দুর্নীতিতে ডুবছে বিমান


384 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দুর্নীতিতে ডুবছে বিমান
সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে চার দশক ধরে ধুঁকছে বিমান। রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি এখন সরকারের জন্য একটি শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েও বিমান তার রুট ও শিডিউল ঠিক রাখতে পারছে না। ‘আকাশে শান্তির নীড়’ রচনার লক্ষ্য নিয়ে বিমানের যাত্রা শুরু হলেও এখন সে শান্তির নীড় গুটিয়ে গেছে। ছোট হয়ে গেছে বিমানের পৃথিবী। বিশ্বের ৪২টি দেশের সঙ্গে আকাশসেবার চুক্তি থাকলেও মাত্র ১৬টি দেশে এর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে বিমান। এ বছর বিমানের রুট আরও গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। অব্যাহত লোকসানের ঘানি টানতে টানতে বিমান এখন ন্যুব্জ, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। পাবলিক লিমিটেড করার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ১৯ লাখ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা মুনাফা করতে সমর্থ হয় বিমান। কিন্তু ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে আবারও লোকসান দিতে শুরু করে এই সেবা সংস্থাটি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৮০ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৯১ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬০৫ কোটি ৯৫ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২১৪ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২২০ কোটি এবং গেল অর্থবছরে বিমান লোকসান দিয়েছে ২৬৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এক প্রতিবেদনে বিমান জানিয়েছে, ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ আয় বাড়লেও খরচ বেড়েছে ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিশ্বের সব বিমান সংস্থার রুট যখন বাড়ছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন এয়ারলাইনস, তখন বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট কমতে শুরু করেছে। অনেক আন্তর্জাতিক রুট বন্ধ হয়ে গেছে। চালু ১৯টি আন্তর্জাতিক রুটের মধ্যে অন্তত নয়টি লোকসানি। এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ চক্রের কারণেই ব্যবসা গুটিয়ে যেতে শুরু করে। বিমানের ব্যবসা চলে যায় অন্য ফ্লাইট অপারেটরদের দখলে। যাত্রী পরিসেবায় অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ বিমান। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিমানে ভ্রমণ করতে নারাজ। রুট-বিন্যাসে নেই কোনো পরিকল্পনা। বাজার জরিপ ও বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ছাড়াই অনেক রুট চালু করে লোকসান দিতে হয়েছে। সংস্থার অভ্যন্তরে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই লোক নিয়োগ করা হয়। কর্মীদের বিল-ভাতা, ওভারটাইমে কারচুপি আকাশচুম্বী। বাড়তি ফ্লাইং আওয়ার দেখিয়ে করা হয় ব্যাপক অনিয়ম। আর উড়োজাহাজ কেনা ও লিজ নেওয়ার কাজে রীতিমতো সাগরচুরির কারসাজি ঘটে।

