প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার


675 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিশুর প্রারম্ভিক শিক্ষার
ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

 

মোঃ আবু তাহের :
পূর্বের লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম শিশুর প্রারম্ভিক শিখন স্তরে কী শেখানো উচিত তা নিয়ে যথেষ্ট ভাববার অবকাশ রয়েছে। আসলে এই বয়সে শিশুদের শিক্ষার লক্ষ্য কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে সম্যক্ষ ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। এই সময় শিশুরা তাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করে। দৈহিক বর্ধনের পাশাপাশি তাদের ভাষার বিকাশ ঘটে দ্রুত গতিতে এবং সে তার পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তব জগত সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তাই শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জায়গাটা হওয়া উচিত তার জীবনঘনিষ্ঠ যাতে শিশু বাস্তব জীবনে কোন দ্বন্দ্বের মধ্যে না পড়ে। এসময় অনর্থক তথ্যের ভারে শিশুকে ব্যস্ত রাখার অর্থ তার অনুসন্ধান ও কৌতূহলের জায়গাটা অনেকটাই রুদ্ধ করে দেয়া। আমাদের দেশের পুঁথিগত বিদ্যার চর্চা দঃখজনকভাবে সেটাই করে থাকে। এখন আমরা একটু দেখার চেষ্টা করি ৩-৫ বছর বয়সি জাপানী শিশুদের কী শেখানো হয় এবং এর যৌক্তিকতা কতটা। জাপানের কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে: স্বাস্থ্য- শিশুর সুস্থ দেহ ও মনের বিকাশ সাধন এবং তাকে সুস্থ ও নিরাপদ জীবনজাপনের অভ্যাস গঠন; মানবিক সম্পর্ক স্থাপন: সকলের সাথে মিলেমিশে জীবনযাপনের লক্ষ্যে শিশু ও তার চারপাশের অন্যান্য মানুষের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন; পরিবেশ: শিশুর চারপাশের পরিবেশকে জানা, অনুসন্ধান ও তার প্রাত্যহিক জীবনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন; ভাষা: নিজের ভাষায় শিশুর অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ, অন্যের কথা শোনা, ভাব বিনিময় করা এবং নিজেকে প্রকাশ করা। এই বয়সে উপরি-উক্ত বিষয়গুলোর বাইরে আরও কি কিছু শিশুর জানার দরকার আছে?
প্রসঙ্গত, আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে, ভিন দেশীয় কোন শিক্ষাব্যবস্থাকে অবিকল নকল করার জন্য আমার এ লেখা নয়। যেটি সঙ্গতও নয়। যেমনটি আমার জাপানী অধ্যাপক বলেছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন,“ মি. তাহের জাপানের শিশু শিক্ষায় তুমি যা দেখছো সেটা তোমার দেশের জন্য মডেল মনে করো না, বরং এখানকার ভাল কাজগুলো তোমার দেশে বাস্তবায়ন করতে পারো।” একজন শিক্ষক এমনটি বলবেন সেটাই স্বাভাবিক। কারণ একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই সেদেশের যুগযুগান্তর লালিত সংস্কৃতি ও সভ্যতার সাথে মানানসই হওয়া জরুরী। উপরন্তু একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রভাবিত হয় সে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, জনমানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনপ্রণালী, জনগণের প্রত্যাশা, ধর্মের প্রভাব রাজনৈতিক দর্শন ইত্যাদির উপর। একথাও সত্যি যে, কোন দেশের শিক্ষাব্যস্থাকে যুগোপযোগী করতে হলে বৈশ্বিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিকেও শিক্ষক্রমে অন্তর্ভূক্তি ও সমন্বয় আবশ্যক বটে।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের শিশু শিক্ষা প্রসংগে। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১০ সালে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হলেও অতীতে একাধিকবার সরকারিভাবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছি। এমনকি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন রিপোেের্ট শিশুর প্রার¤িভক শিক্ষা ও যতেœর উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। তাই অতীতে কখনও ছোট ওয়ান বা ইধনু ঈষধংং হিসেবে এই শ্রেণিটি চালু করা হয়েছিল কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট শিক্ষক না থাকা, শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিখন-শেখানো সামগ্রীর অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে এই কার্যক্রমটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। অবশেষে প্রারম্ভিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি, শিশুর বিদ্যালয় ভীতি দূর করা, প্রথম শ্রেণির জন্য প্রস্তুত করা, ঝরে পড়া রোধ এবং সর্বোপরি সহ¯্রাাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তাগিদের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ৫+ বছর বয়সি শিশুদের জন্য এক বছর ব্যাপী প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি পরিচলনার জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭০০০ শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে এবং তাদেরকে পনের দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য পৃথক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সহায়ক শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রণয়ন ও বিদ্যালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিখন-শেখানো কৌশল হিসেবে গতানুগতিক তোতাপাথির মতো মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে খেলার মাধ্যমে/ খেলার ছলে পড়া কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। ফলে বিদ্যালয় শিশুদের কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষকগণ খেলার ছলে শিশুদের পাঠদান করছেন। ফলে শিশুরা বুঝতেই পারে না কখন খেলছে আর কখন পড়ছে। এই শিক্ষাক্রমে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শিশুদের সার্বিক বিকাশকে সামনে রেখে শিখনের ক্ষেত্রগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। শিশুকে মানসিক চাপমুক্ত রাখতে আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নকে পরিহার করা হয়েছে। পরিবর্তে রাখা হয়েছে অনানুষ্ঠানিক এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন কৌশল। যেখানে শিক্ষক তার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শিশুর সার্বিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য মূল্যায়ন করবেন। আমরা যারা প্রাথমিক শিক্ষার সাথে জড়িত তাদের জানা আছে যে, এই স্তরের শিশুদের বিকাশগত আন্তর্জাতিক মানদন্ড পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিশুর বিকাশ ও শিখনের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রগুলো হলোঃ শারীরিক ও চলনক্ষমতার বিকাশ; সামাজিক ও আবেগিক দক্ষতার বিকাশ; ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। উক্ত বিকাশের ক্ষেত্রকে আবার আটটি শিখনের ক্ষেত্রে বিভাজন করা হয়েছে: ভাষা ও যোগাযোগ; শারীরিক ও চলনক্ষমতা; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; সামাজিক ও আবেগিক; স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা; প্রারম্ভিক গণিত; পরিবেশ এবং সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, শিশুর সার্বিক বিকাশকে বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
উপরি-উক্ত বিকাশ ও শিখনের ক্ষেত্রগুলোর অর্জনের জন্য শিখন-শেখানো কার্যাবলীকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। শিখন-শেখানো কার্যাবলীতে বৈচিত্র্য আনয়নের লক্ষ্যে শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষের ভিতরে ও বাহিরে বিভিন্ন ধরণের খেলাধূলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকে গুরুত্বারোপ করে বিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুন্দর কক্ষটি উক্ত শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করার জন্য সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কক্ষটি সজ্জিতকরণ এবং খেলনা ও শিখন-শেখানো সামগ্রী ক্রয়ের জন্য অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমটি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। কারণ এখনও সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। সদ্য জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য প্রায় ২৬০০০ নতুন পদ সৃজন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানে উক্ত বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি পরিচালনার জন্য একজন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালন কাঠামো ২০০৮ এ বলা আছে ভবিষ্যতে ৩-৫ বছর বয়সের শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে দুই বছর করার। তদানুযায়ী সরকার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে দুই বছর করার পরিকল্পণা করছেন বলে জানা গেছে। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে গৃহীত এহেন উদ্যোগসমূহ আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে। এখন দরকার সকলের সন্মিলিত প্রয়াস যাতে করে সরকার, শিশুর অভিভাবক এবং কমিউনিটি সকলে মিলে সরকারের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে। যাতে করে বাংলাদেশে শিশু শিক্ষার ভিতটা সুন্দর হয় এবং সকল শিশু আনন্দের সাথে তাদের শিক্ষা জীবনের সূত্রপাত করতে পারে।

লেখক- ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, সদর, সাতক্ষীরা।