দেড় বছরে সাতক্ষীরায় ডিভোর্স ৫৯৪৬, বিয়ে ১২২৪১


341 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
দেড় বছরে সাতক্ষীরায় ডিভোর্স ৫৯৪৬, বিয়ে ১২২৪১
সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

করোনাকালে জেলায় তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ আবেদনের পরিমাণ বাড়ছে। গত ১৮ মাসে জেলায় ১২২৪১টি বিবাহ সম্পন্ন হলেও ৫৯৪৬টি ডিভোর্স হয়েছে। এরমধ্যে গড়ে ৭০ শতাংশ ডির্ভোসের আবেদন করছেন নারীরা। এই নারীদের অধিকাংশই বাল্য বিবাহের স্বীকার। গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি। যারা ২৭ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে বিয়ে করেন তাদের দাম্পত্য জীবন তুলনামূলক বেশি মজবুত ও স্থায়ী হয়ে থাকে। অন্যদিকে যারা টিনএজ (১৩-১৯ বছর) বা ৩২+ বয়সে বিয়ে করে তাদের ডিভোর্সের হার বেশি। বিশেষ করে কম বয়সে বিবাহ বন্ধনে যারা আবদ্ধ হয় তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, ০১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২১ পর্যন্ত জেলার ৭৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভাতে ৩৮৭৩টি বিবাহ সম্পন্ন হয়। এরমধ্যে তালাকের তালাকের আবেদন জমা পড়েছে ১ হাজার ৮২০ টি। যা পূর্বের ৬ মাসের চেয়ে তুলনামূূলক কম। অপরদিকে, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত জেলার ৭৮ টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভাতে ৫ হাজার ২ টি বিবাহ। এরমধ্যে তালাকের আবেদন ২ হাজার ৫০১ টি জমা পড়েছিল। এছাড়াও ০১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত জেলার ৭৮ টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভাতে ৩ হাজার ৩১৬ টি মুসলিম বিবাহ ও ৫০ টি সনাতন ধর্ম¦লবীদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তালাকের আবেদন জমা পড়েছিল ১ হাজার ৬২৫ টি। যা গত ১৮ মাসে দাঁড়ায় ৫৯৪৬। এসব তালাকের কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’।

এরমধ্যে স্ত্রীদের করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মাদকাসক্তি, পুরুষত্বহীনতাসহ বিভিন্ন কারণ। অন্যদিকে স্বামীর অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদ মেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়ায় স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেন স্বামীরা। জেলার সচেতন মহল জানান, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে একইসাথে ডিভোর্সের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশের স্কুলগুলোতে যদি মূল্যবোধ চর্চার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এটা কিছুটা কমবে। তারা জানান, যারা এখন সত্তোরোর্ধ তাদের সময় পারিবারিক অশান্তি বা অমিল যতোই থাকুক না কেনো তাদের যাওয়ার জায়গা ছিল না। আর্থিক সঙ্গতিও ছিল না। হয় বাবার বাড়ি। নয়তো ভাইয়ের বাড়ি। ভাইয়ের বাড়ি গেলেও তাকে ঝিয়ের কাজ করতে হতো। বাবার বাড়িও একই অবস্থা। এখন মানুষের আয় বেড়েছে। সঙ্গতি হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হলেই মেয়ে ফোন করে বলে মা গাড়ি পাঠিয়ে দাও। আমি থাকবো না। তখন মা কিছুই মনে করে না। গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। যার কারণে বাড়ছে ডিভোর্সের সংখ্যা। তারা আরও জানান, সম্প্রতি সময়ে দেখা গেছে নারীদের তালাকের আবেদনের সংখ্যাটা বেশি। তালাকের যে আইন আছে তাতে যে কেউ কাজীর কাছে গিয়ে তালাক দিতে বা নিতে পারে। এেেত্র সামাজিক বন্ধনের ঘাটতি রয়েছে। বিয়ের সময় উকিল বাবাসহ অনেকেই উপস্থিত থাকে। কিন্তু ডিভোর্সের সময় তাদের কাউকে লাগে না। এেেত্র আইনটা যদি এমন হতো যে বিয়ের সময় যেমন দামি দামি সব লোক উপস্থিত থাকে তালাকের সময়ও তারা উপস্থিত থাকবে। তাহলে হয়তো এটা কিছুটা হলেও কমে আসতো।

