পেনশন বইয়ের যুগ শেষ হচ্ছে


490 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
পেনশন বইয়ের যুগ শেষ হচ্ছে
আগস্ট ২০, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আগামী মাস থেকে ঢাকায় ও ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেনশন

অনলাইন ডেস্ক ::

চাকরি শেষে ঝামেলাহীন অবসর জীবন চান সবাই। কিন্তু পেনশন বা অবসরভাতা হাতে পেতে গিয়ে তা আর হয় না। পেনশনের জন্য মাসে মাসে হিসাবরক্ষণ অফিস ও ব্যাংকে দৌড়াতে হয়। এমনকি তিনি যে বেঁচে আছেন তা প্রমাণ করতে কমপক্ষে প্রতি ১০ মাসে একবার জেলা বা উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সামান্য হেরফের হলে সেখানেও থাকে নানা বিড়ম্বনা। পেনশনভোগীদের এসব ভোগান্তি দূর হচ্ছে। এখন থেকে আর পেনশন বই (পেনশন পেমেন্ট অর্ডার) নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের মাসে মাসে ব্যাংকে যেতে হবে না। মাসিক পেনশন ও অন্যান্য ভাতা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা করে দেবে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিজিএ)।
বেসামরিক পেনশন ব্যবস্থাপনা করা হয় সিজিএ কার্যালয় থেকে। এখানকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীরা যেখান থেকে অবসরে যান বা যেখান থেকে পেনশন তুলতে চান সেই জেলা বা উপজেলার হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে পেনশন বই নেন। ওই এলাকার ব্যাংক শাখাগুলোতে পেনশনারদের তালিকা ও পেনশনের পরিমাণ দিয়ে একটি লিস্ট (যাকে ‘ডি-হাফ’ বলা হয়) দেয় হিসাবরক্ষণ অফিস।
পেনশনভোগী ব্যক্তি হিসাবরক্ষণ অফিসে হাজির হয়ে পেনশনের মূল বইয়ে স্বাক্ষর করে ব্যাংকে হাজির হন। ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা দিয়ে দেয়। পরে সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশনসহ পুনর্ভরণ নেয়। এতে পেনশনের পাশাপাশি কমিশন বাবদ বড় অঙ্কের ব্যয় করতে হয় সরকারকে। যদিও ব্যাংকগুলোর অভিযোগ, সরকার এই পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করে না।
নতুন ব্যবস্থায় সিজিএ অফিস সরাসরি পেনশন দেবে। সকল পেনশনারের পাওনা একবারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দিয়ে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে পেনশনারের নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করে দেবে। গত দুই মাস ধরে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় এটি চালু হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখা থেকে পেনশন নেন এমন এক লাখ ৩০ হাজার পেনশনভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পরিশোধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাদের পেনশন বইয়ের যুগ শেষ হচ্ছে আগামী মাস থেকে। হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর থেকে যারা পেনশন নেন, তাদের আগস্ট মাসের পেনশন হবে প্রচলিত ব্যবস্থার শেষ পেনশন। এরপর থেকে ইএফটির মাধ্যমে তার নিজের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি জমা হবে। সিজিএ অফিস এক আদেশে ব্যাংকগুলোকে আগস্টের পরে ঢাকা মহানগরের ব্যাংক শাখা যাতে পেনশন বাবদ কোনো অর্থ না দেয় বা পুনর্ভরণ না করে সেজন্য নির্দেশনা দিয়েছে। ঢাকা মহানগরের বাইরে অবস্থিত ব্যাংক শাখা থেকে যেসব পেনশন দেওয়া হয়, সেগুলো প্রচলিত ব্যবস্থায় ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ডিসেম্বরের পরে দেশের কোথাও ব্যাংক থেকে আর কোনো পেনশন দেওয়া হবে না।
বর্তমানে রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও তাদের উত্তরাধিকারীরা অবসর সুবিধা পেয়ে থাকেন। নতুন ব্যবস্থায় দেশের সরকারি, বেসরকারি যেকোনো ব্যাংকের হিসাবেই অবসর সুবিধা নিতে পারবেন তারা। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৭ লাখ লোক অবসর সুবিধা গ্রহণ করেন। প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ নতুন করে অবসর সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। আর চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর মৃত্যুজনিত কারণে বাদ পড়ছে প্রায় ২ হাজার। এ বছর সরকার পেনশন ও গ্রাচ্যুইটি বাবদ বাজেটে ২৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। যদিও পেনশনের চেয়ে গ্রাচ্যুইটিতে বেশি অর্থায়ন করতে হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক কর্মী পেনশনার মো. হোসেন উজ জামান বলেন, আগের তুলনায় পেনশন পাওয়া সহজ হলেও এখনও উপজেলা অ্যাকাউন্টস অফিস এবং ব্যাংক ঘুরে টাকাটা হাতে পেতে হয়। সরকার সরাসরি নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করার ব্যবস্থা করলে পেনশনারদের ঝামেলা অনেক কমে যাবে।