দুই মেয়র সাসপেন্ড আইনের অপপ্রয়োগ


271 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দুই মেয়র সাসপেন্ড আইনের অপপ্রয়োগ
এপ্রিল ৪, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে আবারও সাময়িক বরখাস্ত করায় দেশজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। বিশিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, স্পষ্টতই আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হতে পারে। এদিকে, গতকাল সোমবার সিলেটের মেয়র আরিফুল হকের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। রাজশাহীর মেয়র বুলবুল এ নিয়ে আজ হাইকোর্টে রিট করবেন বলে জানিয়েছেন।

গত রোববার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশে তারা সাময়িক বরখাস্ত হন। স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশে বলা হয়, বুলবুল ও আরিফুলের বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হয়েছে। সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এর ১২ ধারার উপধারা-১ অনুযায়ী সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। এর কিছু সময় আগেই তারা আদালতের আদেশ নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর আগে তারা দু’জন দুই বছর ধরে মেয়রের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান সিনিয়র আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার সমকালকে বলেন, আইনে আছে, কোনো ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট হলে অভিযুক্তকে বরখাস্ত করা যায়। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্ত দুই মেয়রকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে এ দুই মেয়রকে বরখাস্ত করা আইনগত বা যথাযথ হয়েছে কি-না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সমকালকে বলেন, দুই মেয়রকে বরখাস্ত করে সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে এ দুই মেয়র জামিনে মুক্তি পেয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাদের বরখাস্তের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন উচ্চ আদালত। আবার তাদের বরখাস্ত করে সর্বোচ্চ আদালতকেও অসম্মান করা হয়েছে। এ ধরনের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে একদিন সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, কোন মামলায় কী কারণে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, সেটা ভালোভাবে না দেখে মন্তব্য করা যাবে না। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, নিশ্চয়ই সরকার আইনের আওতায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এখানে আপিল বিভাগ জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে পর্যবেক্ষণে কী বলেছেন, সেটাও দেখতে হবে। এ ছাড়া তাদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার আছে। উচ্চ আদালতে তারা যেতে পারেন।’

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক সমকালকে বলেন, জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাময়িক বরখাস্তের পুনরাদেশে স্পষ্টতই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ হয়েছে। বিশেষত, ২০০৯ সালের মামলায় এখন জড়িত দেখানোর কারণে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বা সত্য ঘটনা বলে মনে হবে না। তিনি বলেন, বিরোধী দলের মেয়র বলেই সরকার তাদের আইনের অজুহাতে পদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে বলে জনমনে ধারণা জন্মাবে। এটা সরকার বা আইনের শাসনের জন্য শুভ হবে না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বহিষ্কার দুঃখজনক। আসলে সরকার কী ধরনের গণতন্ত্র চায়, তা বোঝা যাচ্ছে না। বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন এই মেয়ররা। তারা উচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি পেয়ে দায়িত্ব নেন। সর্বোচ্চ আদালত যেখানে নির্বাচিত মেয়রদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে তাদের আবার বহিষ্কার করা উচিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, কোনো জনপ্রতিনিধি ফৌজদারি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট আদালতে গৃহীত হলে বরখাস্ত হতে পারেন। এ দু’জন মেয়রের ক্ষেত্রে তেমনটিই দেখানো হচ্ছে। যে মুহূর্তে তারা আদালতের নির্দেশ পেয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিলেন, ঠিক তারপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দু’জনের পৃথক বরখাস্তের আদেশ জারি হলো। এ থেকে মনে হয়, আইন প্রয়োগের কৌশল ও ধরন পরিকল্পিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের এভাবে বরখাস্ত করা রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার জন্য অমঙ্গলকর। এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে না; বরং আরও দুর্বল করে।

এদিকে বিএনপিদলীয় দুই মেয়র ও এক পৌর মেয়রকে বরখাস্ত করা নিয়ে চলা সমালোচনার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর অজ্ঞাতসারে ঘটেছে। গতকাল সোমবার ঢাকার ডেমরায় একটি সড়ক উদ্বোধনে গেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, মেয়ররা বিএনপির সদস্য হওয়ার কারণে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কলমের খোঁচায় বরখাস্ত করা হয়েছে।

সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ স্থগিতাদেশ দেন। সিলেটের মেয়রকে সাময়িক বরখাস্তের ওই আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেন আদালত। তিন দিনের মধ্যে স্থানীয় সরকার সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, সিলেটের জেলা প্রশাসক, সিলেটের পুলিশ কমিশনারসহ ছয়জনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৯ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত। আরিফুল হক চৌধুরীর বরখাস্তের আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদনটি দায়ের করেন তার আইনজীবী আবদুল হালিম কস্ফাফী। মেয়র আরিফুলের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও এ এম আমিনউদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, মেয়র বুলবুল আজ মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করবেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল সোমবার তিনি বলেন, ‘সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার আদেশ আসার পর কি অফিস করার এখতিয়ার থাকে? তাই অফিসে যাইনি। রিট করার জন্য তিনজন আইনজীবী সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।’