জেলা রেজিষ্ট্রার মোহা: আব্দুল হাফিজ জানান, প্রত্যেক মাসে প্রায় ৩৫% থেকে ৪৫% ডির্ভোসে আবেদন জমা পড়ছে। এবং অধিকাংশ ডিভোর্স এর ৯০ দিনের মধ্যে মীমাংসাও হয় না। ফলে অটোমেটিক ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক ডির্ভোস হয়ে যাচ্ছে। এই ডিভোর্সের ক্ষেত্রে নারীরা বেশি এগিয়ে। সেজন্য এই বিচ্ছেদ কমাতে পারে নারীর সহমর্মিতাই।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক একেএম শফিউল আযম জানান, ‘একটা পরিবার গড়ে ওঠে একজন পুরুষ এবং নারীর বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে। এর মাধ্যমেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু এখন কর্মেেত্র দতার পার্থক্য, প্রতিযোগিতার সঙ্গে নিজেকে চালিয়ে যাওয়া এবং সেগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পাড়ায় নারী-পুরুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ফলে বাস্তবতা এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে টিকে থাকতে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।’ তিনি আরও জানান, ডিভোর্সের আবেদনে নারীরা এগিয়ে এটা শুনতে ঠিক ভালো লাগেনি। কারণ সংসার ভাঙ্গার েেত্র নারীরাইবা কেনো এগিয়ে থাকবে। একটি সংসার যখন হয় তখন নারী পরুষ দুজনেই মিউচুয়ালি কমিটেড হয়। কাজেই পুরুষের সহিংসতাটা বেশি হয় বলেইতো নারীরা ডিভোর্স করতে চায়। তিনি আরও জানান, সাতক্ষীরায় বাল্য বিবাহের প্রকোপ বেশি। এখনতো মানুষের অনেক সচেতন হওয়ার কথা। সবাই সচেতন হলেই ডিভোর্স কমে আসবে।

মানবাধিকার সংগঠন স্বদেশ এর নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত জানান, গত দেড় বছরে করোনাকালীন সময়ে মধ্যবিত্ত ও নি¤œবৃত্ত পরিবারে আর্থিক অভাব অনাটন বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সাংসারিক অশান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া শিশু বিবাহের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়ে গেছে। যা শিশু বিবাহের কুফল। এবং একশ্রেণির লোভী নারীরাও দেলমোহর খোরপোশ আদায়ের জন্যে বহুবিবাহ এবং তালাক এবং প্রতারণার পথ বেচে নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে এ ধরণের ঘটনা বেড়ে গেছে। এর মধ্যে মাদকের ভয়াল ছোবল, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বোপরি জনসচেতনার অভাব, পারিবারিক বন্ধনের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে নারী স্বাবলম্ভী হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতের অমিল হওয়ায় এ ধরণের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে জেন্ডার বিষায়ক স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করা আবশ্যক।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জোন্সা দত্ত জানান, নারীরা সহজে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন না। এরপরেও অনেকে নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে তালাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিশেষ করে দ্বৈত ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একপর্যায়ে নারীরা হাঁপিয়ে পড়ছেন। আর নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে তালাকের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পিছুপা হয় না। সে কারণেই দিন দিন তালাকের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরফলে নারীরা কিছুটা প্রশান্তি পেলেও সন্তানদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যার প্রভাব বইতে হয় সারাজীবন। তিনি আরও জানান, বিষয়টি সকলে জানলেও তা মানে না। যার জন্য এমন অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছে নারী ও পুরুষ। এগুলো নিয়ে নারীরাও আদালতে মামলা করছে। তাদের উভয় পরিবারের সম্মান ক্ষুণœ হচ্ছে। আবার অনেকে সামাজিকভাবে মীমাংসার জন্য আমাদের মতো সংগঠকদের কাছে আসে। এপর্যন্ত প্রায় ৭শ’ মামলা মীমাংসা করার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই নারীদের এ ধরণের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত নারী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরী।
বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতি সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জানান, ঘর ভাঙতে মানুষ এত মরিয়া হয়ে ওঠছে, এটা সত্যিই একটি দেশ ও সমাজের জন্য চিন্তার বড় কারণ। আমরা দেখেছি, বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনে নারীরা এগিয়ে আছে। বি”েছদের প্রধান কারণ দেখানো হয় মনোমালিন্য। আসলে মনোমালিন্য তো একটি ব্যাপক বিষয়। এখন ছোট-খাটো বিষয়ে মন না মিললে তো আপনি ডিভোর্স চাইতে পারেন না। তিনি আরও জানান, আমরা সত্যিই চাইনা কারও সংসার নষ্ট হোক। কেউ ডিভোর্স দেওয়ার জন্য আমাদের কাছে আসলে তাদের কাউন্সিলিং করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেই আমরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিবাহ রেজিস্ট্রার জানান, ‘এখন প্রতিযোগিতামূলক সমাজ। মানুষের আকাড়খা অনেক বেশি। এই আকাড়খা আদি সমাজের সঙ্গে বর্তমান সমাজের পার্থক্য তৈরি করেছে। অথচ আগে যুগের পর যুগ সংসার টিকে থাকত।’ তারা আরও জানান, সচেতনতা বাড়ায় এখন মেয়েকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজ পরিবারগুলোই এগিয়ে আসছে। যেখানে মেয়েরা আগে তালাকপ্রাপ্ত হলে পরিবারে আশ্রয়তো পেতেনই না বরং তাদের হেয় করা হতো। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ মেয়র বা ইউপি চেয়ারম্যান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রথমে সেখানে তালাকের আবেদন নথিভুক্ত হয়। তারপর সেখান থেকে তালাকের আবেদন স্বামী এবং স্ত্রী পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের কোন অঞ্চলে বাস করেন, সেই অনুযায়ী ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। পরে আবেদনকারী ও বিবাদী উভয়পকেই আপসের নোটিশ পাঠান সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা (নির্বাহী ম্যাজিস্টে”ট)। দুই পরে মধ্যে আপস না হলে পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। আইন অনুযায়ী, আবেদনের ৯০দিনের মধ্যে কোনো আপস বা প্রত্যাহার আবেদন না করলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়।