পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরার নিম্মাঞ্চল, পানিবন্দি হাজারো পরিবার


183 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরার নিম্মাঞ্চল, পানিবন্দি হাজারো পরিবার
জুলাই ৩০, ২০২১ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ভেসে গেছে শতশত মাছের ঘের, পুকুর ও ফসলি জমি

ডেস্ক রিপোর্ট ::

বৃষ্টির পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরার নিম্মাঞ্চল। জেলার সাত উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়ন আর দুটি পৌরসভার নিম্মাঞ্চল পানিতে থৈ থৈ করছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের। তলিয়ে গেছে রোপা আমন ও বীজতলা। বেগুন, কাচা মরিচ, ঢেড়শ, উচ্ছে, করলাসহ বিভিন্ন সবজি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের প্রায় অর্ধেক এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, মসজিদ-মন্দির, কবরস্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে গেছে। নিচু এলাকার ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকেই উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

সাতক্ষীরা পৌরসভার সমস্ত নিচু এলাকাও এখন পানির নিচে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছেন সাতক্ষীরাবাসি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। ভেসে গেছে হাজার হাজার বিঘা মাছের ঘের, ফসলি জমি ও পুকুর।
সাতক্ষীরা পৌরসভার ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম-সদস্য সচিব আলীনুর খান বাবুল জানান, পৌরসভায় পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে মানুষ বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে। গত দুই দিনের টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে পৌরসভার ইটাগাছা, কামাননগর, রসুলপুর, মেহেদিবাগ, মধুমোল্লারডাঙ্গী, বকচরা, সরদারপাড়া, পলাশপোল, পুরাতন সাতক্ষীরা, রাজারবাগান, বদ্দিপুর কলোনি, ঘুড্ডিরডাঙি ও কাটিয়া মাঠপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। তিনি আরও জানান, গুটি কয়েক লোক পৌরসভার মধ্যে অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের করার কারণে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের চত্তরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জেলা শহরে অধিকাংশ এলাকার রাস্তাঘাট পানির নিচে।
এদিকে, সদর উপজেলার ধুলিহর, ফিংড়ি, ব্রহ্মরাজপুর, লাবসা, বল্লী, ঝাউডাঙা ইউনিয়নের বিলগুলোতে সদ্য রোপা আমন ও বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পানি অপসারনের কোন পথ না থাকায় বৃষ্টির পানি বাড়িঘরে উঠতে শুরু করেছে। সাতক্ষীরা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাণসায়ের খালও পানি টানতে পারছে না। প্লাবিত এলাকার কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে।
এদিকে অতিবৃষ্টির ফলে গদাইবিল, ছাগলার বিল, শ্যাল্যের বিল, বিনেরপোতার বিল, রাজনগরের বিল, কচুয়ার বিল, চেলারবিল, পালিচাঁদ বিল, বুড়ামারা বিল, হাজিখালি বিল, আমোদখালি বিল, বল্লীর বিল, মাছখোলার বিলসহ কমপক্ষে ২০টি বিল ডুবে গেছে। এসব বিলের মাছের ঘের ভেসে পানিতে একার হয়ে গেছে। বেতনা নদী তীরবর্তী এই বিলগুলির পানি নদীতে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। এই পানি পৌরসভার ভিতরে ঢুকছে। অতিবৃষ্টিতে গ্রামাঞ্চলের সব পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে শত কোটি টাকার মাছ। সবজি ক্ষেতগুলি ভাসছে পানিতে। মানুষের যাতায়াতও ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে উপকুলীয় উপজেলা শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনিসহ জেলার সাতটি উপজেলা। সেখানে প্রধান রাস্তার ওপর দিয়েও পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকার মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর কমবেশি বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টির কারণে সাতক্ষীরার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেশকিছু এলাকায় মানুষের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে।
এদিকে উপজেলার প্রতাপনগর, আনুলিয়া, খাজরা, বড়দল, শ্রীউলা, আশাশুনি সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে থৈ থৈ করছে।
এদিকে বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে দক্ষিণ উপক‚লের শ্যামনগর উপজেলার গ্রামের পর গ্রাম। সেখানে প্রধান রাস্তার ওপর দিয়েও পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বেশকিছু এলাকায় মানুষের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। এ উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ি, কৈখালী, রমজাননগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে ভেসে একাকার হয়ে গেছে। বসতবাড়িতে উঠেছে পানি। পানি নিষ্কাশনের খালগুলো দখল করার কারণে এ দুর্দশার কবলে পড়েছেন এলাকাবাসি। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্লাবিত এলাকার মানুষ।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি, মাগুরা, কুমিরা, খেশরা, তেঁতুলিয়া, ধানদিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের।
কালীগঞ্জের রতনপুর, কালিকাপুর, বিষ্ণুপুর, মথুরেশপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মাছের ঘের, পুকুর ও সবজি ক্ষেত ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেবহাটার কোমরপুর, পারুলিয়া, সখীপুর ও নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে পুকুর ও ঘের। অনেক ঘরের মধ্যে পানি ঢুকেছে।
কলারোয়ার জয়নগর, ধানদিয়া, যুগিখালি, সোনাবাড়িয়া, শ্রীপতিপুর, ব্রজবকসসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। হাঁস মুরগি ও গবাদি পশু নিয়ে মানুষ চরম বিপদে পড়েছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে টিকা নিতে আসা মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। কঠোর লকডাউনের সময়ে বৃষ্টি চলাকালিন অধিকাংশ রাস্তা ছিল ফাঁকা। পুলিশের দেখা মেলেনি। নিতান্ত জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারেননি।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬ থেকে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত সাতক্ষীরায় সর্বমোট ২১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিন নিম্মচাপের প্রভাব থাকবে বলে তিনি জানান। তবে আজ শুক্রবার থেকে বৃষ্টিপাত কমতে পারে বলে তিনি জানান।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরেরর তথ্য কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, ভারি বর্ষণে জেলার নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে বুধবার পর্যন্ত ১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আউশ বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। ৫০০ হেক্টর জমির সদ্য রোপা আমন ও ৩৫০ হেক্টর সবজির ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।
এদিকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবু জর গিফারী বলেন, আমার উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ২০ টন চাল দেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এখন সম্ভব হয়নি।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির এক গণবিজ্ঞতিতে জানান, চলমান অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে/জনদুর্ভোগ লাঘবে সাতক্ষীরা জেলায় সকল অবৈধ নেট-পাটা স্থাপনকারীদেরকে স্ব-উদ্যোগে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে নেট-পাটা অপসারণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় নেট-পাটা স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

#