পাঠকের চোখে কাব্যগ্রন্থ : নিরন্তর প্রতীক্ষা


234 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পাঠকের চোখে কাব্যগ্রন্থ : নিরন্তর প্রতীক্ষা
অক্টোবর ২২, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ ইয়াসমিন নাহার ॥

নীল মোড়কের ঝকঝকে ছবির কবিতার বইটার কিছু কবিতার জন্ম আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি আর অনেকগুলো কবিতা পাঠ করেছি আমি। তবু একজন পাঠকের দৃষ্টিতে সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জনাব ‘শেখ মফিজুর রহমান’ মহোদয়ের কবিতার বই ‘নিরন্তর প্রতীক্ষা’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো। বুক রিভিউ বলতে যা বোঝায় তা করার জ্ঞান বা সামর্থ্য কোনটাই আমার নেই, আমি শুধু বলতে পারি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, হৃদয় ছোঁয়া অনুভূতিগুলো।
এই কাব্যগ্রন্থের কবিতা গুলোর বিষয়বস্তু হলো মানুষ, মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা, মানবিকতা এবং তার অবক্ষয়, আধুনিকতার নামে অসামাজিকতা, নিষ্ঠুর নগরায়ন, করোনায় মানুষের জীবন, দেশপ্রেম এবং চিরন্তন ভালোবাসার বহি:প্রকাশ।
বিষয়বস্তু হিসেবে ‘মানুষ’ সরাসরি এসেছে ‘আমি মানুষ বলছি’, ‘মন থেকে মানুষ’, ‘শুদ্ধ মানুষের জন্য যুদ্ধ’ এবং ‘বৈষম্য’ কবিতায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস-২০২০ স্মরণে রচিত কবিতা ‘আমি মানুষ বলছি’। এখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অবহেলিত, নির্যাতিত আর নিপীড়িত মানুষের বর্ণনা দিয়ে কবিতার শেষ অংশে কবি সবার কাছে এই মানুষদের জন্য ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু যারা এগুলো দিতে অক্ষম তাদের সম্পর্কে একটি শ্লেষোক্তি করেছেন-
‘এটা যদি না পাই, আমার অবস্থার
কোনই পরিবর্তন হবে না জানি
কিন্তু তুমি?
তুমি মানুষ থাকবে তো?’
পাঠক হিসেবে এই লাইনগুলো পড়লে শিউরে উঠি- আসলেই তো, মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষকে সাহায্য করতে না পারলে আমি কিভাবে মানুষ থাকবো? এই কথার আরেকটা উত্তর পাওয়া যায় অপর একটি কবিতা ‘মন থেকে মানুষ’-এই কবিতার একটি চরণে। এখানে কবি বলেছেন-
‘মন থেকেই জন্ম মানুষের
শরীরে তার প্রকাশ মাত্র’
এই লাইন দু’টো পড়লেই পাঠকের বোধদয় হবে-তাই তো, মন না থাকলে মানুষ কিসের? সেই আগের প্রশ্নই আবার সামনে এসে দাঁড়াবে-আমি মানুষ তো?
মানুষ আমরা সবাই এটা যেমন সত্য তেমনি আমাদের আচার আচরণে মানুষের প্রতি বৈষম্য ফুটে উঠে অর্থ, সামাজিক মর্যাদার প্রকারভেদে। যেমনটি দেখা যায় ‘বৈষম্য’ কবিতার শেষ চার লাইনে-
‘অর্থের জন্য বৈষম্য, বর্ণের জন্য বৈষম্য
আকার ও প্রকারের জন্য বৈষম্য
মানুষে মানুষে বৈষম্য
ভালোবাসাতেও বৈষম্য’
এতো কিছুর পরে কবি যেন অভিযানে নেমেছেন প্রকৃত মানুষ খোঁজার জন্য, শুদ্ধ মানুষের জন্য।
‘শুদ্ধ মানুষের জন্য যুদ্ধ’ কবিতায় লিখেছেন –
‘শুদ্ধ মানুষের জন্য যুদ্ধ করতে চাই
বন্দুক, বুলেট বা বোমা দিয়ে নয়
প্রেম, ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে’

