দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি ওয়ানটাইম কাপে


131 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি ওয়ানটাইম কাপে
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

রাজধানীর অফিসপাড়া বলে খ্যাত ব্যস্ত এলাকা মতিঝিল সারাদিনই নানা পেশার মানুষের ভিড়ে মুখর থাকে। করোনাকালেও এখানকার ফুটপাতে পা রাখা দায়। অফিস, ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ায় আবারও এখানে জমে উঠেছে চায়ের দোকান। একটু খেয়াল না করলে বোঝাই যায় না, এই দৃশ্যপটের সবকিছু আগের মতো হলেও ছোট একটি পরিবর্তনও এসেছে। তা হলো কাচের কাপের বদলে মানুষ এখন অনেক বেশি আগ্রহী ওয়ানটাইম প্লাস্টিক কাপে চা কিংবা পানি পান করতে।

এই বেশিরভাগ চা-পানকারীর মুখে মাস্ক নেই। কিন্তু এই করোনাকালে কাচের কাপ ব্যবহারে প্রচণ্ড অনীহা তাদের। অন্য কারও হাত বা মুখের ছোঁয়া লাগেনি বলে কোনো করোনা ঝুঁকিও নেই- এমন ধারণা থেকে ওয়ানটাইম কাপে চা পান করতে তাদের আগ্রহ বেশি। যদিও এসব কাপ অনেক বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত ক্ষতি করছে।

মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের নিচে একটি দোকানে বসে প্লাস্টিকের কাপে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খোশগল্প করছিলেন দুই ব্যাংকার। ‘প্লাস্টিকের কাপে গরম চা পান শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর- তা জানেন কি?’- জিজ্ঞাসা করতেই আকাশ থেকে পড়লেন তারা। তাদের ভাষায়, ‘করোনা থেকে বাঁচতে প্লাস্টিকের কাপে চা খাচ্ছি। ক্ষতি সম্পর্কে তো কিছু জানি না।’

চা দোকানি আকবর হোসেনের দোকানে বড় একটি পলিথিনে রাখা হয়েছে ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের কাপ। পরিষ্কার না করে ও পানিতে না ধুয়েই এসব কাপে চা ঢেলে ক্রেতাদের হাতে দিচ্ছেন তিনি। গত কয়েক মাসে প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনার ভয়ে সচেতন ও শিক্ষিতরা প্লাস্টিকের কাপেই চা পান করেন। তবে নিম্নআয়ের মানুষ কাচের কাপেই চা খান।’

শুধু মতিঝিল নয়; ঢাকাসহ সারাদেশেই বেড়েছে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার। রাজধানীর ধানমন্ডি, তেজগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, গুলশান, বনানী, কাকরাইলসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে এখন কাচের কাপের ব্যবহার নেই বললেই চলে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, করোনা নিয়ে সচেতনতা দেখাতে গিয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। প্লাস্টিক মানবদেহ ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ।

প্রতিদিন কত সংখ্যক প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার হচ্ছে, তার একটি হিসাবও পাওয়া গেল। রাজধানীর কাকরাইলের দোকানি মহিব উল্যাহ জানান, প্রতিদিন ৪-৫শ’ লোকের চা বানান তিনি। এত লোক কি শুধু একটি দোকানেই চা পান করছেন রোজ? তা তো নয়। মোড়ে মোড়ে, ফুটপাতে রয়েছে অসংখ্য চায়ের দোকান। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকায় দুই কোটি মানুষের মধ্যে এখন যদি ৩০ শতাংশ মানুষও প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করেন, তাহলে দৈনিক ৬০ লাখ কাপ জমা হচ্ছে।

