পাহাড় আর সাগরের দেশে সাতক্ষীরার সাংবাদিকদের পাঁচদিন


1681 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পাহাড় আর সাগরের দেশে সাতক্ষীরার সাংবাদিকদের পাঁচদিন
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৬ ফটো গ্যালারি বিনোদন
Print Friendly, PDF & Email

আবুল কাসেম :
মফস্বল শহরে সাংবাদিকদের কাজের অভাব নেই। ঢাকায় নির্দিষ্ট বিটে আলাদা আলাদা সাংবাদিক থাকলেও জেলা শহরের একজনকে ’জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ’-সব কাজ করতে হয়। এছাড়া অনেকে একই সাথে প্রিন্ট ,ইলেকট্রনিক্স ও অনলাইন মিডিয়ায় কাজ করতে করতে হাপিয়ে উঠেন প্রায়ই। তাই আনন্দ ভ্রমনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও নিজেদের সতেজ করে নেয়ার প্রচেষ্টা থেকে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা এবার গিয়েছিলেন চট্রগ্রাম,রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারে।
৪ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার। ১৬৬ জনের বিশাল বহর নিয়ে পাঁচদিনের আনন্দ ভ্রমন শুরু। এক একটি পরিবহনে চল্লিশ জনের যাত্রা। সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস,একে ট্রাভেলস,এসপি গোল্ডেন লাইন ও সংগ্রাম পরিবহনের মালিকদের ধন্যবাদ দিতেই হয়। শুধুমাত্র জ্বালানী ও স্টাফ খরচেই সাংবাদিকদের দেশের বৃহত্তম সৌন্দর্যময় স্থানগুলি দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।  ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি,পাহাড় মানুষের মনকে উচু করে,আর সাগর মনকে করে উদার। যাচ্ছি রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজার। পাহাড় আর সাগরের দেশে।

DSC04918
বিকেল চারটায় শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক থেকে যাত্রা শুরু। বাস হুহু করে ছুটছে। পুলিশের সুপারিশের বদৌলতে দৌলতদিয়া ফেরীঘাট একটু আগে ভাগেই পার হওয়া গেল। গুরু আর আমি একই সিটে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। রাতের পুরো যাত্রায় আমাদের সঙ্গী ছিল একফালি চাঁদ। চাঁদের আলোতে খুব মোহনীয় লাগছিল সবকিছু। কুমিল্লার রাইফেল স্কয়ারে কিছুক্ষনের জন্য যাত্রা বিরতি। বৈশাখী টিভির শামীম ভাই সবাইকে খুব আনন্দ দিয়েছেন পুরো ভ্রমনে। রাইফেল স্কয়ারের ক্যান্টিনে তিনি কফির অর্ডার দিলেন। মেজাজটা বিগড়ে গেল,যখন বিল গুনতে হলো কাপ প্রতি পঞ্চাশ টাকা। এটা সারা দেশেই সমস্যা। রাত্রিকালীন হাইওয়ের পাশে কোন রেস্তোরা বা চা-কফির দোকানে গলাকাটা পড়বে সবার। তবুও প্রয়োজন কোন আইন মানেনা। প্রয়োজনেই আপনাকে চড়াদাম দিয়ে কিনতে হবে টুকিটাকি িিজনিস অথবা খেতে হবে ডিনার। কফি পান করে বাইরে আসতেই দেখা বাবু ভাইয়ের সাথে। কফির চড়াদামের কথা শুনেই তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন,ভাই,সৌদি