ছোট হয়ে আসছে বিমানের পৃথিবী : সঙ্কচিত হয়ে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দূরপাল্লার যাতায়াত। সক্ষমতা অনুযায়ী আশানুরূপ যাত্রী না পাওয়া নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ বিমান। এতে দিন দিন লোকসানের মাত্রা বেড়েই চলেছে। মূলত অপরিকল্পিত রুট পরিচালনা, ফ্লাইট শিডিউল ঠিক না রাখা, উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই দূরপাল্লার রুটে বিমান কাক্সিক্ষত যাত্রী পাচ্ছে না। যাত্রীসেবার মান ও সময়মতো ফ্লাইট না ছাড়ার কারণে কম ভাড়াতেও যাত্রী পাচ্ছে না বিমান। একই সঙ্গে বাজার যাচাই না করে শুধু রাজনৈতিক চাপে অনেক রুটে ফ্লাইট চালু রাখায় বছরের পর বছর লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা-রোম-ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটে যাত্রীর অভাবে প্রতিটি ফ্লাইটেই বিমানকে গড়ে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ঢাকা-হংকং রুটেও ফ্লাইটপ্রতি বিমানকে ৩৪ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়। একই অবস্থা বিরাজ করছে ঢাকা-দিল্লি রুটেও। এ রুটেও ফ্লাইটপ্রতি লোকসান হচ্ছে ১৪ লাখ টাকা। এমনকি লোকসান গুনতে হচ্ছে ঢাকা-কলকাতা রুটেও। প্রতি ফ্লাইটে লোকসানের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। চারদিকে বিমানের এমন লোকসানের হিড়িকে সাময়িকভাবে এসব রুট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ। একই সঙ্গে লন্ডন, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লোকসানের পেছনে ব্যবস্থাপনাই দায়ী : লোকসান আর নানা রকম কেলেঙ্কারির জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। লোকসান থেকে উত্তরণে বিমানের ব্যবস্থাপনা কৌশল ও মার্কেটিংকে আরও শক্তিশালী করার কথাও বলেন তারা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বরাবরই বিমান কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অভাব রয়েছে। আয়ের বদলে ব্যয় বাড়ানোই বিমানের প্রচলিত রেওয়াজ। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় কমাতে বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিমান-সংক্রান্ত কমিটির এক প্রতিবেদনে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কাটাতে আর্থিক বিষয়ে ১৫ দফা সুপারিশ এসেছে। এসব সুপারিশে মাথাভারী প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে জনবল কমিয়ে আনার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।অতিরিক্ত জনবলই নয়, সেখানে বেতন-ভাতা, ওভারটাইমের নানা কারসাজি আর দুর্নীতিতে প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিমানের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মূল বেতনের ১৭২ শতাংশ ভাতা হিসেবে খরচ হয়। ৪০ শতাংশ খরচ হয় ওভারটাইম হিসেবে। ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকে মূল বেতনের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ওভারটাইম বিল উত্তোলন করে থাকেন। এক সময় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, কাতার এয়ারওয়েজ, আফ্রিকিয়া এয়ার, ইতিহাদ এয়ার, টার্কিশ এয়ারওয়েজ, সাউদি অ্যারাবিয়া এয়ারলাইনস বিমানের ক্যাটারিং সেন্টার (বিএফসিসি) থেকে খাবার সংগ্রহ করত। শুরুর দিকে বিএফসিসির খাবারের মানও ভালো ছিল। বিমানের নানা অব্যবস্থাপনায় তা খারাপ হয়ে যায়। দেশি ক্রেতাদের মতো বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও বিএফসিসির খাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মুনাফার মুখ : অব্যাহত লোকসানের ধারাবাহিকতা থেকে বিমান বেরিয়ে আসছে বলে দাবি করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, জুলাই পূর্ববর্তী সাত মাসে প্রতিষ্ঠানটি ২৭১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুনাফার মুখ দেখেছে।

বিমানের ২৯ ঘাটে লুটপাট : বাংলাদেশ বিমানের ১০ বিভাগের ২৯ ঘাটে প্রতি মাসে শতকোটি টাকার লুটপাট চলছেই। শ্রমিক লীগের একজন প্রভাবশালী নেতাসহ ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটই এসব লুটপাটের অন্যতম হোতা। এসবের পেছনে শীর্ষ ব্যক্তির সায় থাকার নানা অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করে, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেও সেসব লুটপাটের ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, এসব লুটপাটের কারণে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছেন। বাড়ি-গাড়ি, শানশওকতের কোনো কমতি নেই তাদের। লুটপাটের টাকা বিমান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী মহলের মধ্যেও ভাগবণ্টন হয়। ফলে অভিযুক্ত সিন্ডিকেট সদস্যরা বরাবরই থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিমানের মতিঝিল সেলস অফিস, কার্গো বিভাগ, এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগ, বিক্রয় ও বিপণন পরিদফতর, সম্ভার ও ক্রয় পরিদফতর, যানবাহন উপবিভাগ, সিকিউরিটি ও তদন্ত বিভাগ, বিএফসিসি, বিমানের কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি ও ডিউটি রোস্টার শাখায় মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন ও লুটপাট ঘটে থাকে। তবে বিমানের সিট রিজার্ভেশনের নামে ঘটে থাকে সবচেয়ে ক্ষতিকর কার্যকলাপ। সিট রিজার্ভেশন শাখায় এজেন্টদের কাছ থেকে সিট কনফার্মের নামে ফ্লাইটভিত্তিক লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ট্রাভেল এজেন্ট, মার্কেটিং ও রিজার্ভেশন শাখায় এই সিন্ডিকেট রীতিমতো স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। ঘাটে ঘাটে শুধু মাসোহারা আর চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, লাগামহীন দুর্নীতিও জেঁকে বসেছে বিমানে। উড়োজাহাজ কেনা, লিজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, মেরামত, স্পেয়ার পার্টস কেনা, বিএফসিসি, পোলট্রি, টিকিট বিক্রি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, বৈদেশিক অফিস চালনা, লোকবল নিয়োগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে চলছে সীমাহীন লুটপাট। কর্মচারী থেকে বোর্ড সদস্য কোথাও টাকা ছাড়া কাজ হয় না। ফলে বেসরকারি ও বিদেশি এয়ারলাইনস যখন লাভ করছে, তখন বাংলাদেশ বিমানকে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।—সুত্র:-বাংলাদেশ প্রতিদিন।