প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে পরিদর্শনের ভূমিকা


951 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে পরিদর্শনের ভূমিকা
সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮ দেবহাটা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

মোঃ হাফিজ-আল আসাদ ::

একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। জাতীয় আশা-আকাঙ্খা এবং আদর্শের প্রতিফলন ঘটে প্রাথমিক শিক্ষায়। প্রাথমিক শিক্ষা যে দেশে যত সুষ্ঠুভাবে দেয়া হয় সে দেশ তত বেশি উন্নত। প্রাথমিক শিক্ষা মান সম্পন্ন না হলে তা দেশের ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। মান সম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি শিশুর মানবিক গুণাবলী অর্জনের জন্যই প্রয়োজনীয় নয়, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্যও অপরিহার্য। এটি শুধু মানুষকে সাক্ষরতা এবং ভাষাজ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষা দেয় না, একই সাথে তার বিচার বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। মাঠে-ময়দানে, কল-কারখানায়, কৃষিতে কর্মদক্ষতা বাড়ায়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়তা করে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তির আয় প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এরূপ ব্যক্তি অপেক্ষা ৫২.৬% ভাগ বেশি। অনুরূপভাবে তা মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ৭.২% ভাগ এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ১৬.২% ভাগ বেশি। আবার প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৯২.২৫% ভাগ। তাই দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীতে জাতিকে গুনগত মানের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় গত কয়েক বছরে বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করন করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত আরো পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে তিন দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, পুল শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা আনা, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু, অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। আর এই উন্নতির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পরিদর্শন কার্যক্রম। পরিদর্শন যত বস্তুনিষ্ঠ হবে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান তত সহজে অর্জিত হবে। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় (১৯৮০-৮৫) প্রথম সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প প্রবর্তিত হয়। জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা সংগঠনের অবয়ব বহুগুন বৃদ্ধি পায় এবং প্রাথমিক শিক্ষা পরিদপ্তরে প্রশাসন প্রশিক্ষণ এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় কতিপয় উপ-সংগঠন বা উপ-শাখার সৃষ্টি হলেও পরিদর্শনকে প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার উপ-সংগঠন বা শাখা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত না করায় প্রকল্পটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাই তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় (১৯৮৫-৯০) দ্বিতীয় সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিদর্শনকে প্রশাসনিক শাখার উপ-শাখা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করে সহকারী পরিচালক (পরিদর্শন) এর পদ সৃষ্টি করা হয়। বর্তমানে পরিদর্শন শাখার মাধ্যমে মহাপরিচালক তাঁর আওতাধীন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ক্লাস্টার পর্যায়ে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তাকে পরিদর্শন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও উপদেশনা দিয়ে থাকেন। সরকারী নির্দেশনুযায়ী সকল পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে প্রতিমাসে নির্ধারিত দিবস কেবলমাত্র পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োজিত থাকতে হয়। একটি বিদ্যালয়ের যেকোন কার্যদিবসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ, পরিচালন ও মূল্যায়নে একজন পরিদর্শক সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকেন। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনার সহিত পরিদর্শন দিন পর্যন্ত বিভিন্ন পাঠ্য বিষয়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি রেকর্ড এবং রেজিস্টার পরীক্ষা ও নিরীক্ষা করেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক নির্দেশিকা ও শিক্ষা উপকরণ শ্রেণী পাঠদানে ব্যবহার হয় কিনা, সহপাঠ কার্যক্রম, দৈনিক সমাবেশ, কাব-কার্যক্রম, স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম প্রভৃতি নিয়মিতভাবে হয় কিনা তা পরীক্ষা করেন। শিক্ষকগণ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে লব্ধ জ্ঞানের আলোকে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করেন কি না, ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরী করে মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস নেন কি না তা পরিদর্শক পর্যবেক্ষন করেন। এছাড়া শিশু জরীপ, শিক্ষার্থী ভর্তি, নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণী পূনরাবৃত্তি রোধ, ঝরে পড়া রোধ প্রভৃতি বিষয়ে বিদ্যালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ পরিদর্শক পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শকালে পরিদর্শকের দৃষ্টিতে আসা ত্রুটি সমূহ শিক্ষকগণের সহযোগিতায় দূরীভূত করার ব্যবস্থা করেন, সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করেন এবং শিক্ষকগণের সাথে আলোচনাক্রমে সমাধানের পথ উদ্ভাবন করেন। এছাড়া স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষক-অভিভাবক সমিতির সদস্যগনের সহিত আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সমগ্র বিদ্যালয়ের পরিবেশকে উন্নত রাখার ব্যবস্থা সহ বিদ্যালয়ের সাথে সমাজের যোগসূত্র স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের যাবতীয় উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড সহ জাতীয় দিবস উদযাপন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, শতভাগ মিড-ডেমিল বাস্তবায়ন প্রভৃতি কর্মকান্ডে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় যুব সংঘ, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। যা প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরী। প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা ব্যপকভাবে অনুভূত হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর উপজেলা পর্যায়ের সকল পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাগণকে সমন্বিত পরিদর্শন পরিকল্পনা প্রস্তুত পূবর্ক বিদ্যালয় পরিদর্শনের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এর ফলশ্রুতিতে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়মিত ভাবে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে একবার (কমপক্ষে) পরিদর্শনের আওতায় আসবে। পরিদর্শকগণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ই-মনিটরিং চালু করেছেন। প্রত্যেক পরিদর্শনকারী কর্মকর্তার পরিদর্শন তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ মুহুর্তের মধ্যে জানতে পারছেন। একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এই মুহুর্তে কোন বিদ্যালয় পরিদর্শন করছেন, ঐ বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিখন-শেখানো কার্যক্রম, যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত, পরিবেশ উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যন্ত সবাই জানতে পারছেন। এর ফলে অনিয়ম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে, আর জাতির সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছে গুনগতমানের প্রাথমিক শিক্ষা। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এস ডি জির চতুর্থ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক : মোঃ হাফিজ-আল আসাদ,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবহাটা,সাতক্ষীরা।
##