আরব এসেছি না! দামতো নেবেই। তার গল্পের সারবত্তা হলো এই, ডুমুরিয়া উপজেলার এক অধিবাসী সৌদিতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে দু’জন গ্রামবাসীকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে যশোর এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দেয়। যশোর এয়ারপোর্টের আশেপাশের সবকিছুকে তারা সৌদি আরবের বলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে থাকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাস আবারো ছেড়ে দেয়। উদ্দেশ্য বীর চট্রলার চট্রগ্রাম। সকালেই চট্রগ্রাম পৌছে হোটেলে অবস্থান করে যার যার মত বিশ্রাম। নির্দেশনা ছিল, ওই দিনটিই অর্থ্যাৎ শুক্রবার প্রত্যেকে প্রত্যেকের মত চট্রগ্রামে ঘুরবেন। ওই দিন রাত্রিযাপন শেষে পরের দিন আমরা রাঙ্গামাটি যাব।
চট্রগ্রামের বিখ্যাত ফয়েজ লেকে এসে পৌছালাম বেলা এগারটার দিকে। এটি পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত একটি কৃত্রিম হৃদ। ১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ফয় (ঋড়ু) এটি খনন করেন। তার নামানুসারেই লেকটি ফয়েজ লেক হিসেবে পরিচিতি পায়। লেকটি খননের উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সময়ে রেল কলোনীতে বসবাসকারী লোকদের কাছে পানি পৌছে দেয়া। ৩৩৬ একর জমির ওপর তৈরী এ লেকটি পাহাড়ের এক চুড়া থেকে আরেক চুড়ার মধ্যে সংকীর্ণ উপত্যকায় আড়াআড়িভাবে বাঁধ নির্মানের মাধ্যমে সৃষ্ট। লেকে নৌকা ভ্রমনের ব্যবস্থা রয়েছে। এটির আকর্ষণে দুর-দুরান্ত থেকে অনেকে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যেতেও দেখা গেছে। কারন ্এর প্রবেশ মুল্য বেশ চড়া। কোন রাইড ছাড়াই এর মধ্যে ঢুকতে আপনাকে গুনতে হবে আড়াইশ’ টাকা। পাশেই চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানা খুব বেশী সমৃদ্ধ না হলেও পাহাড় থেকে বানিজ্যিক রাজধানীর সারি সারি সুউচ্ছ ভবনগুলি দেখার সুযোগ সেটি পুষিয়ে দেয। এই প্রথমবার শুনলাম সিংহের গর্জন। কেপে কেপে উঠছিল পুরো এলাক্ া। আসলে আভিজাত আর হিং¯্র প্রানী বাঘ আর সিংহের সবকিছুতেই যেন ভয়াল সুন্দরের কথা মনে করিয়ে দেয়।
শুক্রবার অনেকেই গেলেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত দেখতে। জিরো পয়েন্ট থেকে ১৪ কিলোমিটার দুরে কর্ণফুলি নদীর মোহনা এটি। সমুদ্র সৈকতের নয়নাভিরাম দৃশ্য মনকে আন্দোলিত করবে, সন্দেহ নেই। তবে বিকেলের দিকে জোয়ারের তোড়ে ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে,মনে হয় ক্রোধে অন্ধ সাগর যেন ভেঙে-চুরে চুরমান করে সবই তার দখলে নিতে চায়। সন্ধ্যায় সমুদ্রের বিশাল জলরাশির মধ্যে তেজোদ্দীপ্ত সূর্যের ধীরে ধীরে প্রবেশের দৃশ্য দেখে মনে হয়,রাতটুকু সে যেন আশ্রয় নেবে মমতাময়ী মা সদৃশ বিশাল জলরাশির আধার সাগরের মাঝে। ফিরে এলাম হোটেলে। পরদিন যাত্রা রাঙ্গামাটি। শুনেছি,সেখানে পাহাড়ের সূউচ্চ চুড়া আর নীল আকাশের ছোঁয়াছুয়ির প্রাকৃতিক খেলার প্রয়াস থাকে সবসময়।
