‘ত্রাণ দিতিবে না, আমাগি ভেড়ি বাইন্দে দেন’


248 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘ত্রাণ দিতিবে না, আমাগি ভেড়ি বাইন্দে দেন’
মে ২৭, ২০২০ জাতীয় দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

উমর ফারুক

কাকলীর ঘরে চুলো জ্বলেনি। ঈদও আসেনি। সারাদিন শুধু কেঁদেছে মেয়েটা। থৈ থৈ পানির দিকে তাকিয়ে কেঁদেছে। ভাঙা ঘরে বসে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদেছে। কেউ খবর নেয়নি ওর। তিলতিল করে জমানো টাকায় মাটির দুটো ঘর তুলেছিলো কাকলী। চোখের সামনে সেই ঘর ভেঙে পড়তে দেখেছে। কাকলীর স্বামী শ্রমজীবী মানুষ। দুটো সন্তান ওদের। কাঁথা সেলাই করে, হাঁস পুষে, ছাগল পুষে দিব্বি চলে যাচ্ছিলো মেয়েটার সংসার। বুধবার রাতে ওর সব কেড়ে নিয়েছে আম্পান। হাঁসগুলো মরে গেছে। ছাগলটাও কেউ আর কিনতে চাইছে না। দু-দিন পানির উপর ছোটছোট বাচ্চা নিয়ে ভেসে বেড়িয়েছে মেয়েটা। বাবার বাড়িতেও পানি ঢুকেছে। কোথায় যাবে ও! বাধ্য হয়ে বাচ্চা দুটোকে বোনের বাসায় রেখে আবার থৈ থৈ পানির মধ্যে ফিরে গেছে। কাকলীর ঠিকানা এখন থৈ থৈ জল, হাজরাখালি, আশাশুনি, সাতক্ষীরা। অবশ্য এই লেখা যখন এগিয়ে চলেছে ততক্ষণে কাকলী ঘর ছেড়ে বেড়িবাঁধে, খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

কাকলীর পাশের গ্রামের নাম হিজলিয়া। এটা প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ওই গ্রামের মাঝবয়সী নারী রাশেদা। অল্প বয়সেরই তার স্বামী গাংয়ের জলে ভেসে গেছে। কুমিরে কেটেছিলো। ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব টানাটানির সংসার রাশেদার। তবে চলছিলো কোনো রকম। অন্যের বাড়িতে শ্রম দেয় রাশেদা। গাংয়ের দিকে তাকালেই ভেতরটা হু হু করে ওঠে তার। স্বামীকে খেয়েছে। বছর বছর তার ঘরবাড়িও খায়। কষ্টটা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বুধবার রাতে রাশেদাও গৃহহীন হয়েছে।

কাকলী ও রাশেদার মতো সহস্র মানুষ এখন শ্রীউলা, আনুলিয়া, প্রতাপনগর ও আশাশুনি সদর ইউনিয়নে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। ওদের কারো ঘরে সোমবার ঈদের আনন্দ আসেনি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় ওরা কাতর। আরও কী কী হতে চলেছে!

জীবন ও জীবিকা

দক্ষিণাঞ্চল নোনাজলে আবদ্ধ। এই জল সেখানে রাজত্ব করে। সেখানকার জীববৈচিত্র ও প্রতিবেশের স্বরূপ নির্ধারণ করে। এ অঞ্চলের মানুষের মোটা কাপড় ও মোটা ভাত জোটে সেই নোনাজল থেকে। নিঃশ্বাসটাও আসে সেখান থেকে। এখানে চিংড়ি চাষ হয়। চিংড়ি আমাদের অর্থনীতিতে সাদা সোনা নামে পরিচিত। ঘের অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা চিংড়িচাষের উপর নির্ভরশীল। কেউ চিংড়ি চাষ করে। কেউ সে চিংড়ি বাজারে বেঁচে। কেউবা চিংড়ি মাছের পোনা বেঁচে। আবার কেউ মাছে অবৈধভাবে পুশ করে ওজন বাড়ায়। কারও ব্যবসা বরফের। কেউ আবার চিংড়ি মাছ পরিবহণ ব্যবসায়ে জড়িত। এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কেবল চিংড়ি চাষের উপর নির্ভরশীল। যাদের ঘের নেই, তারা অন্যের ঘেরে শ্রম দেয়, আইল বাঁধে, শ্যাওলা বাছে। ওতেই কোন রকমে চলে তাদের জীবন। এ অঞ্চলে, নুন থেকে কাঠ সবই কিনতে হয়।

সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার চারপাশ দিয়ে খোলপেটুয়া ও গোয়ালঘেষিয়া নদী। উপজেলাটি কিছুটা দ্বীপের মত। মাঝেমাঝেই এখনকার নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। নোনাজলে প্লাবিত হবে বিস্তীর্ণ এলাকা। এলাকার জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করে। কেউ ঘরের বেড়া কেটে আনে, কেউ গোলা কেটে আনে, আবার কেউ আনে গাছের গুড়ি। এভাবেই নিজেদের উদ্যোগে রক্ষা পায় বাঁধ। সরকারি কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি দেখা যায় না।

এই অঞ্চলে নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়াটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। শ্রীউলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য খুবই জনপ্রিয়। মূলত তার এই উদ্যোগই তাকে বারবার নির্বাচিত করে। এবারও যখন বাঁধ ভেঙে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হলো তখনও তিনি স্থানীয় উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এবারের ভাঙনের ধরণটা একটু অন্যরকম। তাছাড়া এখন ভরা জোয়ার চলছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টায় ওই বাঁধ নির্মাণ সম্ভব নয়। কথা হচ্ছিলো শ্রীউলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে। তিনি এসব কথাই বলছিলেন। তিনি আরও জানান, তার এলাকায় প্রায় ৩১ হাজার মানুষের বাস। ঘুর্ণিঝড় আম্পানে তার ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপকভাবে বাঁধ ভেঙে নোনাজলে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আজ বুধবার তারা স্থানীয় উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করবেন বলেও জানান তিনি।

আম্পানে ক্ষয়ক্ষতি

প্রাথমিক সরকারি হিসেব বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে উপকূলীয়সহ ২৬ জেলায় ১হাজার ১শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে কেবল সাতক্ষীরা জেলায় এই ক্ষতির পরিমাণ ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি। আম্পানে সাতক্ষীরায় ২২ হাজার ৭শ’১৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে ৬১ হাজার ঘরবাড়ি। কৃষিবিভাগে ক্ষতির পরিমাণ ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মৎস্য ও প্রাণী সম্পদে ক্ষতির পরিমাণ যথাক্রমে ১৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকা ও ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। আম্পানে ভেঙে গেছে সাতক্ষীরার ৮১ কিলোমিটার সড়ক। জেলায় মোট ২৩ টি পয়েন্টে বেড়ি ভেঙেছে ৫৭.৫০ কিলোমিটার। শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গেছে। গাছপালা ভেঙে গেছে অসংখ্য। সাতক্ষীরায় প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৌসুমী ফল আমেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলায় ক্ষয়ক্ষতিতে শ্যামনগর ও আশাশুনি সবচেয়ে এগিয়ে। এই দুই উপজেলা প্রাথমিক দৃষ্টিতে এখন এক ধ্বংসস্তুপ।

সংকট ও সংসদ সদস্য

দীর্ঘদিনযাবৎ এলাকায় প্রচলিত আছে এই অঞ্চল একসময় সাগরগর্ভে বিলীন হবে। প্রতিবছর সেই ভয়টাই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সাতক্ষীরা অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ এখন গৃহহীন, কর্মহীন। পয়নিষ্কাশন, সুপেয় পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। টিউবয়েলগুলো সব পানির নিচে তলিয়ে আছে। চলমান করোনা সংকটের ব্যাপক প্রভাব ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে পড়েছে, তার উপর আম্পানের আঘাতে এই অঞ্চলের মানুষ একেবারে দিশেহারা। তাদের সংকট মূলত দু-ধরণের। আজকের এবং আগামীকালকের। তাদের জীবন ও জীবিকার মূল চালিকাশক্তি ঘেরগুলো ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। ফলে খুব শিঘ্রই দীর্ঘস্থায়ী খুব খারাপ সময়ের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে। আগামীকাল কিভাবে চলবে তারা? কিন্তু এই ঘোরতর সংকটে স্থানীয় সংসদ সদস্য কোথায়? তারা দুঃখ-কষ্টের কথাগুলো কাকে বলবেন?

