নিরাপত্তা হুমকিতে সচিবালয়


469 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নিরাপত্তা হুমকিতে সচিবালয়
আগস্ট ২৯, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক ;
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাস বাণিজ্যের কারণে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সচিবালয়ের আশপাশের রাস্তাঘাটে নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি থাকলেও ভিতরে ফস্কা গেরো অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানে অবলীলায় ঢুকে পড়ছে যে কেউ। ভিতরে সরকারবিরোধী লিফলেট বিতরণ করা যায়, চার দেয়ালের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও চলে বোমাবাজি। যখন তখন চুরির ঘটনাও ঘটে সচিবালয়ে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, মন্ত্রণালয়ের কার্পেট এমনকি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সামনে থেকে নতুন কেনা গাড়িও অনায়াসে চুরি হয়ে যায়। সচিবালয়ের সীমানাপ্রাচীরের বাইরে পুলিশের সদা সতর্ক পাহারা, কোনায় কোনায় বসানো আছে চেকপোস্ট। নজরদারি থাকছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থারও। কিন্তু ভিতরে ঢিলেঢালা স্টাইলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় রীতিমতো অবাক হচ্ছেন মানুষজন। জানা গেছে, এতসব নিরাপত্তার পরও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে কৌশলে প্রবেশ করে একশ্রেণির প্রতারক ও দালাল। তারা গেটের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কৌশলে ম্যানেজ করে ভিতরে প্রবেশ করে।
কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে বাইরের লোক সচিবালয়ে অহরহ প্রবেশ করছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তার প্রশ্নে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। গেট গলিয়ে অবাধে প্রবেশ করার সুযোগ কারও নেই। ভিতর থেকে পাস সংগ্রহ করেই লোকজন যাওয়া-আসা করে। ভিতর থেকে পাস দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছুই করার থাকে না। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সচিবালয়ে স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত গাড়ি প্রবেশ করায় স্টিকারবিহীন গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। জায়গা সংকুলান না হওয়া ও নিরাপত্তার স্বার্থে স্টিকারবিহীন কোনো গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে গত রবিবার ও সোমবার দুই দিন সচিবালয়ের গেটগুলোয় অবস্থান নিয়ে স্টিকারবিহীন বেশ কিছু গাড়ি ঢুকতে ও বের হতে দেখা গেছে। কয়েকটি গাড়িতে নম্বর প্লেট পর্যন্ত ছিল না। সোমবার সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে কালো রঙের নম্বর প্লেটবিহীন একটি নতুন পাজেরো ১ নম্বর গেট গলিয়ে ঢুকে পড়ে। গেটে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা ‘চালক পরিচিত’ এ অজুহাতে বাধা দেননি। এর পরপরই সাদা একটি মাইক্রোবাস বিনা বাধায় ভিতরে ঢুকে যায়। মাইক্রোর সামনে-পেছনে শুধু ‘মানবাধিকার কাজে নিয়োজিত’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছিল। তা ছাড়া ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে নিয়োজিত, আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত, ‘পদ্মা সেতু জরুরি’ ইত্যাদি সাইনবোর্ড লাগানো একের পর এক মোটরগাড়ি অবলীলায় সচিবালয়ে ঢোকে, বের হয়- আরোহীদের গাড়ি ব্রেক করে নিজেদের পরিচয়টুকু দিতেও দেখা যায়নি। মন্ত্রী-সচিবদের গাড়িচালকদের অনেকে দর্শনার্থীদের গাড়িতে তুলে অনায়াসে ভিতরে ঢুকে পড়েন। এসব চালক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের নামিয়ে জ্বালানি নেওয়ার ছুতায় বাইরে বেরিয়ে যান। এক পর্যায়ে বাইরে অপেক্ষমাণ পাসবিহীন দর্শনার্থীদের টাকার বিনিময়ে গাড়িতে তুলে আবার সচিবালয়ে ঢুকে পড়েন। ৪ আগস্ট ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের গাড়িচালক শহিদ এমন দর্শনার্থীদের ভিতরে ঢোকানোর চেষ্টাকালে পুলিশের হাতে আটক হন। এ সময় পুলিশ ধর্মমন্ত্রীর গাড়ির ভিতর থেকে পাসবিহীন দুই ব্যক্তিকেও আটক করে। পুলিশ জানায়, পাসবিহীন ওই দুই দর্শনার্থীকে ঘুষের বিনিময়ে গাড়িচালক সচিবালয়ে ঢোকানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। তা ছাড়া সচিবালয়ে প্রবেশ করার জাল পাস কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।