নির্বাচনী ইশতেহারে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে : সিপিডি


303 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নির্বাচনী ইশতেহারে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে : সিপিডি
ডিসেম্বর ৯, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব আলোচনা করছে, সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয় এখনও পর্যন্ত স্থান পায়নি। তারা নির্বাচন পদ্ধতি, সবার জন্য সমান মাঠ, আসন বণ্টন ইত্যাদির আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং উন্নয়নের গুণগতমান নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

রোববার সিপিডি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ শীর্ষক পর্যালোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। আরেক সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য পর্যালোচনার ওপর মতামত দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

প্রতি তিন মাস পরপর সিপিডি দেশের অর্থনীতির সমস্যা ও সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে স্বাধীন মতামত দিয়ে থাকে। এবারের পর্যালোচনায় গত ১০ বছরের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত তা তুলে ধরা হয়।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু জনগণের জীবন-জীবিকার বিষয় নির্বাচনী আলোচনায় অনুপস্থিত। এই বিষয়গুলো আলোচনা আনতে হবে। কারণ দেশের উন্নয়ন হলেও সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের যা পাওয়ার কথা ছিল, তা পায়নি। সরকার নির্বাচনে জনগণের ভূমিকা না থাকলে তা টেকসই হয় না।

দেবপ্রিয় বলেন, গত ১০ বছরে ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। স্থিতিশীলতাও ছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত বিস্তৃত হয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় উন্নয়নের ধারায় বড় ধরনের উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে প্রথম পাঁচ বছরের তুলনায় পরের পাঁচ বছরে কাঠামোগত সংস্কার ও নীতি পর্যালোচনা শ্নথ হয়েছে। আবার ১০ বছরের প্রথম পাঁচ বছরে উন্নয়নের যে গতি ছিল, শেষ পাঁচ বছরে তা কিছুটা ধীর হয়েছে। এ সময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে। নতুন নীতি নিয়ে নতুন উদ্যোগে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়েছে। গত ১০ বছরে সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যা পাওয়ার কথা তা তারা পায়নি।

তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও শেষ পাঁচ বছরে কমে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে।

দেবপ্রিয় বলেন, প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখে বৈষম্য কমাতে হবে। কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ দরকার, বিশেষত শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব শিল্প শুধু রফতানিমুখী হলে হবে না, অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্যও নতুন শিল্প দরকার। শস্য উৎপাদনে প্রণোদনা দিতে হবে। এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতে প্রকট বৈষম্য রয়েছে, যা কমাতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও এলএনজি ভোক্তারা কী দামে পাবেন, তা নির্ধারণে নীতিমালা দরকার।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সামনে সবার দৃষ্টি থাকবে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের ওপর। এজন্য সিপিডিও অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সেভাবে করেছে। যাতে পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এই পর্যালোচনা থেকে নীতি তৈরিতে সহায়তা নিতে পারে। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে মোট রাজস্ব আয় বেড়েছে। তবে প্রথম পাঁচ বছর রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত যে হারে বেড়েছিল, শেষ পাঁচ বছরে তা বাড়েনি। তিনি রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো, সম্পদ কর আরোপ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমাতে হলে প্রত্যক্ষ কর আহরণ বাড়াতে হবে। চালু করতে হবে সম্পদ কর। দেশের কর দেওয়ার যোগ্য ৬৮ ভাগ মানুষ কর দিচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং ইশতেহারে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য তিনি বলেন, কর ব্যবস্থাপনা আরও করদাতাবান্ধব করতে হবে। এ ছাড়া ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

অর্থ পাচার বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাজস্ব বোর্ডের ট্রান্সফার প্রাইসিং পদ্ধতিকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় ভর্তুকি নীতিমালা করতে হবে। কারণ জ্বালানি তেল ও এলএনজিতে যে ধরনের সমন্বয় করা লাগবে, তাতে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। এজন্য নীতিমালা করে ভোক্তা মূল্য ও ভর্তুকি নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থায়ন করছে উচ্চ সুদের অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে। আগামীতে এই ঋণ পরিশোধে ঋণ করা লাগতে পারে। এ রকম দুষ্টু চক্রে পড়ে গেলে তা অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। এজন্য সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমাতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামীতে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থা থেকে বাজারভিত্তিক সুদে ঋণ নেওয়ায় ঋণের ভারও বাড়বে। এজন্য ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে।

সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দরকার বিনিয়োগের উৎকর্ষতাও। বিশেষ করে মাঝারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান যাদের বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের সহযোগিতা দিতে হবে। রফতানি বৈচিত্র্যকরণের নতুন উদ্যোক্তাদের নীতিসহায়তা দরকার।

এতে বলা হয়, বর্তমানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শিক্ষিতরা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। কারণ শিক্ষিতরা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। আবার নিয়োগদাতারা চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোক পাচ্ছে না। দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো দরকার।

সিপিডি মনে করে, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতের সম্পদের মান খারাপ হয়েছে। ব্যাংক থেকে অনেক অর্থ ব্যক্তির পকেটে চলে গেছে। অন্যদিকে, সরকার জনগণের অর্থে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাচ্ছে।

সিপিডি আশা করে, আগামীতে যে সরকার আসবে তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করবে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ এই পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই উপস্থিত ছিলেন।