দক্ষিনাঞ্চলে তরমুজের ব্যাপক চাষাবাদের সম্ভাবনা


184 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দক্ষিনাঞ্চলে তরমুজের ব্যাপক চাষাবাদের সম্ভাবনা
মে ১৫, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল আলম মুন্না ::

তরমুজ গ্রীস্মকালিন ফলের মধ্যে একটি জনপ্রিয় ফল। গরমে তরমুজ দেহ ও মনে শুধু প্রশান্তিই আনে না এর পুষ্টি ও ভেষজগুন রয়েছে অনেক। প্রচুর পরিমানে আয়রন, ভিটামিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে তরমুজে। রাতকানা রোগ, কোষ্ঠ-কাঠিণ্য, অস্ত্রীয়ক্ষত, রক্তচাপ, কিডনিসহ নানা ধরনের অসুখ প্রতিরোধ করে তরমুজ। গরমের দিনে ঘামের সাথে প্রচুর লবন ও পানির ঘাটতি পূরন করে এই সিজেনাল ফল। তরমুজ চাষ নোনা পানি সহনশীল হওয়ার কারনে দক্ষিনাঞ্চলে তরমুজের ব্যাপক চাষাবাদ করা যেতে পারে। শুধু সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে কম বেশি তরমুজ চাষ হলেও চট্রগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলোতে এর চাষ বেশি হয়ে থাকে। মাঘ-ফাল্গুন মাস হচ্ছে তরমুজ চাষের আসল সময়। তবুও ভাল মানের বীজের অভাব এবং প্রাচীন পদ্ধতীতে চাষাবাদ ও নানা ধরনের পোকা-মাকড়ের আক্রমনের কারনে তরমুজ চাষে দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকরা। এজন্য পোকা-মাকড় হতে রক্ষা পেতে হলে এবং সঠিক নিয়মে তরমুজ চাষ করতে হলে স্থাণীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে মরামর্শ নিয়ে ক্ষেতে ওষুধ বা তরমুজ পরিচর্চা করতে হবে। এটি উৎপাদনে তেমন বেশি খরচ না হলেও এবার বাজারে তরমুজের দাম অন্য বছরের তুলনায় ৫ গুন বেশি। কারন খুজতে গিয়ে সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা মোড়ে কয়েকটি তরমুজের আড়ৎদারের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রতিবছরের মতো গেল শীতকালে অর্থাৎ পৌষ মাসে তরমুজের চাষাবাদ করা হয়েছিল খুলনা’র কয়রাসহ অন্য জেলা ও উপজেলায়। কিন্তু অনাকাঙ্খিত ভারীবৃষ্টির কারনে সেই প্রথম চালানের হাজার হাজার একর তরমুজের রোপনকৃত চারা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলেই এবছর তরমুজের উৎপাদন কম এবং দাম অনেক চড়া। তাছাড়া দেশের ৬৪ জেলার তরমুজ ব্যবসায়ীরা এখন খুলনার কয়রায় তরমুজের ক্ষেতে ভিড় করছে। একদিকে ব্যবসায়ীদের ভিড় অন্যদিকে উৎপাদন কম তাছাড়া দ্বিতীয় চালানে কয়রায় কিছু জমিতে তরমুজ চাষাবাদ করা হয়েছে যার ফলে এবছর তরমুজের আমদানি অনেক কম এজন্য দাম একটু বেশী। এছাড়া কয়রা অঞ্চলে রাজধানী ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় ছোট ব্যবসায়ীরা রয়েছে অনেক ছিটকে পড়ছে। সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা তরমুজের আড়ৎদার আলম বলেন প্রতিবছর আমরা তরমুজের জন্য খুলনা’র কয়রা উপজেলায় সিজেনের তিনমাস আগে থেকেই কৃষকদের দাদন দিয়ে থাকি লাখে ১০ হাজার টাকায় এবং দাদন গ্রহিতারা বা কৃষকরা সেই