প্রধানমন্ত্রীর ভারত ও ভুটান সফর : বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আশার আলো


368 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্রধানমন্ত্রীর ভারত ও ভুটান সফর : বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আশার আলো
এপ্রিল ২২, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও ভুটান সফর করেছেন। এই সফরে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ সংক্রান্ত বেশকিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে করা চুক্তি ও সমঝোতাগুলো বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব বিষয়ে চুক্তি এবং এমওইউ হয়েছে সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ হবে।

বাংলাদেশ ও ভুটান পারস্পরিক স্বার্থে বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ খাতে সহযোগিতা জোরদারে দ্বিপক্ষীয় এবং উপ-আঞ্চলিকভাবে কাজ করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সংহত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে এ দুই দেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাসো তেরেসিং তোবগে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থে বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আঞ্চলিক কাঠামোয় নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জলবিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ, ভুটান ও ভারতের মধ্যে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিষয়কে তারা স্বাগত জানান। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে তিনটি দেশের নেতারা যখন একত্রিত হবেন, তখন এ সমঝোতা স্মারক সই হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বছরে বিদ্যুৎ চাহিদা ৩০ হাজার মেগাওয়াট হবে। এ চাহিদা পূরণে ভারত, ভুটান, নেপালের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানে জলবিদ্যুতের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে সেখানে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের। ভুটান মনে করে, তাদের জলবিদ্যুতের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ‘দৃশ্যপট পরিবর্তন’ করা সম্ভব। আলোচনা হচ্ছে, তিন দেশ মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা আঞ্চলিকভাবে বণ্টন করা হবে।

ভারত প্রসঙ্গ :১০ এপ্রিল দিলি্লতে অনুষ্ঠিত বিজনেস ফোরামে ১৩টি চুক্তি এবং এমওইউ হয়। এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯টি চুক্তি এবং এমওইউ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকেন্দ্রিক। পাশাপাশি কন্টেইনার ট্রান্সপোর্টেশন নিয়েও একটি এমওইউ হয়েছে কন্টেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড এবং কন্টেইনার করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার মধ্যে। ভারতের রিলায়েন্স মেঘনাঘাটে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে। সরকার এখান থেকে বিদ্যুৎ কিনবে বলে চুক্তি হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রিলায়েন্স ৭১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসি চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে এ সংস্থা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে পিডিবি। এই এনপিটিসি বিদ্যুৎ ভায়াপার নিগম নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে সঞ্চালনে সহযোগিতা করবে বলে এমওইউ হয়েছে। এদিকে ভারতের আরেক বড় কোম্পানি আদানি পাওয়ারের সঙ্গে পিডিবি চুক্তি করেছে, যার অধীনে আদানির ঝাড়খণ্ডের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেবে। এ ছাড়া এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে তিনটি চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। ভারতের পেট্রোনেট এলএনজি লিমিটেড, রিলায়েন্স পাওয়ার ও ইন্ডিয়া অয়েল করপোরেশনের সঙ্গে আলাদা চুক্তি হয়। এই এলএনজি প্লান্ট থেকে গ্যাসের চাহিদা অনেকটা

পূরণ হবে। এ ছাড়া ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারির সঙ্গে গ্যাসওয়েল আমদানির বিষয়ে চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা।

