থানায় মামলা-জিডির তদন্ত তদারকিতে স্বতন্ত্র সেল


90 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
থানায় মামলা-জিডির তদন্ত তদারকিতে স্বতন্ত্র সেল
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ঘুষ হয়রানি বন্ধে ডিএমপির উদ্যোগ

অনলাইন ডেস্ক ::

বাবা হঠাৎ খবর পেলেন ‘রাস্তায় ছেলে মারা গেছে।’ এই ছেলেকে হারানোর কয়েক দিন আগে থেকে তাকে নানাভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বাবাকে তা একাধিকবার জানিয়েছে স্কুলপড়ূয়া ওই সন্তান। তাই ‘দুর্ঘটনায়’ ছেলে মারা গেছে- এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না বাবার। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এ ঘটনায় দায়ের করা এজাহারে আগের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বাদীপক্ষ। কিন্তু বাদীর অজ্ঞাতসারে বদলে ফেলা হয় এজাহারের বর্ণনা। শুধু তাই নয়, ‘দুর্ঘটনার’ ১৮ ঘণ্টা পরও কথিত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেনি থানা পুলিশ। সংগ্রহ করা হয়নি আশপাশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ। ছেলের এই মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ হয় বাদীপক্ষের। এটা বারবার বলার চেষ্টা করলেও থানার ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোনো আমলে নেননি। এই ফাঁকে নষ্ট হয় ঘটনার অনেক আলামত। ঘটনাস্থল নিয়েও দুই থানার মধ্যে টানাটানি।

চলতি বছরের ৬ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় প্রাইভেটকারের ভেতরে ইরফান খান রাকিব (১৭) নামে এক কিশোরকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে পালানোর সময় হাতেনাতে জনতার কাছে ধরা পড়ে তার বন্ধু সাদি। গাড়ি শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় পাওয়া গেলেও কথিত দুর্ঘটনাস্থলের কথা মগবাজার উল্লেখ করে মামলা হয় হাতিরঝিল থানায়। তবে রহস্যজনক কারণে থানা পুলিশ দুর্ঘটনার নেপথ্যে কিছু রয়েছে কি-না তা তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শেষ পর্যন্ত বাদী রাকিবের বাবা দীন মোহাম্মদ খানের আবেদনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়। থানায় মামলার তদন্তে গাফিলতি ও বাদীপক্ষকে সহায়তা না করার ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। তবে এখন থেকে রাজধানীর ৫০ থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত তদারকি করবে পুলিশের একটি স্বতন্ত্র সেল। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের ক্রাইম সেলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা থাকবেন এ সেলে। কোনো ঘটনায় থানায় জিডি বা মামলা হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে বাদীর নম্বর ও মামলা-সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় ওই সেলে পাঠাতে হবে। ডিএমপির নবনিযুক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পরামর্শে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। থানায় মামলা-জিডি হলে পরবর্তী করণীয় কী হবে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা গতকাল মঙ্গলবার জারি করে ডিএমপি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মামলা বা জিডি করতে গিয়ে থানায় কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে কি-না তা তাৎক্ষণিকভাবে মনিটর করা হবে। কোনো পয়সা লেনদেন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিএমপি সদর দপ্তরের একটি টিম এটা তদারক করবে। প্রয়োজনে আমি নিজে মামলার বাদী ও সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব। তদন্তের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেব। থানাকে অবশ্যই হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব করতে হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, থানা হলো পুলিশের আয়নার মতো। থানার পরিবেশ বদলাতে সম্ভাব্য সব কিছু করা হবে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সব কিছু নজরদারি করবেন। থানায় বসে কেউ পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে- এটা চলতে দেওয়া যাবে না।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, কোনো ভুক্তভোগী থানায় গেলে তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, নতুন নির্দেশনার আলোকে মামলার বাদীর কাছে সিনিয়র কর্মকর্তারা জানতে চাইবেন- তিনি যে অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েছেন তা সঠিকভাবে এজাহারে লেখা হয়েছে কি-না। এ ছাড়া থানায় কেউ তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন কি-না। যাদের আসামি করতে চেয়েছেন তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে কি-না। এ ছাড়া যে ধারার অপরাধ সেই ধারায় মামলা নেওয়া হলো কি-না। জিডি বা মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে থানায় কেউ ঘুষ চেয়েছে কি-না তা জানবে স্বতন্ত্র ওই সেল। এমনকি থানায় মিথ্যা মামলা হলেও জবাবদিহি করতে হবে কর্মকর্তাদের।

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর ৫০ থানায় প্রতি মাসে গড়ে দুই সহস্রাধিক মামলা রুজু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় মোট মামলা হয়েছে দুই হাজার ১৫৩টি, ফেব্রুয়ারিতে দুই হাজার ৪০টি, মার্চে দুই হাজার ৪৩৩টি, এপ্রিলে দুই হাজার ৫১৫টি, মে মাসে দুই হাজার ৬৩৭টি, জুনে ১ হাজার ৯৩৭টি। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার অধিকাংশ মাদক-সংক্রান্ত।

পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে থানার সেবা বাড়াতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এডিসি ও এসি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা থানায় বসবেন। তারা থানার সেবার মান বাড়ানো ও জনবান্ধব করতে সব ধরনের পরামর্শ দেবেন।

ডিএমপি কমিশনারের নতুন এ উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে একাধিক থানার ওসি বিষয়টি ‘ভালো উদ্যোগ’ হিসেবে মন্তব্য করেন। সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী সমকালকে বলেন, মানুষ বিপদে পড়লেই থানায় দৌড়ায়। সেখানে যাওয়ার পর তারা দেখেন থানা পুলিশ কী ধরনের ব্যবহার করছে। কত সময় বসিয়ে রাখার পর মামলা ও জিডি নিচ্ছে। যদি তারা ভালো সেবা পায় তাহলে পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। মামলা ও জিডির ব্যাপারে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেশের সব থানায় চালু করলে আরও ভালো হবে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী হোসেন খান বলেন, যারা মিথ্যা মামলা করে মানুষকে হয়রানি করত নতুন উদ্যোগের কারণে তা বন্ধ হবে। থানা পুলিশকে ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি করার সাহস করবে না।