এলাকায় উৎপাদিত তরমুজ শুধু আমাদের কাছেই বিক্রি করে তারপর আমরা সাতক্ষীরায় আড়ৎজাত করি এবং এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি বিক্রয় করা হয়। কিন্তু এবছর হাজার হাজার বিঘা তরমুজের রোপনকৃত চারা নষ্ট হওয়ার ফলেই বাজারের এই উর্দ্ধগতি। এতে আমাদের কোন কারসাজি বা সিন্ডিকেট নেই। ১৫০০ টাকা মন কিনে আনি আমাদের থাকে মাত্র ৩০ টাকা। সাতক্ষীরা সন্ধা বাজার এলাকার একতা তরমুজের আড়ৎদার আকবর আলী ও ম্যানেজার আলী জানান সর্বপ্রথমে আমরা বরিশালের তরমুজ বিক্রি করি পরে খুলনার কয়রা, বাজুয়া থেকে তরমুজ আনা হয়। সর্বশেষ তরমুজ আসে সাতক্ষীরা শ্যামনগরের ধুমঘাট থেকে। কুষ্টিয়ার বৃত্তিপাড়া বাজার থেকে আগত তরমুজের ব্যবসায়ী মধু বলেন কাচা মালের কোন নিদ্রিষ্ট দাম হয় না। যে কোন ফসল আমদানি বেশি হলে দাম কমে আর আমদানি কম হলে দাম বেশি এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তারা আড়তে আসা বিভিন্ন তরমুজের সাইজ দেখিয়ে বলেন ১৯২০ টাকা কেনা তরমুজ কুষ্টিয়া নিতে লেবার ও ট্রাকভাড়া দিয়ে পড়ছে ২১০০ টাকা আমরা কত করে বেচবো বলেন। কেজিতে ৪/৫ টাকা না থাকলে কিভাবে চলবো? তাছাড়া কাচা তরমুজের দাম কম আর পাকা তরমুজের দাম বেশি। এবছর তরমুজের ব্যবসা বেশি ভালো হচ্ছেনা। ক্ষতির মধ্যে আছে প্রকৃত চাষিরা, না পারছে মাহাজনের দাদনের টাকা ফেরৎ দিতে, না পারছে তরমুজ দিতে। উৎপাদন সামান্য হওয়ায় বড়, ছোট ও মাঝারী সাইজের তরমুজের দাম ভিন্ন ভিন্ন যেমন একই ক্ষেতের তরমুজ ছোটটা ৬০০ টাকা মন এবং বড়টা ২১০০ টাকা মন। এগুলো ছোট বড় হওয়ার জন্যে দামের হেরফের। সাতক্ষীরায় কি তরমুজ চাষ হয় কিনা বা কি অবস্থা এবিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার আমজাদ হোসেন বলেন সাতক্ষীরা সদর এলাকায় তেমন কোন তরমুজ চাষ হয়না আমরা ২/১ যায়গায় চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি। শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসার আবুল হোসেন মিয়া বলেন শ্যামনগরে ২টি এরিয়ায় প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছিল যার ১টি রমজান নগর ইউনিয়নের ধুমঘাট আর কৈখালী ইউনিয়নের কৈখালী গ্রামে। এবার তরমুজের অবস্থা কি প্রশ্নে তিনি বলেন এবছর ভারী বৃষ্টির কারনে ফসল সেভাবে হয়নি অন্য বছর খুব ভালো তরমুজের চাষ হয় এই এলাকায়। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানাযায় সাতক্ষীরা জেলায় শুধু তরমুজের চাষ হয় শ্যামনগরে সেখানে এবছর আমাদের উৎপাদন টার্গেট ছিল ৩০ হেক্টর জমি। কিন্তু অনাবৃষ্টিতে অনেক ফসল হানি হয়েছে বলে টার্গেট অর্জন সম্ভব হয়নি। