দুই টাকায় উৎসব


138 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দুই টাকায় উৎসব
অক্টোবর ২৩, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে

অনলাইন ডেস্ক ::

হিংসায় উন্মত্ত পুরো বিশ্ব, রক্তাক্ত তার শরীর। তবু কবি বড়ূ চণ্ডীদাসের মানবিক বাণী ‘শুনহ মানুষ ভাই-/ সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ কথাটাই ধ্যানজ্ঞান তাদের। তারা চান মানবিক পৃথিবী, সাম্যের পৃথিবী। ‘সুবিধাবঞ্চিত’ শব্দকেই পরিত্যক্ত করতে চান তারা। তাই একত্র হয়ে চট্টগ্রামে গঠন করেছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘যাত্রী ছাউনি’। করোনাকালে চার হাজার অসহায় পরিবারকে এ সংগঠনটি খাবার সরবরাহ করেছে। আর এই পূজাতে দুই টাকার বিনিময়ে শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে দিয়েছে পোশাক।
নার্গিস, মহাসেন, আম্পানসহ বিভিন্ন দুর্যোগেও অসহায় হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘যাত্রী ছাউনি’। পাঁচ বছর আগে মানবিক পৃথিবী গঠনের কঠিন এ কাজ শুরু করেছিলেন চট্টগ্রামের মাত্র ১৪ জন তরুণ। এখন তাদের স্বপ্ন ধারণ করা সদস্যের সংখ্যা ৫৩। তাদের কাছ থেকে উপকার পাওয়া মানুষের সংখ্যা ২০ হাজার।
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে তারানন্দ মহাকালী আশ্রমের মাঠের একটি দোকানে এখন থরে থরে সাজানো রয়েছে নানা রকম কাপড়। দোকানের নাম ‘দুই টাকায় উৎসব’। সেখান থেকে পোশাক কিনতে প্রতিদিন লাইনে দাঁড়ায় শ শ শিশু। মাত্র দুই টাকায় পছন্দের যে কোনো কাপড় কিনে নেয় তারা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রামে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নিয়েছে ‘যাত্রী ছাউনি’। প্রায় পৌনে দুইশ অসহায় শিশু নামমাত্র দামে কিনেছে তাদের পোশাক। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য গত মঙ্গলবার দুই টাকায় বুফে খাবারের আয়োজন করেছিল তারা। অর্ধশত শিশু গত মঙ্গলবার দুপুরে দুই টাকার বিনিময়ে বুফে খেতে পেরেছে নগরীর ‘উইন্ড অব চেঞ্জ’ রেস্টুরেন্টে। সারাবছর এমন আয়োজন করে থাকে যাত্রী ছাউনি। গত ঈদেও শতাধিক এতিম শিশুকে দুই টাকার বিনিময়ে নতুন পোশাক দিয়েছে তারা। অসহায়দের মধ্যে তাদের বিক্রি করা শীতের কাপড়ের মূল্যও ছিল দুই টাকা।
কেন বিনিময়মূল্য দুই টাকা- এ প্রশ্নের জবাবে ‘যাত্রী ছাউনি’ প্রতিষ্ঠানের প্রধান উপদেষ্টা সিএমপির উপকমিশনার বিজয় বসাক বলেন, ‘বিনামূল্যে দেওয়া জিনিসে কারও কারও আগ্রহ কম। তাই দুই টাকার একটা প্রতীকী মূল্যে আমাদের ভালোবাসাকে পৌঁছে দিচ্ছি। শিশুরা তাদের জমানো টাকা দিয়ে আমাদের দেওয়া নতুন পোশাক কিনে থাকে। এতে তারাও খুব গর্ব অনুভব করে; তৃপ্তি পায়। তাদের এই তৃপ্তি দেখে আমরাও শান্তি পাই।’
‘যাত্রী ছাউনি’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদুল ইসলাম জিসান গত বছর এমবিএ শেষ করেছেন ইউএসটিসি থেকে। ২০১৩ সাল থেকে এমন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। পরে ২০১৫ সালে ‘যাত্রী ছাউনি’ নাম দিয়ে আরও ১৩ জনকে সঙ্গে নিয়ে কঠিন এই পথে পা বাড়ান তারা।
শুরুর সে গল্প বলতে গিয়ে ফরহাদুল ইসলাম জিসান বলেন, ‘আমরা মানবিক এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। পৃথিবী থেকে ‘সুবিধাবঞ্চিত’ শব্দকে বিদায় করতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, এমন ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগে একদিন সাম্য ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রথম প্রথম কেউ সাড়া না দিলেও এখন মানবিক মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ১৪ থেকে আমাদের সংখ্যা এখন ৫৩।’
জিসান জানান, শুরুতে তার সঙ্গে আরও ছিলেন আরেফিন কাব্য, নুরাইন, রানা, রিংক, শাওন, রিমন, সালমান, ইমরান, রাইহান, আদিবা মহোনি, তোয়াই তোয়াই এ্যা, ডিউক ও তানজিল। সংগঠনের বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে সভাপতি আবদুল্লাহ আল হাসীব জানান, এ ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই দাতা; নিজেরাই সেবক। বাইরে থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় তারা বসে থাকেন না। যে যেভাবে পারেন সেভাবে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন।

সাধারণ সম্পাদক মহসিন রিমন বলেন, “সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমাদের একটি বিদ্যালয়ও আছে। এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্বপ্নের স্কুল’। এখানে ৩৫ জন শিশু পড়াশোনা করে বিনামূল্যে।”
এ সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা দেশ টেলিভিশনের বিভাগীয় প্রধান আলমগীর সবুজ। তিনি বলেন, ‘যে যার অবস্থান থেকে কিছুটা এগিয়ে এলেই এ দেশ বদলে যাবে- যাত্রী ছাউনির সদস্যরা এটি বিশ্বাস করে, হৃদয়ে ধারণ করে।’