নেতাদের পকেটে পৌনে চারশ’ কোটি টাকা


405 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
নেতাদের পকেটে পৌনে চারশ’ কোটি টাকা
জুলাই ২২, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডেস্ক :
বাজারে মোটা চাল ২২ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা নিম্নমানের চালের কেজি সর্বোচ্চ ২০ টাকা। কৃষককে মুনাফা দিতে বাজারদরের চেয়ে ১০ টাকা বেশি ৩২ টাকা কেজিতে সরকারি খাদ্য গুদামে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। অথচ বাড়তি দামের সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারা কৃষকের লাভ পকেটে পুরছেন। কম দামে ভারতীয় চাল কিনে সরকারি খাদ্য গুদামে বেশি দামে বিক্রি করছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা। এরই মধ্যে তারা পৌনে চারশ’ কোটি টাকার বেশি পকেটে ভরেছেন। এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৩৭ হাজার ২৭০ টন বা ৫৩ কোটি ৭০ লাখ কেজি চাল কিনেছে সরকার। বাকি আরও পাঁচ লাখ টন চাল এবং এক লাখ টন ধান একই মূল্যে কেনা হবে।

বাম্পার ফলন, ভারতীয় চালের ছড়াছড়ি ও বাজারে চালের দাম কম থাকায় বাড়তি লাভের আশায় সরকারি গুদামে ধান-চাল সরবরাহকারীর তালিকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা যোগ দিয়েছেন। অনেক এলাকায় ধান-চাল সরবরাহ এমপিদের কব্জায় রয়েছে। তারা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ধান-চাল বিক্রির স্লিপ বিক্রি করে কমিশন নিচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরনো কৃষি উপকরণ বিতরণ কার্ডের নাম ব্যবহার করে ধান-চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্গাচাষির নামেও খাদ্য গুদামে ধান-চাল সরবরাহ দেখানো হয়েছে। অথচ যাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তারা বিক্রির মতো ধান-চালের আবাদই করেননি। চাল সরবরাহের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ‘নেতাদের’ মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। অনেক জেলা-উপজেলায় এ নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

অনেক এলাকায় স্থানীয় এমপিরা চাল সরবরাহের স্লিপ নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমদ সমকালকে বলেন, সারাদেশ থেকেই এমন অভিযোগ আসছে। তদন্ত করে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় চাল খাদ্য গুদামে রাখার বিষয়টি তিনি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান। এমপি ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের কমিশন বাণিজ্য ও গুদামে ধান-চাল সরবরাহের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে যেসব এলাকার খাদ্য গুদাম সম্পর্কে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান তিনি।

কৃষকের কাছ থেকে চাল কিনতে কয়েকটি কৃষক সংগঠন সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। ওয়ার্কার্স পার্টির সহযোগী সংগঠন জাতীয় কৃষক সমিতির পক্ষ থেকেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। ধান-চাল ক্রয়ে দুর্নীতি-সিন্ডিকেট বন্ধের জন্য স্মারকলিপি দিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির ছয় সংসদ সদস্য। বিবৃতিদাতারা হচ্ছেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, হাজেরা সুলতানা, মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, শেখ হাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ইয়াসিন আলী ও শেখ টিপু সুলতান।

তারা বলেন, ক্রয়কেন্দ্রের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও বিশেষ ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সহায়তায় সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলো দখল করে কৃষকদের সরাসরি ক্রয়কেন্দ্রে ধান ও চাল বিক্রিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ওই চক্রটি ধান ও চাল তুলনামূলক কম মূল্যে কিনে সরকারি মূল্যে বিক্রি করছে। গত ৩ মার্চ খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে ১০ লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। কৃষকের কেজিতে সাড়ে ৪ টাকা লাভ ধরে দাম নির্ধারণ করা হয় কেজিপ্রতি ৩২ টাকা। চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে গত ১ মে থেকে। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এর আগে সরকার চলতি মৌসুমে দেড় লাখ টন গম সংগ্রহ করে। ২৪ টাকা দরে গম কেনা হয়।

যদিও সরকারিভাবে গম কেনার সময় বাজারে গমের কেজি ছিল ১৫ থেকে ১৮ টাকা। সরকারি খাদ্য গুদামে গম সরবরাহেও আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কৃষকের গম নামে-বেনামে সরবরাহ করে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। ভারত থেকে শূন্য শুল্কের সুযোগে গত বছর বেসরকারিভাবে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এই চালের প্রভাবেই বাজারে ধান ও চালের দাম কমছে। ভারত থেকে আসা প্রতি কেজি মোটা চাল ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

সরকার শেষ পর্যন্ত চাল আমদানিতে শুল্ক আরোপ করলেও ভারত থেকে চাল আমদানির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। পাবনায় এমপিদের নামে চাল সরবরাহের অভিযোগ :আমাদের প্রতিবেদক এবিএম ফজলুর রহমান জানান, পাবনা জেলার ৯টি সরকারি খাদ্য গুদামে মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বাজারের নিম্নমানের চাল ২৫-২৬ টাকা দরে কিনে সরকারি গুদামে ৩২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি এলএসডি গুদাম ইনচার্জ টনপ্রতি চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে উৎকোচ নিয়ে কথিত সিন্ডিকেট মিলারদের কাছ থেকে এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা নিম্নমানের চাল ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই উৎকোচের টাকার ভাগ ওসিএলএসডি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পর্যন্ত পেয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পছন্দের লোকজন মিলারদের সিল-প্যাড ব্যবহার করে এ সব অপকর্ম করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিলার ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর আত্মীয়-স্বজন সাঁথিয়া ও বেড়া খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহ করেছেন। পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজুর পছন্দের কথিত মিলাররা বেড়া ও সুজানগরে, পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনের ছেলে এবং দলীয় লোকজন চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর খাদ্য গুদামে, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্সের কাছের লোকজন এবার খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহের সুযোগ পেয়েছেন।

পাবনা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মোশারোফ হোসেন সমকালকে বলেন, তার মিল থেকে মাত্র ৬৫ টন চাল কেনার জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পাবনা জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি ফজলুর রহমান মালিথা সমকালকে জানান, প্রকৃত মিল মালিকরা এবার চাল সরবরাহের সুযোগ পাননি। ফলে মিলারদের সিল-প্যাড ব্যবহার করে যারা চাল গুদামে দিয়েছে তারাই খারাপ চাল দিয়েছে। পাবনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মঈন উদ্দিন জানান, ভারতীয় চাল বা নিম্নমানের চাল কেনার কথা সঠিক নয়। তবে এমপির কোটা আছে,্ সেই কোটায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিছু চাল কেনা হতে পারে।

যশোরের চিত্র: যশোর অফিস থেকে তৌহিদুর রহমান জানান, কেশবপুর খাদ্য গুদামে চলতি বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা অর্থাৎ প্রতি কেজি ২২ টাকা দরে ৩৩০ টন বোরো ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। খাদ্য গুদামে ধান বিক্রয়ের বিষয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে স্লিপ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এ সুযোগে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারি দলের কর্মীরা হাতিয়ে নিচ্ছে ধান বিক্রির স্লিপ। তারা প্রতি টন ধানের স্লিপ খাদ্য গুদামকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে ২৫শ’ টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে। শুধু কেশবপুর নয়, জেলার অন্যসব সরকারি খাদ্য গুদামেও পরিস্থিতি একই।

সাধারণ মিল মালিকরা অভিযোগ করেছেন, চাল সংগ্রহে যশোর সদর উপজেলায় প্রতিটি মিলারের কাছ থেকে টনপ্রতি ৩ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। কেশবপুর উপজেলা থেকে টনপ্রতি সাড়ে ৩ হাজার ও অভয়নগর উপজেলা থেকে টনপ্রতি ৪ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কেশবপুর উপজেলার খাদ্য গুদামে বস্তাপ্রতি এক কেজি চাল বেশি নেওয়া হচ্ছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি জায়েজ করতে মাগুরা থেকে বদলি করে আনা হয়েছে দু’জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো সঠিক হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জয়পুরহাটে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি টাকা: জয়পুরহাট থেকে রতন কুমার খাঁ জানান, চাতাল মালিকরা চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত ২৪ কোটি টাকা। ধান থেকে উৎপাদিত চালের মূল্য যেখানে পড়ছে কেজিপ্রতি ২১ টাকা, সেখানে সরকারী দর ৩২ টাকা হওয়ায় এই বিপুল অঙ্কের অর্থ তাদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি গুদামের বিভিন্ন প্রকল্পের চাল বাইরে না গিয়ে মিলারদের নামে সমন্বয় করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। চালের পাশাপাশি ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রেও মারাত্মক অনিয়ম হয়েছে জেলা সদরের খাদ্য গুদামে। কৃষকের নামে ধান দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কৃষক জানেন না যে তার নামে ধান ঢুকেছে খাদ্য গুদামে। কথিত কৃষকের নামে সরকারি দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় একটি সিন্ডিকেট এরই মধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে ১০ লাখ টাকা।

সদর উপজেলার ইছুয়া গ্রামের কার্ডধারী ১৪ জনের মধ্যে ১১ কৃষক জানিয়েছেন, তারা কেউ জয়পুরহাট সরকারি খাদ্য গুদামে চলতি মৌসুমে ধান দিতে আসেননি। তাদের নামে কে বা কারা ধান দিয়েছে। জানা গেছে, ওই ১১ জনের আটজনই প্রান্তিক কৃষক। ভুয়া কৃষক ছাড়াও কৃষকের কার্ড নিয়েও জালিয়াতি করা হয়েছে। সদর খাদ্য গুদামে কৃষকের নামে দাখিল করা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডগুলো অনেক আগেই কৃষি বিভাগ বাতিল করেছে। অথচ ওইসব কার্ড দেখিয়েই গুদামে ধান ঢুকানো হয়েছে।

নওগাঁয় টনপ্রতি ১২০ টাকা উৎকোচ: এম আর ইসলাম রতন জানান, নওগাঁয় সরকারি খাদ্য গুদামে প্রতি টন চালের বিপরীতে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা হারে উৎকোচ দিতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিকদের নেতা ও খাদ্য কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এই উৎকোচ বাণিজ্য চলছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, চুক্তির সময় খাদ্য অফিস প্রতি টনে ৮০ টাকা করে উৎকোচ নিয়েছে। এ ছাড়া খাদ্য গুদামে চাল দিতে গেলে নানা অজুহাত দেখিয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা টনপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা করে প্রকাশ্যে উৎকোচ নিচ্ছেন। শহরের হাজি চালকলের স্বত্বাধিকারী হাজি গুলজার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকার বেশি দামে চাল কেনায় মিলাররা এবার কিছুটা লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কিন্তু প্রতি টনে খাদ্য বিভাগের লোকজনকে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা ও গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ করে আর লাভের কিছুই থাকছে না। মহাদেবপুর এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ ক’জন মিলার অভিযোগ করে জানান, উৎকোচ না দিয়ে সরকারি গুদামে চাল দিতে গেলে নির্দিষ্ট মানের হয়নি- এমন অজুহাত দেখিয়ে চাল ফেরত পাঠাচ্ছেন কর্মকর্তারা। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। যাদের চাল খারাপ হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে শুধু তারাই এমন মিথ্যা অভিযোগ করছেন।

সূত্র- সমকাল