ভোর পাঁচটার দিকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে আবারো বাস যাত্রা। উদ্দেশ্য লোকালয় ছেড়ে ওই দুর পাহাড়। রাঙ্গামাটি জেলায় ঢুকতেই ওয়াগ্গা ৭নং বিজিবি ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে ’ঘাম রক্ত বাচায়’ লেখাটি খুব মনে ধরল। লিছুবাড়ী এলাকায় পাহাড়ের মধ্যে আঁকাবাকা পথ চলার একটি জায়গায় বাস একটু থামতেই ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল্ । কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি রাঙ্গামাটির রহস্যময় সৌন্দর্যের জট খুলতে শুরু করল। দুর্গম পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সর্পিল ভঙ্গিতে ছুটে চলেছে আমাদের বহনকারী চারটি বাস। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেদিকে পাহাড় আর পাহাড়। চোখে পড়ছে অল্প-স্বল্প হালকা মেঘ। সেগুলি হারিয়ে যাচেছ দুর পাহাড়ের আড়ালে,আবার উকি দিয়ে লুকোচ্ছে গোমটা টানা লাজুক বউয়ের মত। পাহাড়,নদী আর হৃদের এমন অপূর্ব মিলনমেলা সম্ভবত শুধু রাঙ্গামাটিতেই দেখা সম্ভব। ’চারপাশ যেন পটুয়ার পটে আঁকা কোন জলতরঙ্গের ছবি’এমন উপমাও যথেষ্ট নয়,রাঙ্গামাটির ক্ষেত্রে। এখানে আবার পাহাড় কেনা-বেচাও হয়।  জেলা শহর থেকে লঞ্চযাত্রা। লাঞ্চের প্যাকেট নিয়েই উঠা হলো। কাপ্তাই লেকের মধ্য দিয়েই শুভলং যাত্রা। সৌন্দর্য যার কাছে কদর্য লাগে,এমন মানুষও বিমোহিত হবেন লেক ভ্রমনে।
দক্ষিন-পুর্ব এশিয়ায় মানবসৃষ্ট বৃহত্তম লেক এটি। পাকিস্থান সরকার আমেরিকার অর্থায়নে ১৯৬২ সালে এর নির্মান কাজ শেষ করে। মুলত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য লেকটি তৈরী করা হয়। যায়হোক, লঞ্চের পাটাতন থেকে যেদিকে তাকাচ্ছিলাম,চোখে পড়ছিল কেবল পাহাড় আর পাহাড়। লেকের বিশাল জলরাশি অপার মমতায় দু’হাত দিয়ে যেন পাহাড়গুলিকে আগলে ধরেছে। পৃথিবীর অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও এখানকার জল,পাহাড়,পাহাড়ী মানুষ আর আকাশের মিতালি এলাকাটিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। লঞ্চ ছুটে চলছেই। আমরা কয়েকজন বাইরে বসে পাহাড়গুলিকে নিজেদের মত করে দেখছিলাম। কিছু কিছু জায়গার পাহাড়গুলিকে দেখে মনে হচ্ছিল,মানুষের ব্যবহারের জন্য সংস্কার করা হয়েছে। পরে জানলাম সবগুলিই প্রাকৃতিকভাবে তৈরী হওয়া। পাহাড়ের সূউচ্চ চুড়ায় ছোট ছোট ঘর বেঁধে চাকমাদের বসবাস যে কাউকে শিহরিত করবে। পরে শুনেছি,পাহাড়ের ওপর তাদের গোষ্ঠিগত বসবাস। শুকর তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত,সবজি ও মাছ তাদের প্রধান খাদ্য। সমাজপতিরা কারবারী নামে অভিহিত। সহজ ও সরল এসব আদিবাসীরা