মানুষের পরে কবি চিত্রিত করেছেন মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে। এই ধারা শুরু হয়েছে প্রথম কবিতা ‘মুখোশ’ থেকে যেখানে কবি বড় আক্ষেপ করে বলেছেন, পিতার বাড়ি ত্যাগ করলেও মেকাপ নষ্ট হওয়ার চিন্তায় বিয়ের কনেরা এখন কাঁদে না। আরো বাস্তবতা হলো সামাজিক জীবনে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা মেকি সুখি জীবনের মুখোশ পরে থাকি। আলোড়িত করার মতো কবিতার লাইনগুলো হলো –
‘মুখোশ পরেছি সবাই
ভালো থাকার মুখোশ
মুখোশ পরেছি সবার
ভালো রাখার মুখোশ।’
এই মুখোশের বাইরে কঠিন বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠে ‘আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত’ কবিতার শহর আলীর জীবনে ‘জীবনের গল্প’ কবিতায় নাম না জানা আরেক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার প্রধানের আত্মকথনে, যারা হতাশায় নিমজ্জিত নিজের জীবনের টানাপোড়নে।
একইভাবে কষ্টের জীবনের গল্পের বর্ণনা এসেছে ‘যত দূরে যাই’ কবিতায় এক প্রবাসীর আত্মকথনে। এসব নাম জানা বা না জানা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বল্প বেতনের চাকুরীজীবী কিংবা প্রবাসীর জীবনের টানাপোড়ন নিয়ে লেখা কবিতার লাইনগুলো পড়লে তাঁদের মা, স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে নিত্য জীবনের বহমান সুখ দুঃখের স্মৃতিচারণ চোখের সামনে ভেসে উঠে, সংবেদনাশীল পাঠক হিসেবে কখন চোখের পাতা ভিজে যায়, বোঝাই যায় না। কিন্তু কবি মোটেও হতাশ নন বরং সর্বাবস্থায় আশাবাদী। এজন্য ‘নদী ও জীবন’ কবিতায় দ্বার্থ্যহীনভাবে লিখেছেন-
‘আর জীবন মানেই বর্ণিলতা
উচ্ছ্বলতা এবং প্রতি মুহূর্তেই
বেঁচে থাকার উৎসব।’
কবি জীবন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে যেয়ে নিম্ন মধ্যবিত্তের একটা সজ্ঞা দিয়ে ফেলেছেন নিজেরই অজান্তে ‘আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত’ কবিতায়-
‘আমি যে বড় চিত্তের কম বিত্তের নিম্ন মধ্যবিত্ত!
বিত্তের থলি শূন্য হলেও চিত্তের থলিতে লজ্জা
ভয় আর সংকোচের ছড়াছড়ি।’

কবির প্রতিটি কবিতায় মানবিকতার জয়গান গেয়েছেন, মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো কবি নিজে পুরুষ হলেও নারীদের নিয়ে লিখেছেন বারংবার আর এক্ষেত্রে আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে একজন ধর্ষিতা নারীর আত্মকথনমূলক কবিতা ‘ভালোবাসার দাবী’।
একজন ধর্ষিতা নারীর মানসিক অবস্থা বোঝা, তাঁর হৃদয়ের ব্যথা অনুধাবন করা এবং সে আসলে কী চায় তা প্রকাশ করা আসলেই এতোটা সহজ নয় যা কবি প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন। একইভাবে ধর্ষিতার আত্মোপলব্ধি উঠে এসেছে ‘আমি মানুষ বলছি’ কবিতায় এবং কবি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন ‘মন থেকে মানুষ’ কবিতায়।
পরিবার প্রধান পুরুষের জীবনের টানাপোড়ন নিয়ে লেখার পাশাপাশি কবি নারী জীবনে দু:খ, কষ্ট, বেদনা নিয়ে লিখেছেন ‘অপরাজিতা নারী’ কবিতায় একইসাথে এই কবিতায় তিনি নারী ও নারীত্বের জয়গান গেয়েছেন- সমরে, সংসারে সর্বত্র নারীকে দেখতে চেয়েছেন যা আমার কাছে গতানুগতিক কবিদের কবিতার চেয়ে ভিন্ন। কারণ কবিদের কবিতায় নারী ফুটে উঠে প্রেমিকা বা প্রিয়সী হিসেবে কিন্তু এই কবিতায় নারী এসেছে যোদ্ধা হিসেবে যা অবশ্যই নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহি:প্রকাশ। নারীদের নিয়ে লিখতে যেয়ে নারীর আরেক রূপ পতœীরূপ ফুটে উঠেছে ‘সহধর্মিণী’ কবিতায় যেখানে কবি জগতের সকল সহধর্মিণীকে ‘হৃদয় নন্দিনী’ রূপে দেখতে চেয়েছেন, অন্দর মহলের বন্দিনী রূপে নয়। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে এখানে কবি স্ত্রী বা সহধর্মিণী হওয়ার একটা যোগ্যতার বর্ণনা দিয়েছেন-
‘সমান ধর্ম ধারণ করলেই কিন্তু
সহধর্মিণী হওয়া যায়, কবুল উচ্চারণে নয়।’