‘ত্রাণ দিতিবে না, আমাগি বেড়ি বাইন্দে দেন’

গত কয়েক বছর যাবৎ সাতক্ষীরা ও উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার মানুষ বেড়িবাঁধ ভাঙা নিয়ে খুব কষ্টে আছে। তাদের ডুবে যাওয়া খবর পত্রিকার পাতায় বড়বড় করে ছাপা হচ্ছে। টিভিগুলোও ফলাও করে দেখাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরাও আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বছর ঘুরে আবারও সেই একই অবস্থা। বেড়িবাঁধ আর সংস্কার হয় না। ফলে আজ তারা বিরক্ত। ক্যামেরা দেখেলে, সাংবাদিক দেখলে কেউ কেউ রাগ প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘ভাই অনেক তো ছবি তুলিচেন। ওসব ছবি-টবি তোলা বাদ দে আমাগির বেড়িডা বাইন্দে দেন দিন’। তাদের ত্রাণ দিতে গেলেও তারা কেউ কেউ ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বলছেন, ‘ত্রাণ-ট্রাণ দিতিবে না। আমাগির বেড়িডা বাইন্দে দেন দিন’। তারা এখন বুঝে গেছে, বছর বছর কষ্ট করার চেয়ে তাদের এখন স্থায়ী একটি সমাধান দরকার। আর সেই স্থায়ী সমাধান ত্রাণ হয়, বরং বাঁধ সংস্কার। কিন্তু কে দাঁড়াবে তাদের পাশে?

ছ-মাসেও শেষ হয়নি তিনমাস

ভয়েস অব সাতক্ষীরা পত্রিকার সম্পাদক মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো দুর্গত এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে। কামরুজ্জামান সেদিন সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আবুল খায়ের গ্রুপের পক্ষে দুর্গত এলাকায় ত্রাণের টিন বিতরণ করতে গিয়েছিলেন। গল্পে গল্পে জানতে চাইলাম, এই এলাকার মানুষের নদী ভাঙন থেকে রক্ষার উপায় কী? তিনি জানালেন, ঘুর্র্ণিঝড় বুলবুলের পর সরকারের দুজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী দুর্গত এলাকা ঘুরে বলেছিলেন তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বুলবুল চলে গেছে গেলো বছর নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ। তারপর ছ-মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, আজও বেড়িবাঁধগুলোর স্থায়ী সমাধান হয় নি। এবারও আম্পানের পর দু-জন সচিব ইতোমধ্যে এসে দুর্গত এলাকা ঘুরে জানিয়েছেন স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা। কবে হবে সেই স্থায়ী বেড়িবাঁধ?

পরামর্শ

প্রতিটি ঘুর্ণিঝড়ে সুন্দরবন দক্ষিণাঞ্চলকে মায়ের মতো আগলে রাখে, বাঁচায়। আর নদী প্রতিবার ডোবায়। নোনাজলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্লাবিত হয় এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, জীবন ও জীবিকা। বাগদা চিংড়ি চাষ করতে যেয়ে প্রতিবছর এই অঞ্চলের মানুষ নদীরক্ষা বাঁধগুলো ভঙ্গুর করে ফেলছে। পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতি বিপন্ন করছে। কিন্তু এই অঞ্চলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে সরকারের উদাসীনতা সাতক্ষীরা তথা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনকে ক্রমাগত বিপন্ন করে তুলছে। এই মুহূর্তে দুর্গত এলাকার মানুষের কাছে নামমাত্র নয়, পর্যাপ্ত খাবার ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া অতিব জরুরি। বিশেষায়িত সরকারি সংস্কার মাধ্যমে তাদের বাড়িঘর নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেসব ঘেরচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সরকারি বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে এবং স্বল্পতম সময় বিপদজনক বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি এইসব ব্যবস্থা আশু গ্রহণ করা সম্ভব না হয় তবে দক্ষিণাঞ্চল তথা সাতক্ষীরার মানুষের জীবন ও জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

সূত্র : দৈনিক সমকাল, তারিখ- ২৭-৫-২০