এখনো বাঙ্গালীদের বাঁকা চোখেই দেখে। মাঝে মাঝে চোখ যাচ্ছিল লেকের স্বচ্ছ ও বিশাল জলরাশির দিকে। আকাশের মেঘ আর তার নীলাভ আভা খেলা করছিল লেকের জলে। আবার যখন পাহাড়ের দিকে নজর যাচ্ছিল,মনে হচ্ছিল,পাহাড়ের কোল ঘেঁসে ঘুমিয়ে আছে শান্ত জলের লেক। আর নীলাকাশ উঁকি মারে লেকের মধ্যে আর চুমু খায় পাহাড়ের মাথায়। শুভলং যাওয়ার পথে কাপ্তাই লেকের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ জুড়ে আছে ইকো ভিলেজ। এখানকার রেস্তোরায় বিভিন্ন পাহাড়ী খাবার পাওয়া যায়।
পৌছালাম শুভলংয়ে। রাঙ্গামাটি জেলার বড়কল থানার একটি ইউনিয়ন এটি। পূর্বে পাহাড় আর পাহাড়। যেটি স্পর্শ করেছে ভারতের মিজোরাম রাজ্য ও মিয়ানমারের চিন প্রদেশকে।  শুভলং পাহাড়ের উচ্চতা ১৮৬০ ফুট। আমাদের মত অনেক পর্যটক এ স্থানে এসেছেন। শুভলং টাওয়ারের ওপর একটি পুলিশ ফাড়িও রয়েছে। রয়েছে একটি মোবাইল কোম্পানীর টাওয়ার। স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জানা গেল,আদিবাসীরা খুব একটা পছন্দ না করলেও বাঙ্গালীরা ব্যবসা-বানিজ্য ও সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন চাকরিতে গেঁড়ে বসেছে । তবে পাহাড়ী এলাকা বলে তাদেরকে সমীহ করেই বাঙ্গালীদের চলতে হয়। ফিরে আসার সময় ’ঝুলন্ত ব্রিজ’ দেখা হল। যদিও দু’পাশে পিলার রয়েছে, মাঝখানে ঝুলন্ত বলেই হয়তো এর নামকরণ এভাবে করা হয়েছে। ব্রিজটি এপাশের সিলেটিপাড়া ও ওপারে দেওয়ানপাড়াকে সংযুক্ত করেছে। ফিরে আসার পথে পড়ন্ত বিকেলে আমিনুর রশিদের মারফতি গানের সুর মনটাকে আরো উদাস করেছিল। এখানেই বেশী বেশী মনে পড়ছিল,আমার এক বন্ধুকে,যিনি অনেকবারই আমাকে নিয়ে রাঙ্গামাটি যেতে চেয়েছিলেন। ইচ্ছে করছিলনা রাঙ্গামাটি ছেড়ে আসতে। তবুও রুটিন প্রোগ্রাম। ফিরতেতো হবেই। এবার গন্তব্য কক্সবাজার। রাতেই সবাই কক্সবাজার পৌছে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে হোটেলের বেডে শরীরটা এলিয়ে দিতেই লম্বা ঘুম। ঘুম ভাঙলো দেরীতে।

কক্সবাজারে এটি আমার দ্বিতীয়বারের মত আসা। পা ফেললেই রোমাঞ্চিত হওয়ার মতই একটা জেলা কক্সবাজার। ব্রিটিশ ভারতের সামরিক কর্মকর্তা ল্যা: কক্সের নামানুসারে আজকের কক্সবাজার। পর্যটন রাজধানীতে ঢুকে কান পাতবেন পশ্চিম দিকে। শুনতে পাবেন সাগরের গর্জন। সাগর,সৈকত,পাহাড়,ঝর্ণা আর দ্বীপ-সবই পাওয়া যায় এজেলায়। পৃথিবীর বৃহত্তম ১২০ কি:মি: সৈকত দেশবাসীর গর্ব করার মত একটি বিষয়। রাঙ্গামাটিতে রুপসী বাংলার রুপ ধরা পড়েছিল পাহাড় আর বিশাল জলরাশিতে। কক্সবাজারে বাংলার রুপ আপনার কাছে ধরা দেবে অন্যভাবে। বাংলার রুপ এখানে সেজেছে বালুর আঁচলে। সাতক্ষীরা থেকে আসা সবাই সমুদ্র¯œানের মাধ্যমে নিজেদের সঁপে দিল সমুদ্রদেবীর কাছে। আমি নরম বালুচরে হাটতে হাটতে রাজকাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ আর সমুদ্রের ভয়াল