দেবহাটায় বিলুপ্ত ব্রিটিশ শাসনামল ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের স্বাক্ষী পৌরসভাটি আবারো ফিরে পেতে চায় দেবহাটাবাসী


590 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দেবহাটায় বিলুপ্ত ব্রিটিশ শাসনামল ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের স্বাক্ষী পৌরসভাটি আবারো ফিরে পেতে চায় দেবহাটাবাসী
জুন ২৬, ২০১৫ খুলনা বিভাগ দেবহাটা
Print Friendly, PDF & Email

 

 

আর. কে. বাপ্পা, দেবহাটা থেকে :
সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলাটি একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের আর্ন্তজাতিক সীমানা নির্ধারকারী নদী ইছামতি নদীর ধার ঘেষে দেবহাটা উপজেলার অবস্থান। ইছামতির ওপারে রয়েছে ভারতের হাসনাবাদ রেলষ্টেশন। যার কারনে সেসময়ে এ অঞ্চলের মানুষের দ্বিতীয় ঠিকানা ছিল কোলকাতা শহর। তারা অনায়াসেই রেলে করে কোলকাতা যেতে পারতেন। এই দেবহাটার সুশীলগাতী গ্রামে রয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের বাড়ি, টাউনশ্রীপুরে রয়েছে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শংকর রায় চৌধুরীর পৈত্রিক নিবাস। এছাড়া এখানে ছিল ১৮ জন জমিদার ও গাঁতিদারের বসবাস। এই দেবহাটার নামকরন নিয়ে নানাজনের কাছ থেকে নানারকম মতামত পাওয়া যায়। কেউ বলেন, প্রাচীনকালে এখানে দেব-দেবীর হাট বসত, সেজন্য নাম হয়েছে দেবহাটা। আবার কেউ বলেন, প্রাচীনকালে এখানে ঘন জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলে বিভিন্ন বনদস্যু বা অনেকে রাগারাগি করে যেয়ে পালিয়ে থাকত। তারা বলত ঐ জঙ্গলে দেবো—-হাটা। আর কালে আবর্তে সেখান থেকে নাম হয়েছে দেবহাটা। তবে যে যাই বলুক না কেন এই দেবহাটাকে ঘিরে একদিকে যেমন রয়েছে নানারকম কল্পকাহিনী ঠিক তেমনি রয়েছে অনেক প্রাচীন র্কীতি বা নিদর্শন। প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা গেছে, ১৮৬৭ সালে তৎকালীন বৃটিশ আমলে দেবহাটার টাউনশ্রীপুরে দেবহাটা পৌরসভা গড়ে উঠেছিল। ঐ সময় বর্তমান বিভাগীয় শহর খুলনাতেও পৌরসভা গড়ে ওঠেনি। সেই দেবহাটা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন দেবহাটা সদরের বাসিন্দা স্বনামধন্য ও প্রজাহিতৈষী জমিদার বাবু ফনীভূষন মন্ডল। যিনি একটানা ত্রিশ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। দেবহাটা থেকে টাউনশ্রীপুর পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে জমিদার ও গাঁতীদার মিলে ১৮ জন বসবাস করতেন। এই ১৮ জনের মধ্যে কেউ ছিলেন অত্যাচারী আবার কেউ ছিলেন প্রজাহিতৈষী। জমিদারদের মধ্যে প্রধান ছিলেন জমিদার ফনীভূষন মন্ডল। যিনি মানুষের কল্যানার্থে ও সেবার মনোভাব নিয়ে অনেক স্থাপনা তৈরী করে গেছেন। তার মধ্যে আছে দেবহাটা পাইলট হাইস্কুল (বর্তমানে মডেল হাইস্কুল), থানার পাশে ফনীভূষনের মা ভূবন মোহিনীর নামে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিক  (যেটি বর্তমানে সাব সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে মানুষের সেবা প্রদান করা হয়) সহ অসংখ্যা কল্যানকর স্থাপনা। জমিদার ফনীভূষন মন্ডলের ছিল দুইটি বড় পুকুর। যে পুকুর দুটি এখনো আছে। তার একটি পুকুরে জমিদারের স্ত্রী ও বাড়ির লোকজন গোসল করত আর একটি পুকুরকে ঘিরে রয়েছে কল্প কাহিনী। সে পুকুরটির নাম বড় পুকুর। স্থানীয়রা জানান, এই বড় পুকুরে ঐ এলাকার মানুষেরা মানত করত। কারো বাড়িতে বিয়ে সাদি বা কোন অনুষ্ঠান হলে ঐ পুকুরের পাশে যেয়ে বলে আসলে পরের দিন মেহমানদের জন্য থালা ও গ্লাস ভেসে আসত। আবার অনুষ্ঠানের পরে সেগুলো ফেরত দিয়ে আসতে হত। কিন্তু একজন ব্যক্তি ঐ থালা গ্লাস ফেরত না দিয়ে আসার কারনে সেখান থেকে আর থালা গ্লাস ভেসে আসেনা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার আসার পরে সম্ভবত ১৯৫০-৫১ সালে দেবহাটা পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে। পাকিস্তান সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তৎকালীর রাওয়ালপিন্ডি হাইকোর্টে জমিদার অনীল স্বর্নকার মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুভার্গ্যক্রমে আর পৌরসভা ফিরে আসেনি। জমিদার ফনীভূষন মন্ডল যে বাড়িতে বসবাস করতেন তার সূনিপূন কারুকার্য, ডিজাইন ও নকশা সকলকে মুদ্ধ করে। এছাড়া টাউনশ্রীপুরে রয়েছে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শংকর রায়ের পৈত্রিক ভিটাবাড়ি। উনার পূর্ব পুরুষরা জমিদার হিসেবে এখানে বসবাস করতেন। তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে ১৯৯৭ সালে তার পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে টাউনশ্রীপুর এসে পৌত্রিক ভিটাটি দেখে গেছেন। আর সাথে করে নিয়ে গেছেন সেখানের কিছু মাটি। সুশীলগাতী গ্রামে রয়েছে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের পৈত্রিক ভিটাবাড়ি। সেখানে একটি নামফলক করা আছে। এছাড়া উপজেলা সদরের পাশে রয়েছে একটি বিশাল বটগাছ। যেটিকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি পর্যটন শিল্প এলাকা। দেবহাটা ও টাউনশ্রীপুরে এখন আর জমিদারদের বসবাস না থাকলেও রয়েছে তাদের বিশাল অট্রালিকা, ধর্মীয় উপসনালয়, থিয়েটার রুম সহ কিছু কারুকার্য। তবে সেখানে আর বাজেনা কোন বাজনা বা হয়না কোন নৃত্য। ব্রিটিশ শাসনামলেই সেই আকা বাকা রাস্তাগুলো এখন হয়েছে পিচ ঢালা রাস্তা। যেটা যেয়ে মিশেছে জেলা শহরের সাথে। তাই দেবহাটার ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারী কিছু উদ্যোগ। যাতে দেবহাটা আবারো ফিরে পেতে পারে সেই হারানো পৌরসভা। আর সেটাই প্রত্যাশা দেবহাটাবাসীর।