মিরপুর ১ নম্বরের একটি ওয়ানটাইম স্টোরের দোকানি আলী হোসেন বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস প্লাস্টিকের কাপ বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য পাইকারি দোকান মিলে ঢাকায় প্রতিদিন ৮-১০ লাখ পিস প্লাস্টিকের কাপ বিক্রি হচ্ছে বলে ধারণা তার। তেজগাঁওয়ের চা দোকানি ইসমাইল হোসেন জানান, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের নিচতলা, ইসলামপুর, মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, উত্তরা রাজলক্ষ্মী মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ড, পুরান ঢাকা, কারওয়ান বাজার ছাড়াও বিভিন্ন মার্কেটে প্লাস্টিকের কাপ পাওয়া যাচ্ছে। একশ’ কাপ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় কেনেন তিনি।

রাজধানীর চা দোকানগুলোর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকছে এসব কাপ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচ্ছন্নতা কর্মী আব্দুল হক বলেন, ড্রেন পরিষ্কার করতে গেলে প্লাস্টিকের বোতলের সঙ্গে এখন নতুন যোগ হয়েছে ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের চায়ের কাপ। ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতাদের কারণেও যেখানে সেখানে পড়ে থাকছে প্লাস্টিকের কাপ। যারা প্লাস্টিকের কাপে চা পান করছেন, সেই শিক্ষিত মানুষদেরও দেখা যাচ্ছে যেখানে সেখানে কাপ ফেলতে।

শুধু কাপ নয়, করোনাকালে বেড়েছে আরও কিছু প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার। করোনার সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) উপকরণে রয়েছে প্লাস্টিক। হ্যান্ড গ্লাভস, ফেস শিল্ড, গগল্‌স, পিপিই গাউন ব্যবহারের পর ধ্বংসের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। নিয়ম না মেনে এসব প্লাস্টিক পণ্য মানুষ ফেলছে যেখানে সেখানে।

কিন্তু কেন ক্ষতিকর প্লাস্টিকের কাপে চা পান করা? আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অব মেডিসিনের মুখ্য গবেষকদের মতে, ‘প্লাস্টিকের চায়ের কাপে থাকা টক্সিক পদার্থ ‘বিসফেনল-এ’ মুখ ও লিভারে ক্যান্সারের প্রধান কারণ। এই পদার্থটি বিশেষ করে গরম পানীয়ের সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। নারীদের ইস্ট্রোজেন হরমোনের কার্যকারিতাকে বাধা দেয় এটি। এমনকি এই বিসফেনলের কারণে পুরুষদের শুক্রাণু কমে যেতে পারে। হার্ট, কিডনি, স্তন ক্যান্সার, লিভার, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়া, ফুসফুস এবং ত্বকও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা ছাড়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ১০ কারণের মধ্যে অন্যতম হলো প্লাস্টিকের ব্যবহার।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক গবেষণায় বলেছে, চা, কফি, জুস কিংবা কোমল পানীয়ের জন্য যেসব প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৮৬ হাজার ৭০৭ টন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় এই বর্জ্যের পরিমাণ ১২ হাজার ২৬৯ টন, যার ৯৬ শতাংশই তৈরি হয় ফুড প্যাকেজিং অ্যান্ড পারসোনাল কেয়ারের পণ্য থেকে।

প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের এই ব্যবহার। অথচ পলি ইথায়লিন ও পলি প্রপাইলিন বা এর কোনো যৌগ মিশ্রণে তৈরি প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (৬)-এর ‘ক’ ধারার লঙ্ঘন। এসব পণ্য বিক্রি ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে দুই বছরের জেল, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতিসহ (বেলা) ১১টি সংগঠনের একটি রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব উপকূলীয় অঞ্চল ও হোটেল-মোটেল-রেস্টুরেন্টে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিশ্বের মোট ১৮৭টি দেশে নানাভাবে পলিথিন ব্যাগ এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর উৎপাদন, বিপণন, বিতরণে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। রুয়ান্ডাতে মাদকের চাইতেও ভয়ানক মনে করা হয় পলিথিন ব্যাগের ব্যবহারকে। বৈশ্বিকভাবে প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হলেও এ দেশের অনেকেই অতিউৎসাহী পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে।