্বিত হয় তোয়াব খানের জীবন ইতিহাস।

———-  সুভাষ চৌধুরী , সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি।  ১৭.১২.১৬