পদদলনের মুখে করোনা মহামারি


133 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পদদলনের মুখে করোনা মহামারি
জানুয়ারি ১৬, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

বৈশ্বিক আতংকের নাম করোনা ভাইরাস। বিশ্বের তাবৎ মানুষ করোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। কিভাবে করোনাকে পরাজিত করা যাবে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভাবনার অন্ত নেই। তারা বলেছেন টিকা আবিস্কার করে করোনাকে ধরাশায়ী করা হবে। এরই মধ্যে টিকা আবিস্কার হয়েছে। টিকার প্রয়োগও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশও অচিরেই এই টিকা হাতে পাবে।
চীনের উহান প্রদেশে করোনার জন্ম ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী।ধনী গরিব সব দেশেই হানা দিয়েছে করোনা। তবে সেই উহান কিন্তু করোনামুক্ত। সেখানকার মানুষের মাঝে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তা সত্ত্বেও তারা শীত মওসুমে করোনার দ্বিতীয় থাবা নিয়ে চিন্তিত। ইউরোপের কয়েকটি দেশে করোনার থাবায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তারাও আতংকিত শীত মওসুমে করোনার সম্ভাব্য তান্ডব নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এখনও দৈনিক অগনিত মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে করোনায়। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতও করোনা সংক্রমণের পাল্লায় পড়ে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির হিসাব গুনছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে মারা গেছেন ছয় হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি অন্য দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। সরকার অতি দ্রুত করোনা ইনজেকশন এনে এই মহামারি প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মহামারি করোনার এই আতংকের সাথে এবার যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনা ও ডেঙ্গু এই দুই মহামারিকে রুখতে হবে আমাদের।
বাংলাদেশে করোনার হানা ধরা পড়ে ২০২০ সালের মার্চে। এর পর থেকে টানা নয় মাস ধরে করোনা মোকাবেলা করছে মানুষ। করোনাকালে দেশের অভ্যন্তরীন ব্যবসা বানিজ্যে ধ্বস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বানিজ্য আমদানি রফতানি খাতও ভঙ্গুর অবস্থার মুখোমুখি। দেশের সব শিল্পখাতও এখন দারিদ্রক্লিষ্ট অবস্থার মধ্যে পড়েছে। দেশের কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনও ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমাদের রফতানি বানিজ্যের তিনটি প্রধান খাত চিংড়ি কাঁকড়া ও পোশাক সামগ্রী বিদেশে রফতানি না হওয়ায় অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সরকার ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের মানুষও পড়েছে বিপাকে। রেমিট্যান্সে দেখা দিয়েছে আশংকাজনক নিম্মগামিতা।
দেশের স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে থেমে গেছে শিক্ষার্থীদের সরব পদচারনা। সেখানে তাদের কলকাকলি আর কানে বাজে না। গৃহবন্দী হিসাবে তারা বাড়িতে লেখাপড়া করছেন বলা হলেও তা যথেষ্ট ফলদায়ক নয়। তারা লেখাপড়া ছেড়ে অন্যদিকে মনোনিবেশ করে দিন দিন শিক্ষা বহির্ভূত হয়ে জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অনিয়মে। অনলাইনে লেখাপড়া করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছে। উচ্চতর শ্রেণিতে উঠতে তারা পরিক্ষা দিতে প্রস্তুত থাকলেও বাস্তবতার কারণে তাদেরকে শিক্ষাঙ্গনে আসা এক রকম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে তারা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। একই সাথে অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে ভাবনার মধ্যে পড়েছেন।
করোনা ভাইরাসের কারণে সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিও হয়ে পড়েছে ম্লান। রাজনৈতিক দলগুলিও পারছে না কোনো জনসভা করতে। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি দিতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। সামজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে তারা এসব কর্মসূচি সংকুচিত করে এনেছেন। খেলার মাঠগুলিও হয়ে পড়ছে প্রাণহীন। যে মাঠে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে খেলোয়াড়রা দর্শকদের আনন্দ বেদনার খোরাক যোগাতেন তাও বন্ধ হয়ে গেছে। মাঠগুলি এখন প্রাণহীন এক উদোম মাঠে পরিনত হয়েছে। বিনোদন মঞ্চগুলিও এখন জনমানবশুন্য।
গণপরিবহনে মানুষের চলাচল কমে গেছে। ফলে পরিবহন খাতও হয়ে পড়েছে করোনাবন্দী। হোটেল রেস্তরাঁয়ও দেখা দিয়েছে কাস্টমার সংকট। এই খাতও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিবাহসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠান এখন আর আনন্দের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।
করোনা ভাইরাসের দাপটে দেশের স্বাস্থ্য সেবাও সংকটের মুখে। ডাক্তার ও রোগীদের করোনাভীতি এই সংকটের কারণ। বিশেষ করে যারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে চান তারাও রোগযন্ত্রণা নিয়ে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদেশ গমনও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দেশের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে ল্যান্ড বর্ডার যাতায়াতও বন্ধ রয়েছে।