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাসের কাছে মোবাইলে ফোনে সাতক্ষীরায় এবছর তরমুজের উৎপাদন টার্গেট কত জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি এখন বাইরে আছি আপনি অন্য একটা নম্বর নেন। অন্য নাম্বার লাগবে না জানিয়ে জিঞ্জাসা করি আপনার জেলা অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে তাদের মধ্যে শ্যামনগর উপজেলা কর্মকর্তা বলেছে শুধু শ্যামনগরে ১০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে জেলা অফিস থেকে অন্যজন বলেছে ৩০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে এরকম দু’ধরনের তথ্য প্রদান করার কারন কি প্রশ্নে তিনি বলেন শুধু শ্যামনগর না মনে হয় তালা ও কলারোয়ায় তরমুজের চাষ হয় সব মিলিয়ে ৩০ হেক্টর হবে হয়তো।
তরমুজের ক্রেতা বাকাল এলাকার উজ্জল, ইটাগাছা এলাকার ফজলুর করিম বাবু, শুকুর আলীসহ অনেকে বলেন এবছর তরমুজের দাম এতো বেশি হওয়ার ফলে গরিব মানুষরা তরমুজ কিনতে পারছেনা। সাধারন মানুষ কিভাবে তরমুজ কিনবে? যেসব তরমুজ প্রতিবছর ১০/১২ কেজি বিক্রয় হয় সেই তরমুজ এবছর ৫০/৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তারমানে ৫ গুন বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী পবিত্র মাহে রমজানে কোন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়বে না সবপণ্য স্থীতিশীল থাকার কথা অথচ এবছরে বাজারে নিত্যপন্যের কোন কোন জিনিসের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকলেও বেড়েছে মৌসুমী ফলের দাম। তারা অভিযোগ করে বলেন এবছর ফলের দাম ক্রেতা সাধারনের কাছে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। তাছাড়া তরমুজের পাশাপাশি দাম বেড়েছে আঙ্গুর, কমলা, লিচু, কলা, জামরুল, পেয়ারা, বেদানাসহ নানা ধরনের ফলের। সচেতন জনগণ অভিযোগ করে বলেন সিজেনাল ফল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব সিজেনাল ফলমূলের দাম বাড়িয়েছে কিনা সেটা সরকারী ভাবে তদারকির প্রয়োজন রয়েছে। রমজানে ফলমূলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় গরিব-অসহায় ক্রেতারা কেউ বেশি দাম দিয়ে এসব ফলমূল খেতে পারছে না। আপনারা বাজার তদারকি করেন কিন্তু রমজানে বাজারে ফলমূলের অনেক দাম কি কারনে প্রশ্নে সাতক্ষীরা জেলা বাজার কর্মকর্তা এস,এম আব্দুল্লাহ বলেন আমরা নিয়মিত তদারকি করি শুধু একদিন না প্রতিদিনই করছি। আমাদের দেশি বা এলাকার ফলমূল কেবলমাত্র উঠা ধরছে বাজারে এই জন্যই এখন একটু দাম বেশি। আর বাহিরের থেকে যে ফল আসে সেটা আমদানী রপ্তানীর কারনে যানবহনের খরচ বেশি এজন্য দাম বেশি হয়ে থাকে। আমাদের সাতক্ষীরাতে যে ফল হয় তারচেয়ে ভাল ফল আর কোথাও নাই আমাদের বাইরের ফল না খাওয়াই ভালো। তারপরও দেখেন বিগত কয়দিন আগে আমাদের দেশের যে বড় বড় ৫২ টি কোম্পানীর পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলোর সবকিছুতে ভেজাল। তাহলে আর খাবেন কি ? কোন কিছু খাওয়ার উপায় নাই। আমাদের সাতক্ষীরার দেশী ফল টক হলেও অনেক ভালো। তবুও আপনারা আর মাত্র ২/১ দিন অপেক্ষা করেন বাজারে ফলমূলে ভরে যাবে আশা করি তখন অবশ্যই সবকিছু নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে। আমি আপনাকে জানাবো আজকের ফলের দাম এবং ২দিন পরের দাম।