নবম ও দশম তিথিতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে “সম্প্রীতির সেতুবন্ধন” অনুষ্ঠানের আয়োজন


394 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নবম ও দশম তিথিতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে “সম্প্রীতির সেতুবন্ধন” অনুষ্ঠানের আয়োজন
অক্টোবর ২২, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

আসাদুজ্জামান/ আব্দুর রহমান মিন্টু :
অসাম্প্রদায়িক চেতনার মোড়কে এক নতুন বাংলাদেশ আমাদের বুকে স্থান পেয়েছে। যে দেশের হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীষ্টান এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় এবং রক্ত দিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা সূর্য ছিনিয়ে আনে  সে দেশ অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক দেশ উল্লেখ করে সমবেত সুধিবৃন্দ  বলেন এই ধারা চলবে যুগ যুগ ধরে । চলবে  শতাব্দীর পর শতাব্দী যতোদিন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের  মানচিত্র খচিত থাকবে । এখানে কেবলমাত্র নিজ নিজ ধর্মগত পার্থক্য থাকলেও জাতীয় আদর্শ , মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশের সব মানুষ এক অভিন্ন ও একাকার ।

দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার মহানবমী ও দশমী তিথিতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব আয়োজিত ‘ সম্প্রীতির সেতুবন্ধন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় একথা ব্যক্ত করেন অভ্যাগতরা ।  বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন প্রতিবারের মতো এবারও দেশজুড়ে মহা ধুমধামে উদযাপিত হচ্ছে দুর্গা পূজা। হাজার হাজার ভক্ত পূজা মন্ডপে দর্শনার্থী হিসাবে সেখানে পূজা দিয়েছেন ।  আরতি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ।  জাঁকজমকপূর্ন এসব অনুষ্ঠানে হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ ছিল না ।  এসব অনুষ্ঠানে  তাদের এই শুভ্র  চেতনা ধারন করে তারা পূজার শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।  তারা বলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কিছু দুরাচার সন্ত্রাস ও জঙ্গিত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে যতোই আঘাত করার চেষ্টা করুক এদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ,মৌলবাদ ও সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না ।  সাতক্ষীরা তার স্পষ্ট প্রমান উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেন এখানে এক প্রান্তে মসজিদে মুয়াজ্জিনের আযান হয় আরেক প্রান্তে মন্দিরে পুরোহিতের পূজার মন্ত্রযপ ও ঘন্টা বাজে। যুগ যুগ ধরে মানুষ এই নির্মল সংস্কৃতি লালন করেছে । তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা কাছে টেনে নিয়েছে উদার সংস্কৃতি , বেছে নিয়েছে   পরিশীলিত সম্প্রীতি, মানুষের প্রতি ভালবাসা। এ প্রসঙ্গে তারা সাতক্ষীরায় এ বছর ৫৬৪ টি মন্ডপে মহাধুমধামে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ।  অপরদিকে ২০০১ সালে এই সাতক্ষীরায় দুর্গা প্রতিমার সংখ্যা ছিল ২৯৫ টি। দুর্গাপূজার সংখ্যার  বিস্তৃতি প্রমান করে এখানকার মানুষ পূর্ন ধর্মীয় স্বাধীনতায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন ।