‘নিরন্তর প্রতীক্ষা’ কাব্যগ্রন্থে আছে মহামারী করোনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব নিয়ে কয়েকটি কবিতা- ‘আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত’, ‘কালো রাত্রির শেষে’ এবং ‘মহামারী’। এর মধ্যে এই কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা ‘মহামারী’ এর মধ্যে কবি বিদ্রোহাত্মক ভাষায় উচ্চারণ করেছেন যে শুধু করোনা মহামারী নয় বরং সুবিধাভোগী স্বার্থান্বেষী প্রতিটি মানুষ মহামারী।
আধুনিক জীবনের অসারতা নিয়ে কবিতা ‘আধুনিকতা মানবিকতা’ ও এই কাব্যগ্রন্থের নাম যে কবিতা নিয়ে- ‘নিরন্তর প্রতীক্ষা’। আধুনিকতা মানবিকতা অনেকটা রূপক শ্লেষাত্মক কবিতা যেখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন আধুনিকতার নামে আমরা শুধু নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, অন্যের জীবন, দু:খ-কষ্ট নিয়ে আমাদের কোনই চিন্তা নেই আর এই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাকেই আমরা তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ মনে করি।
‘নিরন্তর প্রতীক্ষা’ কবিতায় কবি আধুনিক নাগরিক জীবনে মগ্ন আমাদের দৃষ্টি প্রকৃতির দিকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আশাবাদী হয়েছেন ইট পাথরের ফাঁকে বেড়ে উঠা গাছের চারা দেখে।
কবির দেশপ্রেম, দেশ নিয়ে কবির প্রত্যাশা দেখা যায় ‘লাল সবুজের গল্প’ কবিতায় যেখানে তিনি বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের আহবান করে বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে নিয়ে আবেগঘন কবিতা ‘সময় এখন দেশ গড়ার’, যে কবিতায় কবি বঙ্গবন্ধুর মতো জীবন গড়তে চান আর যারা জাতির পিতাকে ভালোবাসার অভিনয় করে স্বার্থ সিদ্ধির জন্য, তাদের ধিক্কার দিয়েছেন, সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।
শেষ করবো চারটি ভিন্নধর্মী কবিতায় বিষয়ে বলার মধ্য দিয়ে। কবি শুধু দেশ ও মানুষ নিয়ে ভাবেন না, ভাবেন কবিতা, কবি আর সাহিত্য নিয়ে। তারই বহি:প্রকাশ ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’, ‘শোকেসে সাহিত্য’ এই কবিতা দুইটি। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ কবিতা যেন গুরুর প্রতি গুরু দক্ষিণা। কবিগুরু রচনা দিয়েই কবি বুঝাতে চেয়েছে কায়াহীন রবীন্দ্রনাথ ছায়া হয়ে, মায়া হয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে মিশে আছে। আর ‘শো-কেসে সাহিত্য’ কবিতায় আমাদের বই এর প্রতি, সাহিত্যের প্রতি অনিহার বিষয় ক্ষোভের ভাষায় তুলে ধরেছেন।
‘বৃষ্টির গল্প’ কবিতায় কবি বর্ষাকালে খাবারের আয়োজন আর বৃষ্টি নিয়ে লেখা কবিতায় প্রেয়সীর প্রেমের বর্ণনার পাশাপাশি বর্ষাকালে খেটেখাওয়া মানুষের কষ্ট চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। আর এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী কবিতা ‘ভালোবাসার অনুকাব্য’, এককথায় বাঁধভাঙা প্রেমের কবিতা, নিজেকে সমর্পণের অদম্য ইচ্ছা, কবির অন্যসব কবিতা থেকে একদম ভিন্ন। কিন্তু যারা কবিতা মানেই প্রেমের কবিতা ভাবেন, তাদের জন্য সুখপাঠ্য সন্দেহ নেই।

কবি কবিতায় মানুষ নিয়ে বলেছেন, মানবিকতা নিয়ে বলেছেন, দেশপ্রেম এমনকি প্রেম নিয়েও বলেছেন কিন্তু নিজেকে নিয়ে, নিজের ইচ্ছা নিয়ে বলেছেন কি? বলেছেন। আর সেটা ‘সূর্য এবং আমি’ কবিতায়। এই কবিতায় কবি সূর্যের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করে মানব জীবনের স্বল্পকাল নিয়ে আক্ষেপ করেছেন এবং তিনি কবিতার শেষে একান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এইভাবে-
‘কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে চাই-
কিছু ভালো কাজের মাঝে
মানুষের মনের ভালোবাসায়
প্রকৃতির বিশুদ্ধতায়
ফিরে আসতে না পারি সূর্যের মতো স্বশরীরে
কিন্তু মানুষের মনের কোণে
আমার জন্য জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ভালোবাসায়
আমার কিছুটা অস্তিত্ব অবগাহন করে
জীবিত থাকুক পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।’

কবি একজন সংসারী এবং সর্বোচ্চ সম্মানের পেশায় নিয়োজিত সুতরাং তাঁকে জীবিত রাখার, স্মরণীয় রাখার অনেক কাজই তিনি করেছেন কিন্তু প্রাঞ্জল ভাষায় মানুষের জীবন নিয়ে লেখা কবিতাগুলো তাঁকে মানুষের মনে নি:সন্দেহে চির জাগরুক করে রাখবে।
শেষ হলো আমার ‘নিরন্তর প্রতীক্ষা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা পড়া। কবিতাগুলো এতো প্রাঞ্জল, বর্ণনাগুলো এতো জীবন্ত যে মনেই হয় না এটা কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ বরং মানুষের বহমান জীবনের এক পরিশীলিত রূপ প্রতিটি কবিতা। এই কবিতাগুলো পড়তে যেয়ে কখনো মনে হবে এ তো আমারই কথা, আমারই জীবন কাহিনী আবার কখনো নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যাবে। ২২টি কবিতা শেষ করে আরো কবিতা পড়ার ইচ্ছা জাগে, এ যেন শেষ হয়েও হইলো না শেষ।

লেখক: সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সাতক্ষীরা