সচিবালয় থেকে বেরিয়ে খাদ্য ভবনমুখী গেটের পাশেই চুল্লিঘরের পাশে হাঁটু দাবিয়ে বসা চার ব্যক্তিকে খোশগল্পে মেতে থাকতে দেখা যায়। সব মন্ত্রণালয়ের রাফ নথিপত্র এ চুল্লিঘরে এনেই জমা রাখা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রবেশের চোরাগলিতে হরদম লোকজন আড্ডায় মত্ত থাকে। সিঁড়িঘরের পাশ দিয়ে পেছন দিকে যাতায়াত করার গলিটি এখন গাড়িচালক ও দর্শনার্থীদের ধূমপানের খোলা ময়দান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সচিবালয়ের এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাওয়ার রাস্তাজুড়ে এলোপাতাড়িভাবে অসংখ্য গাড়ি পার্কিং করে রাখা থাকে। গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে কাতচিৎ হয়ে দর্শনার্থীদের এ ভবন-ও ভবন ছোটাছুটি করতে হয়। এদিকে সচিবালয়ের ভিতরে প্রতিটি ভবনের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, ক্যান্টিনের চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত সর্বত্রই নেতা-কর্মীদের পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার লাগিয়ে নিজেদের ইমেজ গড়ে তোলার বিদঘুটে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেছে। সচিবালয়ের এমন কোনো দেয়াল ফাঁকা নেই যেখানে পোস্টার পাওয়া যাবে না। সবই ক্ষমতাসীন দলের পাতিনেতাদের। আঞ্চলিক ও সহ-সংগঠনের পাতি গোছের এই নেতাদের পোস্টারে ব্যবহার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি। সচিবালয়ের গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ের দেয়ালে পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, ফেস্টুন লাগানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তা কেউ মানছে না। বরং মন্ত্রীরা যেসব ভবনে অফিস করেন বা যে লিফট ব্যবহার করেন সেসব ভবনের প্রধান ফটক এবং লিফটের গোড়ায় বেশি বেশি পোস্টার সাঁটানো। শুধু নেতা-কর্মীদের পোস্টারই নয়, বিভিন্ন পত্রিকার প্রচারসংবলিত স্টিকার ও আশেকে রসুল সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত পোস্টারের পাশাপাশি ‘প্লট বিক্রি হবে’ মর্মে হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তিও লাগানো রয়েছে সচিবালয়ের দেয়ালে দেয়ালে। গণপূর্ত বিভাগের এসও মর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে ধুয়েমুছেও প্লাস্টিক সাইনের কড়া আঠাযুক্ত স্টিকারগুলো দেয়াল থেকে পুরোপুরি তোলা যায় না। সচিবালয়ের ঢিলেঢালা নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে চুরির ঘটনাও ঘটে অহরহ। মন্ত্রণালয়ের ফাইল কেবিনেট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নথি, নকশা পর্যন্ত পাচার হওয়ার নজির আছে। এর আগে সচিবালয় থেকে তাড়া করে একটি মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ ০২-২৮৯৬) ও চালক রোস্তম আলীকে আটক করে পুলিশ। মাইক্রোবাসটি থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দুটি দামি কার্পেট, আলোচিত কয়েকটি সেতুর নকশা, বিভিন্ন সড়কের মানচিত্র, সরকারি হিসাবসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির নানা সিদ্ধান্তের নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের গোড়ার দিকে সচিবালয়ের কিছু দলিলপত্র রাজধানীর এক ভাঙাড়ির দোকান থেকে উদ্ধার করা হয়। কেজি দরে বিক্রি করার সময় এসব দলিল-দস্তাবেজ উদ্ধার করেন জাতীয় আর্কাইভের কর্মকর্তারা। খোদ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সামনে থেকে ৩০ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি চুরির ঘটনাও ঘটেছে। সিসিটিভির ফুটেজ দেখেও শনাক্ত করা যায়নি চোর, উদ্ধার হয়নি গাড়িটি। এমন ঢিলেঢালা নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগে বার বার সচিবালয়ে বোমা ও ককটেল হামলার ঘটনাও ঘটে। চলতি বছরের ১০ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেটের কাছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পত্র গ্রহণ কেন্দ্রের ছাদে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। আরও একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয় সচিবালয়-ঘেঁষা সরকারি পরিবহন পুল ভবনের সামনে। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ের ৩ নম্বর গেটের ভিতরে ও বাইরে পরপর দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, সচিবালয়ের ভিতরে ও বাইরে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকারি উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে সবচেয়ে আলোচিত বোমা হামলার ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের ১৯ এপ্রিল। ১৮-দলীয় জোটের হরতাল চলাকালে সচিবালয়ের ভিতরে ও বাইরে একযোগে দুটি শক্তিশালী ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ ঘটনায় বিএনপি মহাসচিবসহ ২৯ জন নেতাকে আসামি করা হয়। তা ছাড়া সচিবালয়ের ভিতরে মাঝেমধ্যেই সরকারবিরোধী পোস্টার, লিফলেট, প্রচারপত্র বিলির ঘটনায় গোটা নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের ভিতরে-বাইরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার পর সিসি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর, কার ডিটেক্টরসহ নানা প্রযুক্তি স্থাপনসহ পুলিশ ও আনসারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। সেখানে আর ঢিলেঢালা কোনো অবস্থা নেই বলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন।—সুত্র:-বাংলাদেশ প্রতিদিন