প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ারোধে মনিটরে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখার গুরত্ব


1093 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ারোধে মনিটরে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখার গুরত্ব
সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮ দেবহাটা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

মোঃ হাফিজ-আল আসাদ ::
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বা Pre-primary Education আমাদের দেশের মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নবতর সংযোজন। সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনার আলোকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি স্বতন্ত্র ও পৃথক শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের নির্ধারিত ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা অর্জনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। মানসম্মত ও একীভূত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ও ঝরে পড়ার হার কমাতে এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর হার বাড়াতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বলতে সাধারণত শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা তথা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পূর্বে প্রস্তুতিমূলক যাবতীয় শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশমূলক কার্যক্রমকে বোঝায়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভের পূর্বে ৬ বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা। ৩ থেকে ৫/৬ বছর বয়সী শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী তাদের যতœ, বেড়ে উঠা এবং শিশু অধিকার নিশ্চিত করা, খেলাধুলা, আনন্দ, অক্ষরজ্ঞান এবং গণনার হাতে খড়ির মাধ্যমে তাদের উন্নয়নে এবং শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার সময় এটি।
স্কুল এবং প্রতিদিনকার জীবন-যাপনে সফলতা আনার জন্য শিশুকাল থেকেই দক্ষতা, জ্ঞান এবং আচরণ শেখানোর জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। এটি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার উপযোগী এবং সকল ধরনের উন্নয়নের জন্য কাজ করে। এর কয়েকটি লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি ঝোঁক তৈরির জন্য শিশুদের মানসিক এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত করানো, শিশুদের উপযোগী খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর সামাজিকীকরণ শিক্ষা, শিশুদের গান, নাচ, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, গল্প বলা, গননা এবং বর্ণমালা শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করা। শ্রেণীকক্ষে পঠন-পাঠন আকর্ষণীয়, গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ করতে হলে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। শিক্ষার্থীদের সামনে কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপকরণের সহায়তায় উপস্থাপন করতে পারলে তারা অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারে এবং দীর্ঘকাল তা শিক্ষার্থীর মনে টিকে থাকে। শিক্ষা সহায়ক উপকরণের মধ্যে শ্রবণ ও দর্শনমূলক উপকরণাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্রবণ দর্শন সহায়ক উপকরন বলতে এমন ধরনের পাঠ সহায়ক উপকরণসমূহকে বোঝায়, যার কোনটি দর্শনযোগ্য, কোনটি শ্রবণযোগ্য এবং কোনটি একই সাথে দর্শন ও শ্রবণযোগ্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ সহায়ক উপকরণকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা চলে। যথা-
১. দৃশ্য উপকরন: যেমন, পোষ্টার পেপার, ভিপ কার্ড, গাছ পালার অংশ বিশেষ, ফল ফুল ইত্যাদি।
২. শ্রব্য উপকরণ: যেমন, রেডিও, টেপরেকর্ডার, গ্রামোফোন, ল্যাংগুয়েজ ল্যাব ইত্যাদি
৩. দৃশ্য-শ্রব্য উপকরণ: যেমন, টেলিভিশন(মনিটর), সিনেমা, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ইত্যাদি।
প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদানের জন্য চারটি কর্ণার (কল্পনার কর্ণার, ব্লক ও নাড়াচড়ার কর্ণার, বই ও আঁকার কর্ণার, বালি ও পানির কর্ণার) থাকার কথা থাকলেও খুব কম সংখ্যক বিদ্যালয়ে তা দেখা যায়। অনেক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে প্রয়োজনীয় উপকরণ পর্যন্ত নেই। কিছু শিক্ষক শিক্ষক-সহায়িকা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে গতানুগতিকভাবে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অনেক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের যথাযথ নিয়মে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। শিক্ষক-সহায়িকায় অনানুষ্ঠানিক, গাঠনিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন (One to one approach) করার জন্য নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে আনুষ্ঠানিক ও সাময়িক মূল্যায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষক-সহায়িকায় প্রদত্ত ছকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে যে মহাৎ লক্ষ্য নিয়ে কোমলমোতি শিশুদের বিদ্যালয়ের পরিবেশে আনা হয়েছে তা হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ হারিয়ে যাবে, শিক্ষা গ্রহনের প্রতি তৈরি হবে এক ধরনের ভীতি। এর ফলে শিশুর ঝরে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় দৃশ্য-শ্রব্য উপকরণ : যেমন, টেলিভিশন(মনিটর), সিনেমা, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ইত্যাদির সাহায্যে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও যেমনঃ মীনা কার্টুন, ছড়া, গান, নাচ, সিসিমপুরের মতো আকর্ষনীয় শিক্ষামূলক ভিডিও শিক্ষার্থীদের দেখানো হয় তাহলে শিশুরা অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে তা দেখবে। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। আর এই আকর্ষনীয় শিক্ষামূলক ভিডিও এক দিকে যেমন শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখবে অন্যদিকে তেমনি শিশুকে পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে। উল্লেখ্য সিসিমপুর একটি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুতোষ টেলিভিশন অনুষ্ঠান যা বাংলাদেশের তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার চাহিদা পূরনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। শিশুদের অত্যন্ত পছন্দের আরেকটি শিক্ষামূলক ভিডিও হলো মীনা। অনেক শিক্ষক ছড়া এবং গানগুলো খুবই মজা করে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করেন। অনেক প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষক বিভিন্নভাবে ইউটিউব থেকে নির্ধারিত ছড়া ও গানগুলো সংগ্রহ করেছেন মনিটর এবং ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান করছেন। একটি শিশুর প্রাক-প্রাথমিক স্তর সফলভাবে সমাপনের মূল দায়িত্ব বর্তায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষকের ওপর। শ্রেণীকক্ষে একটি শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বজায় রেখে যথাযথভাবে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে মনিটরে শিক্ষামূলক ভিডিও প্রদর্শন।তাই বলা যায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া রোধে মনিটরে শিক্ষামূলক ভিডিও প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

লেখক : মোঃ হাফিজ-আল আসাদ,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবহাটা, সাতক্ষীরা।
##