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মাসিক পেনশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবে জমা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের অধীন কর্মকর্তাদের পেনশন ইএফটির মাধ্যমে দেওয়ার কাজ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। চলতি বছরের শুরুতে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সহজীকরণ আদেশ-২০২০ জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। পরে গত মে মাসে তা সংশোধন করে ৮টি নতুন বিষয় সংযোজন করা হয়। এগুলো হচ্ছে- প্রত্যাশিত শেষ বেতনপত্র (ইএলপিসি), প্রাপ্তব্য পেনশনের বৈধ উত্তরাধিকারী ঘোষণাপত্র, উত্তরাধিকার সনদপত্র ও নন-ম্যারেজ সার্টিফিকেট, পেনশন ফরম-২.১, পারিবারিক পেনশন ফরম-২.২, নমুনা স্বাক্ষর ও হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ, আনুতোষিক ও অবসরভাতা উত্তোলন করার জন্য ক্ষমতা অর্পণ ও অভিভাবক মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র এবং ‘না’ দাবি প্রত্যয়নপত্র।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, পেনশন ব্যবস্থা সহজ করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবসরের পরে যাতে কেউ কোনো ধরনের বিড়ম্বনার মধ্যে না পড়েন এবং নিজের সুবিধা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তার জন্য এ উদ্যোগ।
একই ধরনের মত দিয়েছেন সিজিএ অফিসের পেনশন ও ফান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপপ্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলী হাসান। তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্তদের সহজে পেনশন পৌঁছে দেওয়া সরকারের লক্ষ্য। এসব উদ্যোগ তারই অংশ। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ইএফটির মাধ্যমে পেনশন দেওয়া হয়েছে। আগামী মাস থেকে চূড়ান্ত কার্যক্রমে যাচ্ছে এ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে পেনশনের জন্য হিসাবরক্ষণ অফিস বা ব্যাংকে গিয়ে বসে থাকার যুগের অবসান হচ্ছে।
জীবিত প্রমাণে অ্যাপ :পেনশনার জীবিত আছেন তা প্রমাণে সশরীরে উপজেলা বা জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে হাজির হওয়ার দরকার হবে না। ঘরে বসেই মোবাইল অ্যাপ বা মেসেজের মাধ্যমে তা জানানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মী জীবিত আছেন কিনা তা প্রমাণের জন্য প্রতি ১০ মাস পরপর তাকে জেলা বা উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে সশরীরে হাজির হতে হয়। এতে প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিশেষত বয়স্করা বেশি সমস্যায় পড়েন। বৈরী আবহাওয়া, অসুস্থতাসহ নানান কারণে সময়মতো উপস্থিত হতে না পারলে পরের মাসের পেনশনের টাকা পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় অবসরপ্রাপ্তদের। এ অবস্থারও পরিবর্তন আসছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে জীবিত প্রমাণের হাজিরা ডিজিটাল ব্যবস্থায় নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে তার জবাব নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। পরবর্তীকালে একটি অ্যাপ চালু করা হবে। নিজের মোবাইলে অ্যাপ ডাউনলোড করে ফিঙ্গার প্রিন্ট পাঠিয়ে নিজের বেঁচে থাকার তথ্য জানাতে পারবেন অবসরপ্রাপ্তরা।

এ বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, আশা করা হচ্ছে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ‘লাইভ ভেরিফিকেশন’ অ্যাপ চালু হয়ে যাবে। মো. আলী হাসান বলেন, প্রাথমিকভাবে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে লাইভ ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করা যাবে। এরপর অ্যাপ তৈরি হলে অ্যাপের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে জানানো যাবে। আর যারা মোবাইল মেসেজ বা অ্যাপের মাধ্যমে পারবেন না, তাদের জন্য হিসাবরক্ষণ অফিসে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবস্থা করা হবে।
জানা গেছে, নতুন এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে অবসরগ্রহণকারীদের একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হচ্ছে। সিজিএ অফিসের ওয়েবসাইট ও হিসারক্ষণ অফিসে এই ফরম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও নিজের ব্যাংক হিসাবের এমআইসিআর চেক বইয়ের উপরিভাগের ফটোকপি ব্যাংকে জমা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক এসব ডকুমেন্ট ডি-হাফ জমা দেওয়ার সময় হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে জমা দেবে।