পাইকগাছার প্রকৃতি প্রেমী ইউএনও এর প্রাচীনতম মসজিদকুঁড় মসজিদ পরিদর্শন


722 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পাইকগাছার প্রকৃতি প্রেমী ইউএনও এর প্রাচীনতম মসজিদকুঁড় মসজিদ পরিদর্শন
নভেম্বর ২৭, ২০১৯ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

দক্ষিণাঞ্চলের দর্শনীয় স্থান হতে পারে মসজিদকুঁড় মসজিদ

এস এম আলাউদ্দীন সোহাগ ::

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু। কবি রবীন্দ্রনাথ কথাগুলো একে বারেই অমূলক কিছু বলে নাই। আমরা এমন অনেকেই আছি যারা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বহুদেশ ভ্রমন করি দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য। অথচ নিজের দেশের বাড়ীর পাশের অনেক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান থাকে যা অনেকেই খবর রাখেন না। অজানা আর না দেখার কারণে নিজের দেশের নিদর্শনগুলো হয়ে ওঠেনা দর্শনীয়। মসজিদকুঁড় মসজিদ এমনি একটি নিদর্শন যা হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মসজিদটি গতকাল পরিদর্শনকালে এমন মন্তব্য করেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুলিয়া সুকায়না ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ আরাফাতুল আলম।