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যাপক আবু আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও অংশ নেন সংরক্ষিত আসন ৩১২ এর সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিন।  তিনি বলেন ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে শুধু মাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য দেখেছি , বিভিন্ন ধর্মের  মানুষকে তার  নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে দেখেছি। দেখিনি আর দেখতেও চাইনা  কোন হীন সাম্প্রদায়িকতা যা মানুষে মানুষে হিংসা বিদ্বেষের জন্ম দিতে পারে ।  তিনি আরও বলেন এদেশের মানুষ কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করেনা বলেই তাদের মধ্যে সম্প্রীতির বাঁধন এতোটাই দৃঢ়। অনুষ্ঠানে অন্যতম অতিথি জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল আহসান বলেন সাতক্ষীরার মানুষের মধ্যে যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা দেখেছি তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানকার মানুষ নির্বিঘেœ নিজ ধর্ম পালন করেন ।  এখানকার মানুষ নিজ ধর্মের প্রতি তো বটেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল । সাতক্ষীরার কয়েকটি এলাকায় দুর্গোৎসবে যোগদানের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে তিনি বলেন সবখানে দেখেছি সম্প্রীতির মেল বন্ধন।  তারা প্রমান করেছেন ধর্ম যার যার কিন্তু  ধর্মীয় উৎসব সবার ।  এখানে তারা সবাই একই ছত্রতলে অবস্থান করছেন ।  এই মধুর দৃষ্টান্ত  বাংলাদেশের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে বলে  উল্লেখ করেন তিনি । অনুষ্ঠানের  অতিথি জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুনসুর আহমেদ বলেন আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য ।  সেই বাংলাদেশই আমাদের হৃদয়ে । সেই বাংলাদেশ আমাদের দৃষ্টিসীমায় ।সাতক্ষীরা বাংলাদেশের একটি জঙ্গি ও জামায়াতের  ঘাঁটি এমন অসত্য ধারনা করার কোনো কারণ  নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি । অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এএসএম এহতেশামুল হক বলেন বাংলাদেশ শান্তির দেশ । বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে তার  প্রশংসা করে তিনি বলেন এই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত দেশের সব স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে । তিনি বলেন সাতক্ষীরা বাংলাদেশের  একটি মডেল জেলা । এই জেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি  আমাদের মুগ্ধ করেছে । তিনি এই ধারা অব্যাহত রাখার আহবান জানিয়ে আরও বলেন এর থেকে আমাদের সকলকে শিক্ষা নিতে হবে । সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদদাচ্ছের হোসেন বলেন সাতক্ষীরার আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে চমৎকার ।  এখানে ধর্মীয় সন্ত্রাস নেই ।  এখানে উগ্র জঙ্গিবাদ নেই ।  জেলার অনেকগুলি দুর্গা প্রতিমা দর্শনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে তিনি বলেন এখানে হিন্দু মুসলমান সবাই নিজেরা চাঁদা তুলে দুর্গাপূজা করে বারবার প্রমান করেছেন তারা অসাম্প্রদায়িক । তিনি বলেন সাতক্ষীরা বাংলাদেশের  অনুকরনীয় মডেল ।  জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন  সম্পাদক  মো. নজরুল ইসলাম বলেন বাংলাদেশ এখন পেট্রল সন্ত্রাসের দেশ নয় । এদেশ শান্তির দেশ । এদেশে আমরা সবাই জাতি ধর্ম ও বর্নভেদে অসাম্প্রদায়িক। আমরা ঈদ পূজা এক সাথে মিলে মিশে উদযাপন করি বলে মন্তব্য করেন তিনি । জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন বলেন  আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক এতোটাই গভীর যে ঈদ পূজা বলে কোনো পার্থক্যই থাকেনা ।  আমরা এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আমাদেরই বলে সহযোগিতা করি এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি।সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান বাবু বলেন আমি সকল পূজা অনুষ্ঠানে যেয়ে মানুষে মানুষে যে সম্প্রীতি দেখেছি তাতে এটাই বলতে পারি আমরা এক ও অভিন্ন । আমরা একটি বৃন্তের  দুটি ফুল হিন্দু আর মুসলমান । আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই ।  হানাহানি নেই ।  বিশিষ্ট সমাজসেবক ও চিকিৎসক ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন আমরা কখনও  নিজেদের মধ্যে বিভেদ দেখতে চাইনা ।  আমরা সবাই ভাই ভাই । আমরা সম্প্রদায় বর্ন গোত্র দেখিনা ।  আমরা সবাই মানুষ এবং আমরা নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনে বিশ্বাস করি  ।  সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ আবদুল সাদী দেবী দুর্গার ধরাধামে এসে  অসুরিক শক্তিকে ধ্বংস করে বিশ্ব জুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার শাস্ত্রীয় উপাখ্যান তুলে ধরে বলেন দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ সাধন করেন । আর  আমরা সেই শান্তির সুধা পান করি ।  এজন্য আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই ।আমরা মানুষ । আমাদের নিজ নিজ ধর্ম আছে ।  আমরা নিজ ধর্মের  প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতি একইভাবে শ্রদ্ধাশীল । সাতক্ষীরা পৌরসভার সাবেক মেয়র শেখ আশরাফুল হক বলেন কে হিন্দু কে মুসলমান তা দেখার বিষয় নয় । বরং আমরা সবাই মানুষ , একই জলহাওয়ায় আমরা বড় হয়েছি।আমরা একই চেতনায় বিশ্বাস করি । সাতক্ষীরা পৌরসভার প্যানেল মেয়র শফিকুদ্দৌলা সাগর বলেন আমরা ধর্মীয় সম্প্রীতিতে জড়িয়ে রয়েছি।  আমরা কখনও ভাবতে পারি না কে হিন্দু আর কে মুসলমান । তিন বলেন হিন্দুরা যান মন্দিরে আর মুসলমানরা যান পবিত্র মসজিদে।সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান কোহিনুর ইসলাম বলেন দুর্গাপূজায়  আমরা শ্রদ্ধা জানাই । আমাদের ঈদ ও পূজার উৎসবের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই ।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা  প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী , বিশিষ্ট সাংবাদিক কল্যান ব্যানার্জি, সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারন সম্পাদক এম কামরুজ্জামান  প্রমুখ। ভোরের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার এড. ড. দিলীপ কুমার দেবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রেসক্লাব সেক্রেটারি মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল ।  অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সাতক্ষীরার এনডিসি আবু সাঈদ, জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ছাইফুল করিম সাবু, অ্যাড: আজহারুল ইসলাম, কহিনুর ইসলাম, লেখক সালেহা আক্তার, এনজিও পরিচালক আব্দুস সবুর প্রমুখ।

পরে অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের লুচি ,মাংস আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় ।
এদিকে সন্ধ্যায় খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মনির উজ জামান  সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে উপস্থিত হন । এমন একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে  যথা সময়ে আসতে না পারার  ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন ‘ সাতক্ষীরা আমার নিজের স্থান’ ।  এখানে ২০১৩ এর সহিংস ঘটনাবলী দেশ ও দেশের মানুষকে  বিভ্রান্ত করেছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন আজ সেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিত্বকে পরাভূত করে সাতক্ষীরায় এখন শান্তির সুবাতাস বইছে ।একাত্তরের পরাজিত শক্তির দৌরাত্মকে ভেঙ্গেচুরে দিয়ে মানুষ এখানে প্রতিষ্ঠা করেছেন শান্তি । সাম্প্রদায়িক  দুরভিসন্ধির প্রতি  ঘৃনা জানিয়ে  তিনি বলেন সাতক্ষীরার মানুষ শান্তির কবুতর উড়িয়ে শুভ্র পরিশীলিত অসাম্প্রদায়িকতার  পরিচয় দিয়েছেন । তাদের এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চেতনায় নিজেদের দৃঢ় স্থান করে নিতে হবে ।এসময় প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যাপক আবু আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জলসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদদাচ্ছের হোসেন, এএসপি সার্কেল মো. আনোয়ার সাঈদ , এএসপি সার্কেল মেহেদী হাসান এবং পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা ।