প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা


127 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা
অক্টোবর ২৭, ২০১৯ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা-২০১৯’ এর আর বাকি মাত্র ২০ দিন। আগামী ১৭ নভেম্বর থেকে সারাদেশে একযোগে এ পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। অথচ বেতন বৈষম্য নিরসনের এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনে থাকা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা তাদের দাবি ১৩ নভেম্বরের মধ্যে মানা না হলে এ পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর পরও দাবি মানা না হলে চলতি বছরের বার্ষিক পরীক্ষাও বর্জন করবেন বলে আগাম কর্মসূচি দিয়েছেন তারা। ২৩ অক্টোবর রাজধানীতে মহাসমাবেশ ডেকেও তা সফল করতে না পেরে এ ঘোষণা দেন। এ অবস্থায় যথাসময়ে এ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ অভিভাবক উদ্বিগ্ন। এ পরীক্ষায় প্রায় ২৯ লাখ ছাত্রছাত্রী অংশ নেওয়ার কথা এ বছর।

প্রাথমিক শিক্ষকরা তাদের দাবি পূরণের জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত আলটিমেটাম বেঁধে দিলেও গত তিন দিনে তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। উল্টো শিক্ষকরা এ পরীক্ষা বর্জন করলে তারা বিকল্প উপায়ে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ভাবছে। এ বিষয়ে গতকাল শনিবার সরাসরিই কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম আল হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘শিক্ষকরা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা না নিতে চাইলে আমরা বিকল্প উপায়ে পরীক্ষা নেব। পরীক্ষা যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে কোনো শঙ্কা আমি দেখি না। এর আগে একবার মাধ্যমিক শিক্ষকরা পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন, তখন তো মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঠিক সময়েই। তাহলে প্রাথমিকে কেন তা হবে না?’

সচিব জানান, সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। তাই অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন শিক্ষকদের সঙ্গে আগামীকাল সোমবার আলোচনায় বসতে পারেন। তার দপ্তর থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে আজ রোববার। সূত্র জানায়, যে বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমেছেন, সে বিষয়ে শিগগিরই নতুন করে প্রস্তাব তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে সহকারী শিক্ষকদের বেতন দুই ধাপ এগোতে পারে।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেলের দুই ধাপে বেতন পান। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ১১তম গ্রেডে ও প্রশিক্ষণবিহীনরা ১২তম গ্রেডে। নতুন প্রস্তাবে প্রধান শিক্ষকদের বেতন কেবল ১১তম গ্রেডে নির্ধারণ করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়েরও এতে সায় রয়েছে। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকরাও বেতন স্কেলের দুই ধাপে বেতন পান। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ১৪তম গ্রেডে ও প্রশিক্ষণবিহীনরা ১৫তম গ্রেডে। নতুন প্রস্তাবে যথাক্রমে ১১ ও ১২তম গ্রেডে নির্ধারণ করা হবে তাদের বেতন। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে। তাদের বেতন নির্ধারণ করা হবে ১২তম গ্রেডে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম আল হোসেন গতকাল সমকালকে বলেন, ‘অর্থ সচিবের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। তাদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা শিগগিরই শিক্ষকদের বেতন স্কেল সংশোধনের জন্য নতুন প্রস্তাব পাঠাব। শিক্ষকদের দাবি পূরণের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এটি করা হলে প্রধান শিক্ষকরা সহকারী পরিচালকও হতে পারবেন। খসড়া তৈরি হয়ে গেছে।’

সারাদেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষক কর্মরত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের মোট ১৪টি সংগঠন মিলে সম্প্রতি গঠন করেছে ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদ’। এই পরিষদের ডাকে আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

মুখে কালো কাপড় বেঁধে ক্লাস নিলেন শিক্ষকরা: এদিকে ২৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশে শিক্ষকদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও হয়রানির প্রতিবাদে গতকাল শনিবার সকাল ১১টা থেকে ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

কর্মসূচি চলাকালে নোয়াখালী সদর উপজেলার কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন নোয়াখালী সদর উপজেলা ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন। সমকালকে তিনি বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ে ১১টার সময় পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পাই, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। ঘড়িতে ১১টা ১০ মিনিট হলে তারা কালো কাপড় খুলে ফেলেন।’

শিক্ষক নেতারা যা ভাবছেন এখন: মহাসমাবেশ-পরবর্তী শিক্ষকদের এখন কী পরিকল্পনা রয়েছে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা দু-একদিনের মধ্যে আলোচনায় বসব।’ আর পরিষদের সদস্য সচিব মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘আমরা ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করব। এর মধ্যেই দাবি বাস্তবায়ন চাই। প্রতিমন্ত্রী কথা দিয়েছেন মহাসমাবেশ-পরবর্তী ১০ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করবেন এবং তিনি নিজে আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বেতন বৈষম্য নিরসন করবেন।’

ঐক্য পরিষদের প্রধান মুখপাত্র বদরুল আলম বলেন, ‘লাখো শিক্ষকের উপস্থিতিতে ২৩ অক্টোবর যে মহাসমাবেশ হওয়ার কথা ছিল, পুলিশের বাধার কারণে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে তা শেষ করতে পারিনি।’ প্রধান সমন্বয়ক আতিকুর রহমান বলেন, ‘দাবি আদায় না হলে আমরা কর্মসূচি থেকে পিছ পা হবো না।’

কুমিল্লা মহানগরের শিক্ষিকা ও সহকারী শিক্ষক সমিতির মহানগর সভাপতি লায়লা নুর পিংকী বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি এই দেখে যে, পুলিশের পুরুষ সদস্যরাও আমাদের নারী শিক্ষকদের আঘাত ও খারাপ ভাষায় গালাগাল করেছে। অথচ আমরা তাদের সন্তানদেরও পরম যত্নের সঙ্গে লেখাপড়া শেখাই।’

সমস্যার মূলে যা আছে: প্রধান শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে ও সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে বেতন চান। অথচ সরকার তা দিতে রাজি নয়।

এর আগে গত ২৯ জুলাই এই শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর এক প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর তা নাকচ করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর সারাদেশের শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে পরীক্ষা বর্জনসহ এই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।