দুদকের ২০ মামলায় আসামি হচ্ছেন সাবেক সিনিয়র সচিবসহ ৭৫ জন


211 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দুদকের ২০ মামলায় আসামি হচ্ছেন সাবেক সিনিয়র সচিবসহ ৭৫ জন
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

পি কে হালদারের অর্থ কেলেঙ্কারি

৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ

অনলাইন ডেস্ক ::

বিদেশে পলাতক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার সিন্ডিকেটের তিনটি লিজিং কোম্পানি থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে এফএএস (ফাস) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে লুট করা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আতাহারুল ইসলাম এবং উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সিদ্দিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলমসহ পি কে সিন্ডিকেট লুট করেছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ সিন্ডিকেট ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে লুট করেছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ তদন্তের পর দুদক পি কে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও ২০টি মামলার প্রস্তুতি শেষ করেছে। এসব মামলায় আসামি করা হতে পারে সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আতাহারুল ইসলামসহ ৭৫ জনকে।

এদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের লেয়ারিং-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ২০টি ব্যাংককে পত্র দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। জয়েন্ট স্টকে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে পি কে সিন্ডিকেট ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স নিয়ে লিজিং থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাতের সুযোগ পেয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে এবার দুদক সেসব সন্দেহভাজন কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের চার্জশিটের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছে কি না সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের দায়িত্বে ইচ্ছাকৃত কোনো গাফিলতি পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকসূত্র। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফাস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অডিটকৃত গত পাঁচ বছরের অডিট প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং এগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের তলব করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর শাহ আলমকে শিগগিরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পি কে হালদার চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন এমন তথ্যও এখন দুদকের হাতে। এজন্য তিনি তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের ব্যবহার করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়ে ঋণের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। সবাইকে বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়েছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার পর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি মো. রাশেদুল ইসলাম ও পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন তারা সবাই পি কে হালদারের বেতনভুক কর্মচারী ছিলেন।

ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে ২০১৪ সালের শেষের দিকে পি কে সিন্ডিকেট শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় এবং কৌশলে পুরনো কর্মচারীদের ছাঁটাই করে তাদের পছন্দমতো কর্মচারী নিয়োগ দেয়। রাসেল শাহরিয়ারকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয় তারা। রাসেল শাহরিয়ার হলেন পি কে হালদারের পূর্বপরিচিত এবং ২০০৭ সালে তারা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছিলেন। মূলত উজ্জ্বল কুমার নন্দী তার পছন্দমতো পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ দেন। সিদ্দিকুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম হলেন পি কে হালদারের বন্ধু এবং ব্যবসায়িক অংশীদার। সে সুবাদে ফাস ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পড়ে সিদ্দিক ও জাহাঙ্গীরের হাতে। অস্তিত্বহীন কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে হবে এ সিদ্ধান্ত আগেই পি কে হালদার দিয়ে দিতেন। লোক দেখানো বোর্ড মিটিং হতো এবং বোর্ডে এমডিকে ডেকে বলে দেওয়া হতো, বোর্ডের ফাইল পাস করে দ্রুত ঋণের ব্যবস্থা কর। রাসেল শাহরিয়ার প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব যাচাই ছাড়াই এবং কোনো মর্টগেজ না নিয়ে তার একক স্বাক্ষরে ক্রেডিট মেমো প্রস্তুত করে বোর্ডে উপস্থাপন করে ঋণ অনুমোদন করে নিতেন। পরে পি কে হালদারের নির্দেশে ঋণের টাকা পি কে সিন্ডিকেটের হিসাবে পাঠিয়ে দিতেন। টেকওভার করা ঋণের অর্থও টেকওভারকৃত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না দিয়ে পি কে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত এবং বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যার কোনো অর্থ ওইসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবে যায়নি। ওই অর্থ পি কে সিন্ডিকেটের বিভিন্ন হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে। ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠান হলো এস এ এন্টারপ্রাইজ, মুন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, সুখাদা প্রোপার্টিজ লিমিটেড, ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দিয়া শিপিং লিমিটেড, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লি., মেসার্স বর্ন, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, দ্রিনান অ্যাপারেলস, এন্ড বি এন্টারপ্রাইজ, এমার এন্টারপ্রাইজ, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, তামিম অ্যান্ড তালহা, হাল ইন্টারন্যাশনাল, মেরিন ট্রাস্ট লিমিটেড, আর্থস্কোপ ও এমটিবি মেরিন।

মূলত ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে কোনো রকম ঋণ আবেদন গ্রহণ না করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোনো মর্টগেজ গ্রহণ ব্যতিরেকে প্রায় ২০টি কাগুজে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। বেনিফিশিয়ারি কর্তৃক ফাস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের রহস্য উদঘাটনে তিন দিনে ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আত্মসাতে জড়িত আরও ২২ কর্মকর্তাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ পরিচালকরা ঋণ অনুমোদনে তাদের অনিয়মের কথা স্বীকার করেন।