সব মিলিয়ে ভারতের বিভিন্ন সংস্থা থেকে দুই হাজার ৩৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপ্যাধ্যায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানির কথা বলেছেন। এ ছাড়া দু’দেশের যৌথ উদ্যোগে নেওয়া রামপাল মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্পের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট প্রকল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ভারতের এক্সিম ব্যাংক এ প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। এ মর্মে চুক্তিও হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব চুক্তি দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। চুক্তিগুলো থেকে বাংলাদেশের অনেক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে উভয় সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকরী উদ্যোগ দরকার। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য সবচেয়ে ক্ষুধার্ত দেশ। উদ্যোক্তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছেন না। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎসহ জ্বালানি বিষয়ে যে চুক্তিগুলো হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। এ ছাড়া অন্য বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গতি আসবে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে সেগুলো যদি কাজে লাগানো যায়, ভারতীয় বিনিয়োগ যদি আসে, তাহলে ভারত যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে, সেটা আরও বেশি কাজে লাগানো যাবে। সরবরাহ সক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন ধরনের যে সীমান্ত সুবিধার কথা বলা হয়েছে, এগুলো কার্যকর করা হলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। রফতানি সক্ষমতাও বাড়বে। তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব চুক্তি এবং এমওইউ হয়েছে, তার সবই ইতিবাচক। এখন শক্তিশালী উদ্যোগ নিয়ে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, শুল্ক-অশুল্ক বাধাগুলো দূর করার বিষয়ে ভারত আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারত সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের সম্পর্ক যত ভালো হবে, ব্যবসা তত সহজ হবে। বর্তমানে সে ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজ হবে ও বাড়বে।

এ ছাড়া এই সফরে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রকল্পে ৪৫০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সহযোগিতা, মহাকাশ সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনায় ঋণ বিষয়ে চুক্তি এবং এমওইউ হয়েছে। বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের সঙ্গে এ ধরনের সম্পৃক্ততা থাকাটা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন, সেখানেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ, ডিজেল ও তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজি আমদানি নিয়ে কথা রয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। এ ছাড়া রয়েছে ট্রান্স বাউন্ডারি পাইপলাইন, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের অন্য রাজ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করবে। বাংলাদেশ হুইলিং চার্জ পাবে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ভারতের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সীমান্তে শুল্ক ও সমন্বিত পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে বলে ঘোষণা এসেছে দুই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। পাটের ওপর আরোপিত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে ভারত।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে লাইন অব ক্রেডিটে (এলওসি) ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে ভারত। এর আগেও ভারত দুটি এলওসি বা দু’দফা ঋণ দিয়েছে। যদিও তার পুরোটা বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলওসি থেকে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে শ্লথ গতিতে। প্রথম ও দ্বিতীয় এলওসিতে ৩৫টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে কেনাকাটার যেসব প্রকল্প ছিল, বিশেষ করে বাস কেনা, বগি কেনা; এগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নেওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে খুবই শ্লথ গতিতে। আশুগঞ্জ আন্তর্জাতিক নদীবন্দরের উন্নয়ন অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। এ জন্য নতুন যে লাইন অব ক্রেডিট আসছে, সেখানে উপযুক্ত প্রকল্প বাছাই করতে হবে। তবে এই এলওসি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই ৪৫০ কোটি ডলারের এলওসি কোন কোন খাতে ব্যবহার হবে বা কী কী শর্তে ভারত এ ঋণ দেবে, তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা সুফল পাবে।

ভুটান প্রসঙ্গ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে যোগাযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণে কয়েকটি চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশের। সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজতে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর দ্বৈত কর প্রত্যাহার, বাংলাদেশের নৌপথ ভুটানকে ব্যবহার করতে দেওয়া, কৃষি, সংস্কৃতি ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাঁচটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেছে প্রতিবেশী দুই দেশ। তবে এসব চুক্তির চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বিদ্যুৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা। ভুটানে হাজার হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ করে বিদ্যুৎ আমদানি বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে ভারতও একমত। এই তিন দেশ একসঙ্গে এই সম্ভাবনা ভাগাভাগি করতে আগ্রহী।

এ ছাড়া দুই দেশের সংযোগকে ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বৈত কর প্রত্যাহার করায় দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল নিয়ে বিবিআইএন নামে যে উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনের কাজ চলছে, তা নিয়েও দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন। বিবিআইএন এ এলাকার কানেকটিভির একটা প্রধান করিডর হতে পারে। এর বাস্তবায়নে ভুটানকে তাগাদা দিয়েছেন শেখ হাসিনা।