নামছে পানির স্তর বাড়ছে সেচ খরচ


447 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নামছে পানির স্তর বাড়ছে সেচ খরচ
জানুয়ারি ২৬, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email
  • প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে লাগে সাড়ে ৩ হাজার লিটার পানি

অনলাইন ডেস্ক ::

সারাদেশে চলছে বোরো ধান রোপণ। বোরো মৌসুমে এক কেজি ধান উৎপাদনে সাড়ে তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এ পানির জোগান আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। পাম্পের মাধ্যমে সেচের পানি তুলতে গিয়ে চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ওপর। এক মৌসুমে বোরো উৎপাদনে হাজার কোটি টাকার জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে। এতে বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়। দেশের কৃষক সেচের পেছনে মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৬২ শতাংশ অর্থ খরচ করে থাকেন। এ খরচ বিশ্বে সর্বোচ্চ।

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণার বরাত দিয়ে দেশের সেচ ব্যবস্থার এই চিত্র তুলে ধরা হয়। নতুন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের জন্য মন্ত্রণালয়ের সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক দেশ ভূগর্ভস্থ পানি কৃষিকাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, প্রতিবছর ভূগর্ভস্থ পানি ৩ থেকে ৮ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। পানি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের তথ্যমতে, ভূগর্ভের পানির অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে সেচের পাশাপাশি সুপেয় পানির পরিমাণও কমতে শুরু করেছে। পানির স্তর যত নিচে নামবে, বোরোর উৎপাদন খরচ ততই বাড়বে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০-৮১ সালে এক কেজি ধান উৎপাদনে সেচের পানির প্রয়োজন হতো ২ হাজার ৮০০ লিটার। ২০০৬-০৭ সালে তা বেড়ে ৩ হাজার ২০০ লিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালে তা সাড়ে তিন হাজার লিটারে উঠেছে। প্রতি বছরই ধান উৎপাদনে পানির ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে হাইব্রিড ধানের ব্যবহার বাড়ায় পানির প্রয়োজন বাড়ছে। কৃষকরাও ভালো ফলনের আশায় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) হিসাবে, বর্তমানে দেশে কৃষিকাজে ব্যবহার করা পাম্প আছে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩০টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ১১ লাখ ৯২ হাজার ৬৩০টি। বিদ্যুতে চলে মাত্র ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪০০টি। অগভীর নলকূপ বিদ্যুতে চলে ১ লাখ ৫০ হাজার। ডিজেলে চলে ১০ লাখ ৭০ হাজার। গভীর নলকূপের মধ্যে ১২ হাজার ডিজেলে এবং ২৬ হাজার বিদ্যুতে চলে। বোরো মৌসুমে ১৭ লাখ শ্যালো টিউবওয়েল কার্যকর থাকে। আগে এসব টিউবওয়েলে ২০ থেকে ২২ ফুট মাটির নিচ থেকে পানি তোলা যেত। কিন্তু এখন মাটির ২৮ ফুট নিচে গিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষক পাঁচ ফুট মাটি গর্ত করে সেখানে শ্যালো টিউবওয়েল বসাচ্ছে। এর পরও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৭০-৭১ সালে প্রকৃতিনির্ভর আমন ও আউশ থেকে মোট উৎপাদনের সিংহভাগ আসত। মাত্র ২০ শতাংশ ফসল আসত বোরো থেকে। এখন দেশের ৬০ শতাংশ চাল আসে বোরো থেকে। ৩০ শতাংশ আমন এবং ১০ শতাংশ আসে আউশ থেকে। এ সময়ে বোরোর মোট উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আট গুণ। এ সময়ে দেশে বর্ষার পানিনির্ভর আউশের চাষ কমেছে এক-তৃতীয়াংশ জমিতে। আর আমনের চাষ কমেছে ৪৪ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের সেচ বিষয়ে পরামর্শক ড. ইফতেখারুল আলম বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হবে, বাড়াতে হবে সেচ দক্ষতা; সেইসঙ্গে পানির উৎস তৈরি করতে হবে। নদী-নালা খনন ও বড় বড় জলাশয় তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, যত্রতত্র পানি ব্যবহারের ফলে কৃষকের সেচ খরচ বাড়ছে। পানি কম লাগে- এমন জাতের উদ্ভাবন করতে হবে। তিনি বলেন, ভূ-উপরিস্তরের পানির ব্যবহার না বাড়লে এবং বৃষ্টির পানি ধরে না রাখতে পারলে আগামীতে ভয়াবহ সেচ সংকটের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, আউশ ও আমন ধানের উৎপাদনে সরকারকে জোর দিতে হবে। এ দুটি ফসলের উৎপাদন খরচ কম। বৃষ্টির পানিতে আবাদ করা যায়। অথচ বোরো ধান আবাদে নিয়মিত সেচ দিতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির সংকটে পড়ছে দেশ। বোরো উৎপাদনে রাসায়সিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় জীববৈচিত্র্যসহ নষ্ট হচ্ছে পানি, পরিবেশ ও মাটির উর্বরা শক্তি।

কৃষিবিদ ড. আতাউর রহমান আউশ ও আমনের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, বোরোতে সরকার সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দিকে বিশেষ নজর দিলেও আমন আর আউশে তেমন নজর দিচ্ছে না। আমন ও আউশের উৎপাদন বাড়াতে হলে দেশি প্রজাতির ধানের পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষের আওতা বাড়াতে হবে। বন্যা এলাকার জন্য বন্যা সহিষ্ণু জাতের ধানের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সূত্র : দৈনিক সমকাল।