করোনার কারণে স্বজনদের সাথে শারীরিক সাক্ষাত আত্মীয়তা ও লোক লৌকিকতায় ধ্বস নেমেছে। কেউ কারও বাড়িতে আসা যাওয়া করছেন না। এর ফলে তাদের মধ্যে ক্রমেই সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক দুরত্বের।
দেশের সব জেলা শহরে করোনা শনাক্তের ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক চিকিৎসকও করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন । দেশের জেলা শহরের হাসপাতালগুলিতে পিসিআর ল্যাব প্রতিষ্ঠার দাবিতে নানা কর্মসূচি চলছে। এদিকে করোনা শনাক্তের নামে প্রতারনার ফাঁদে ফেলে কিছু সংখ্যক অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। তারা নমুনা পরিক্ষা করে অথবা না করেই করোনা পজিটিভ অথবা নিগেটিভ লিখে জনগনের সাথে প্রতারণা করেছে। এমন কয়েকটি ঘটনা চিহ্ণিত করে সরকার বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার ও কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। এমনকি তাদের প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে সরকার।
আশার কথা সরকার করোনাকালিন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। এতে মানুষ সন্তুষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের শুকনো ও রান্না করা খাবারেরও ব্যবস্থা করেছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
করোনার কারণে শিক্ষায় সেশন জটের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি চাকুরি প্রত্যাশীদের বয়স ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতগুলিতে চাকুরির সুযোগও হ্রাস পেয়েছে। ফলে সদ্য লেখাপড়া শেষ করা ছাত্রছাত্রীরা বিপাকে পড়ে হতাশায় হাবুডুবু খাচ্ছে। তারা তাদের ভবিষ্যত কর্মজীবন নিয়ে শংকিত।
এদিকে করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মানুষের মুখে উঠেছে মাস্ক। তারা নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে করোনা মোকাবেলায় সচেষ্ট হয়েছেন। মানুষ বহুলাংশে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠেছে। তারা তাদের শিশুদেরও স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা দিচ্ছেন। সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি ও করোনা সতর্কতার প্রচার দিয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরায় যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না এবং জনসমক্ষে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার করছেন না তাদেরকে প্রায় দুই হাজার অভিযান চালিয়ে আটক করে ভ্রাম্যমান আদালত জেল জরিমানা করেছেন।
করোনায় ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের মিডিয়া জগত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলি করোনার ধাক্কা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় অনেকেই চাকুরি হারাচ্ছেন। করোনার ভয়াবহতায় দেশে গার্মেন্টস শিল্পগুলি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতিতে বিশ^াসী। এজন্য করোনা শনাক্তদের যথাযথ চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি এই ভয়ংকর মহামারি প্রতিরোধে টিকার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ । প্রতিষেধক টিকা হাতে পেলেই সরকার জরুরি ভিত্তিতে তা প্রয়োগের ব্যবস্থা নেবে বলে আগেই জানিয়েছে।
বাইশ লাখ জনগোষ্ঠীর সাতক্ষীরা জেলায় করোনা হানা দিয়েছে বেশ আগেই। করোনা শনাক্তকরণ এবং রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন ডাক্তাররা । তারা রাতদিন পরিশ্রম করেছেন। রোগীদের আইসোলেশন ব্যবস্থা, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা সবই করেছেন তারা। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তাররা তাদের খাওয়া ঘুম ছেড়ে দিয়ে রোগীদের সেবায় দিনরাত ব্যস্ত থেকেছেন।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে জানা গেছে সাতক্ষীরা জেলায় গত নয় মাসে করোনার নমুনা পরিক্ষা করা হয় ৬০০৯ জনের । তাদের মধ্যে পজিটিভ পাওয়া গেছে ১১৫৮ জনের। নিগেটিভ পাওয়া গেছে ৪৮৩৬ জনের। মারা গেছে ৩২ জন। অপরদিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৪০। জেলা ¯া^স্থ্য বিভাগের দেওয়া এই হিসাব ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত। একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ৫ লাখের মধ্যে মারা গেছে ৭৫৩১ জন।
বিশ^ব্যাপী করোনার এই ভয়াবহতার পরও জীবন থেমে থাকেনি। মানুষ এই অনুবীজ মহামারির বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ে মানুষ একদিন নিশ্চিত জয়লাভ করবে। যেমনটি আমরা পোলিও মুক্ত হয়েছি। কলেরা বসন্ত টাইফয়েড মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশে প্রায় শুন্যের কোঠায় মা ও শিশু মৃত্যুর হার । তাই করোনা মহামারিও একদিন পদদলিত হয়ে পড়বে একথা অবিশ^াস করার কোনো কারণ নেই। ততদিনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ । এর পরেই আমরা আবার হাসবো খেলবো, আবারও আমাদের মধ্যে ফিরে আসবে প্রাণস্পন্দন। ধ্বনিত হবে মুক্ত প্রাণের প্রতিধ্বনি।

লেখক : সুভাষ চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভির সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।