উল্লেখ্য, খুলনা জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও নিদর্শনের মধ্যে মসজিদকুঁড় মসজিদ অন্যতম। বিভিন্ন তথ্য ও এলাকার জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি ৯শ’ বছরের পুরাতন নিদর্শন হিসাবে ধরা হয়। মসজিদটি প্রায় ৯শ’ বছর আগে হযরত খানজাহান (রঃ) এর সহচর বুড়াখাঁ জেলার পাইকগাছা উপজেলার সীমান্তবর্তী ও কয়রা উপজেলার শুরুতেই কপোতাক্ষ নদের তীরে নির্মাণ করেন। প্রাচীন এ নিদর্শন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। এক সময় সাধারণ মানুষ রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি ও মনোবাসনা পুরণের জন্য মসজিদকে কেন্দ্র করে মান্নত করতো। এটি কুসংস্কার ভেবে স্থানীয় লোকজন গত ১০ বছর যাবৎ মসজিদ এলাকায় মান্নত করা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানাযায়। তবে প্রতিদিন এলাকাবাসী মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও শুক্রবারে জুম্মার নামাজ আদায় করে থাকেন।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী হযরত খানজাহান (রঃ) এর সহচর বুড়াখাঁ ও তার পুত্র ফতেখাঁ’কে কয়রা উপজেলার মসজিদকুঁড় গ্রামে অবস্থিত মসজিদকুঁড় মসজিদের নির্মাতা বলে ধরা হয়। খানজাহান (রঃ) ঝিনাইদহের বারবাজার থেকে স্ব-দলবলে যশোরের মুড়লী পর্যন্ত পৌঁছে একদল সঙ্গী নিয়ে বাগেরহাটের দিকে যান এবং তার বিশ্বস্ত সহচর বুড়াখাঁ’র নেতৃত্বে আরেকটি দলকে মসজিদকুঁড় বেদকাশী অঞ্চলের দিকে প্রেরণ করেন। খানজাহান (রঃ) এর নির্দেশ ও দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে পথের স্থানে স্থানে জলাশয় খনন, রাস্তা ও মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমান পাইকগাছা উপজেলায় বুড়াখাঁ’র সঙ্গী সরল খাঁ দীঘি, লস্কর দীঘি, চালধোয়া পুকুরসহ কয়েকটি জলাশয় এখনো স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছে।
স্থানীয় অনেকেই জানান, পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পাইকগাছার সীমান্তবর্তী কয়রা উপজেলার শুরুতেই কপোতাক্ষ নদীর তীরে নির্মাণ করা হয় মসজিদকুঁড় মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণে কপোতাক্ষ নদ আর পশ্চিম দিকে রয়েছে খাল। এটি পরিখাঁ ছিল বলে অনেকেই বলে থাকেন। মসজিদের কোন শিলালীপি পাওয়া যায়নি তবে, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ ও মসজিদকুঁড়ের নয়গম্বুজ মসজিদের গঠন প্রণালি ও স্থাপত্য কৌশলেব সাদৃশ্য থাকার কারণে এটি খানজাহান (রঃ) এর নির্মিত বা সমসাময়িক বলে ধারণা করা হয়। এলাকার প্রবীনদের ধারণা তৎকালীন এলাকার জঙ্গলের কাঠ কেটে কলিকাতায় বিক্রি করা হতো। এ সময় মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়। ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদটি ব্যবহার হয়ে আসছে। মসজিদের চারকোণে চারটি গোলাকার ট্যারেট আছে। বিরাট আকারের মিনারগুলি ছাদের কার্ণিশের উপরে ওঠেনি। এগুলিকে চারটি গোলাকার ও স্ফীত রেখা দ্বারা অলংঙ্কৃত করা রয়েছে। মসজিদের বাইরের দেয়াল দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিকে পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা অলংঙ্কৃত ছিল। খিলান ও কার্ণিসের উপরেও অনুরূপ অলংঙ্করের কাজ ছিল। অলংঙ্কৃতের মধ্যে রয়েছে পদ্মফুল, মালা, বিলম্বিত রজ্জু ও ঘন্টাসহ বিভিন্ন প্রতিকৃতি। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে ৪টি প্রস্তর স্তম্ভ, ইটের তৈরি ভিত্তিবেদীর উপরে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেক স্তম্ভ ২টি করে পাথরের সাহায্যে নির্মিত। উচ্চতার সমতা রক্ষার জন্য নিটে ইটের তৈরি ভিত্তিবেদী কমবেশী উঁচু করে নির্মিত। ৪টি প্রস্তর স্তম্ভ ও চারিদিকের দেয়ালের উপর খিলানের সাহায্যে নির্মিত হয়েছে মসজিদের ৯টি গম্বুজ। ভিতরের খিলান ও গম্বুজ গুলির নির্মাণ কৌশল খুবই উঁচু মানের। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি অন্যগুলির চেয়ে আকারে কিছুটা বড়। মসজিদ সংলগ্ন প্রতিবেশীরা জানান, বর্তমানে ৪৫ শতক মতো জায়গার উপর মসজিদের অবস্থান রয়েছে। এক সময় এখানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত মানুষ বিভিন্ন স্থান থেকে মানত করতে আসতো। অনেকেই রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভের জন্য, আবার অনেকেই মনোবাসনা পূরণের জন্য মানত করতে আসতো। তবে এটি কুসংস্কার ভেবে গত ১০ বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের থাকার সু-ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ সহ সরকারিভাবে মসজিদকুঁড় মসজিদটির উন্নয়নের উদ্যোগ নিলে ৯শ বছরের পুরাতন কীর্তি হিসেবে মসজিদকুঁড় মসজিদটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
এ ব্যাপারে ইউএনও জুলিয়া সুকায়না বলেন, জেলার পাইকগাছা এবং কয়রা ঐতিহ্যের দিক দিয়ে অনেক সমৃদ্ধ। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচায্য প্রফুল্লচন্দ্র পি.সি রায়, সু-সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক, মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত, আলম শাহ ফকির, পীর জাফর আউলিয়া, রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু, দানবীর মেহের মুছুল্লী সহ অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তির জন্য অত্র এলাকা সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়ে থাকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অত্র এলাকা থেকে সুখী সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা গড়ার শুভ সূচনা করেছিলেন। দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়টিও অত্র এলাকায় রয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ইতোমধ্যে প্রায় এ সকল দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেছি। মসজিদকুঁড় মসজিদের কথা বিভিন্ন স্মরণিকার মাধ্যমে জানতে পারি। ইচ্ছে ছিল সুযোগ হলে দর্শনীয় মসজিদটি একবার ঘুরে আসবো। মসজিদটি দেখতে পেরে নিজের কাছে খুব ভালো লেগেছে। প্রাচীনতম এ মসজিদটি দক্ষিণাঞ্চলের দর্শনীয় স্থান হতে পারে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। তবে এটি দর্শনীয় পর্যায়ে নেওয়ার জন্য এলাকার সাংবাদিক, সুধী, জনপ্রতিনিধি সহ সবাইকে কাজ করতে হবে।

#