রুপ দেখতে লাগলাম। ঘোড়ায় চড়ে উত্তাল সমুদ্রের সাথে পাল্লা দেয়ার ইচেছ মনের মধ্যে জাগলেও সেটা আর হয়ে উঠেনি। আমরা সবাই গিয়েছিলাম লাবনী পয়েন্টে। এরকম অনেক সী-বিচ পয়েন্ট থাকলেও লাবনী শহরের একেবারে নিকটে বলেই হয়তো পর্যটকদের ভীড় এখানে বেশী। তাছাড়া এখানে নানা পসরায় সজ্জিত ছোট ছোট দোকানে বিভিন্ন মনোহরি সামগ্রীর কেনা-কাটার ধুম পড়ে যাওয়াটা উল্লেখ করার মত।  রোববার বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে ডলফিন চত্বরে আসতে বলা হলো। শহরের উপকণ্ঠেই আরেকটি দর্শনীয় স্থান হিমছড়ি পাহাড় আর তার ঝর্ণা। বাসে যেতেই বামপাশে সবুজঘেরা পাহাড় আর ডানদিকে সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি আবারো আমাকে আনমনা করে দিল। মনে পড়ে গেল,মুঘল স¤্রাট শাহ্ সুজার কথা। মুঘল স¤্রাটরা সবাই সৌন্দর্যপ্রেমী ছিলেন। স¤্রাট শাহ্জাহানের পুত্র শাহ্ সুজা পাহাড়ী রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে এ স্থানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শহর থেকে মাত্র ১০/১২কি:মি: দুরে হওয়ায় তাড়াতাড়ি হিমছড়িতে পৌছানো গেল। একপাশে বিস্তির্ণ বালুর জমিন আর সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর একদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি। মাঝে পিচঢালা আঁকাবাকা মসৃন পথ। এমন দৃশ্য শুধু আমার জন্মভূমি সোনার বাংলায় পাওয়া সম্ভব। পাহাড়ের চুড়ায় একটি রিসোর্ট আছে। দু’শতাধিক সিড়ি মাড়িয়ে যখন শীর্ষচূড়ায় পৌছালাম,মূহুর্তেই কষ্ট ভুলে গেলাম নীচের দিকে তাকিয়ে। পুরো সমুদ্র ও আশেপাশের এলাকাগুলি চোখের কাছেই। কি অসাধারন! কি কাব্যিক! স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার চেয়েও সুন্দর সে দৃশ্য। তবে হতাশ হলাম ঝর্ণা দেখে। স্থানীয়রা জানালেন,বর্ষার সময়ে জলপ্রপাত জীবন্ত থাকে। এখন যে ছোট ঝর্ণাকে দেখা যাচ্ছে,তা কৃত্রিম অর্থ্যাৎ মটর চালিত পাম্পের মাধ্যমে ঝর্ণা বাচিয়ে রাখা। ক্রিসমাস ট্রি হিমছড়ির প্রধান আকর্ষণ। যদিও সময়ের অভাবে সেটা দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফেরার পথে দেখলাম,সবাই সমুদ্রের দিকে ছুটছে। ময়না ভাই বললেন,সুর্যাস্তের দৃশ্যটা মিস করা ঠিক হবেনা। আবারো সেই সমুদ্র! আসলে গিয়েছিতো সমুদ্র আর পাহাড়ের দেশে। যতটুকু আহরিত হবে,সবকিছুতো এ দু’টো থেকে। আমিও এগিয়ে গেলাম। দিনব্যাপী তীব্র গর্জন শেষে রাতের নিস্তব্দতার সংকেতই হয়ত দিচেছ অস্তাচলগামী সূর্যটা । দিগন্তজুড়ে রক্তিম আভায় ফুলে ফুলে উঠছে সাগরের ঢেউ। ডুবে যাওয়া সুর্যের লাল-সোনালী আলো লেজার রশ্মির মত রেখা ছড়িয়ে পড়ছিল। ফিরতে ইচ্ছে করছিলনা। হুশ পেলাম কারো একজনের ডাকে। হ্যা,ফিরতে তো হবে। এটাই ভ্রমনের শেষ দিন। ভ্রমন পিপাসু সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের বিদায়ের সাইরেন বাজিয়ে ধীরে ধীরে সূর্যটা ডুবে গেল। একরাশ হতাশা নিয়ে হোটেলে ফিরলাম।
