পানির নিচে চট্টগ্রাম


370 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পানির নিচে চট্টগ্রাম
জুন ১, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
সম্প্রতি ৩০৪ কোটি টাকা খরচে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হয়। তার পরও শেষ রক্ষা হয়নি নগরবাসীর। গত মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ চট্টগ্রামে বড় ধরনের ক্ষতি না করলেও ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে জনদুর্ভোগ। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানি একাকার হয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল। হালিশহর, বাকলিয়া, সিডিএ, ষোলশহরসহ নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গতকাল বুধবারও ছিল বুকসমান পানি। এসব এলাকার অন্তত ১০ লক্ষাধিক মানুষ মঙ্গলবার সকাল থেকে একরকম গৃহবন্দি হয়ে আছেন। এদিকে ‘ডুবন্ত’ চট্টগ্রামকে উদ্ধারে আজ বৃহস্পতিবার সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছে।

৩০৪ কোটি টাকা খরচের পরও জলাবদ্ধতা নিরসন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম। পূর্বাপর সব মেয়রই রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছিরের দুই বছর পার হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনিও নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেননি। জলাবদ্ধতার জন্য তিনটি মজা খালকে দায়ী করা হলেও এখনও এসব খাল খননের উদ্যোগ নেননি তিনি।

গতকাল দুপুর ১২টায় সিডিএ আবাসিক এলাকায় নৌকা চলতে দেখা গেছে। বেপারীপাড়া থেকে নয়াবাজার বিশ্বরোড পর্যন্ত পুরো সড়কে ছিল বুক সমান পানি। এখানকার কয়েকটি নামি-দামি ব্র্যান্ডের ফার্নিচারের দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সামগ্রী। হালিশহর, আই-ব্লক, কে-ব্লক, এইচ-ব্লক, জি-ব্লক, এ-ব্লক, জে-ব্লক, শান্তিবাগ, শ্যামলী, বসুন্ধরা, সোনালী আবাসিক এলাকাসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় গৃহবন্দি ছিল লক্ষাধিক মানুষ।

হালিশহর বি-ব্লকের বাসিন্দা এমবি গ্রামার স্কুলের শিক্ষক মাহমুদা বেগম কাকলী বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই কোমরসমান পানি জমে যায়। বেসরকারি চাকরিজীবী গাজী মাহবুব হাসান বলেন, ‘অফিসে জরুরি কাজ থাকার পরও যেতে পারিনি। রাস্তায় বুক সমান পানি।’

বাকলিয়া ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন নিম্ন এলাকায় পাঁচ শতাধিক বিদ্যুতের মিটার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পতেঙ্গার বন্দরটিলা মাতৃসদনের কর্মচারী মোকাররম হোসেন বলেন, ‘মিটার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার থেকে অন্ধকারে আছি।’ বিদ্যুৎ অফিসের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পতেঙ্গা, হালিশহর ও বাকলিয়া এলাকার অনেক মিটার পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পানিতে পড়েছে। এ জন্য নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।’

চাকতাইয়ের মেসার্স ইসফার হাবিব প্রতিষ্ঠানের চালের দোকানে পানি ঢুকে গেছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. হাবিব উল্লাহ। পাশের সোবহান রোডের গাজী ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দাউদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি ঢুকে গুদামে থাকা চালের বস্তা ভিজে গেছে। এসব চাল এখন চোখের সামনে নষ্ট হবে।’ রাজাখালী এলাকার বেঙ্গল সোপ ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক সুজিত দাশ বলেন, ‘গুদামে পানি ঢুকে নষ্ট করে দিয়েছে লাখ টাকার কাঁচামাল।’

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের একাংশের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চাক্তাই খাল। এ খালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নয়টি খাল। এগুলো হচ্ছে_ ডোম খাল, চশমা খাল, হিজড়া খাল, চট্টেশ্বরী খাল, মির্জা খাল, সাব এরিয়া খাল, দেব পাহাড় খাল, আয়েশা খাতুন লেন খাল ও মনু মিয়া খাল। প্রবল বর্ষণে এসব খাল থেকে আসা পানি চাক্তাই খাল পুরোপুরি নিষ্কাশন করতে না পারায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৩১ ডিসেম্বর থেকে খাল ও নালার মাটি অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমাদের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।’

মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সমকালকে বলেন, ‘একসঙ্গে তিনটি সংস্থার উন্নয়নযজ্ঞ চলছে নগরে। বৃষ্টি হলেই নির্মাণ সামগ্রীসহ খুঁড়ে রাখা মাটি নালা ও খালে পড়ে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে কোথাও কোথাও একত্রিত হয়ে যাচ্ছে জোয়ারের পানি। জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এ দুর্ভোগ অনেকটা কমে যাবে।’ তিনি নতুন খাল খনন প্রকল্পের টাকা দ্রুত ছাড় করাতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

আবহাওয়া অফিস জানায়, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২২৫ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ অবস্থা আরও দু’দিন থাকতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস জানায়।

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান টানা বৃষ্টিতে ঝুঁকি বেড়েছে পাহাড়েও। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা ও বসবাসকারীদের উচ্ছেদে অভিযান চালাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে লালখান বাজার এলাকার মতিঝর্ণা পাহাড়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আছিয়া খাতুন এবং বায়েজিদ এলাকার পাহাড়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ জোবায়ের আহমেদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেল সেতুতে ধস

গতকাল ভোররাতে ভারি বর্ষণে বেঙ্গুরা স্টেশনের কাছাকাছি বোয়ালখালী-পটিয়া সীমান্তবর্তী বোয়ালখালী খালের ওপর ২৪ নম্বর সেতুটি ধসে পড়ে। এ কারণে সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে দোহাজারী থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী ট্রেনটি পটিয়ার ধলঘাট স্টেশনে আটকা পড়ে। গোমদণ্ডী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. জাফর জানান, সেতু মেরামতের কাজ চলছে। তবে কাজ কখন শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না।