পরের দিন সোমবার। কক্সবাজার থেকে বিদায় নিলাম। মনে মনে হাত নাড়ালাম আর বললাম, সৌন্দর্যের রানী কক্সবাজার,তুমি নববধুর মত সেজে বসে থাক বলে,হাজার হাজার প্রেমিক পুরুষ বারবার তোমার কাছে আসে।
সৌন্দর্যপিয়াসী মন পেয়ালাভরে যে ¯িœগ্ধ শরাব পান করেছে,তাতে বাড়তি আর চাহিদা নেই। তবুও বাস থামল ডুলাহাজরায় এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্কের সামনে। সাফারী পার্ক হলো সরকার ঘোষিত এলাকা যেখানে বণ্যপ্রানীদের কে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রতিপালন করা হয়। আটটি ব্লকে বিভক্ত এ পার্কে বাঘ,সিংহ,ভালুক,ময়ুর,জলহস্তিসহ বন্যপ্রানীর কমতি নেই। নয়শ’ হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পার্কটির দক্ষিনদিকে বান্দরবন জেলার বনভুমির সাথে সংযুক্ত। হিং¯্র বন্যপ্রানীদের বিচরণের জন্য উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। সাফারী পার্ক সম্পর্কে কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম, চিড়িয়াখানায় আপনি খাঁচার মধ্যে আর পশুপাখিরা আপনাকে দেখতে আসছে। ব্যাপারটা একদম হুবহু এরকম না হলেও অনেকটা কাছাকাছি অনুভূতি আপনি পাবেন বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কে । অনেক সময় অপেক্ষা করে মিনি বাস টাইপের একটি গাড়ী পাওয়া গেল। হুড়মুড় করে অনেকেই উঠলাম। গাড়ী চলতে চলতে মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি গহীন বনে। চালক সব দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনিই বললেন,বন্যহাতির আক্রমনের ভয়ে কর্তৃপক্ষকে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। দুষ্টু বন্যহাতির দল বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙ্গে চুরমার করে। জলহস্তিদের বিশাল হাঁ অবাকই করে দিল।
আর দেরী নয়। এবার ফিরতে হবে সেই চিরচেনা সাতক্ষীরায়। বাস আবারো শা শা বেগে ছুটল। পেছনে রেখে আসলাম রাঙ্গামাটি,কক্সবাজার আর চট্রগ্রাম। প্রত্যেকেই অর্জন করলেন রোমাঞ্চকর কিছু অভিজ্ঞতা,যা কখনো বিস্মৃতি হওয়ার নয়। ধন্যবাদ প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটিকে,বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদককে,যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সফল হয়েছে দুঃসাধ্য একটি আনন্দ ভ্রমন। এত দুরে, আর এত বেশী সংখ্যক সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দিনের আনন্দ ভ্রমন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের ইতিহাসে হয়নি। ধন্যবাদ জানাই সিনিয়র সদস্যদের,যাদের পরামর্শ এগিয়ে চলতে সাহায্য করেছে। ধন্যবাদ জানাই নবাগত তরুণ সদস্যদের যাদের সহযোগীতা আনন্দ ভ্রমনকে আরো আনন্দময় তুলেছে।