প্লট মিন্নিরই তৈরি


328 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
প্লট মিন্নিরই তৈরি
অক্টোবর ১, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

পর্যবেক্ষণ

অনলাইন ডেস্ক ::

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামিদের বর্বরতা ও নির্মমতা মধ্যযুগীয় কায়দাকেও হার মানিয়েছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে তাদের অনুসরণ করে অন্য যুবকরাও ধ্বংসের পথে যাবে। এই আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। তারই পরিকল্পনায় রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বুধবার এই হত্যা মামলার রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, হত্যাকাণ্ডটি জঘন্য ও ন্যক্কারজনক। ঘটনার সময় মিন্নি তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছেন সিমপ্যাথি (সহমর্মিতা) আদায়ের কৌশল হিসেবে- এটা প্রতীয়মান। কোপানোর সময় রিফাতকে রক্ষার চেয়ে নয়ন বন্ডকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মজিবুল হক বলেন, মামলায় বিচারক তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, মিন্নির পরিকল্পনায় এবং তার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হত্যার আগে মিন্নি মামলার মূল আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে এক মাসে ৪৪ বার এবং নয়ন বন্ড মিন্নির সঙ্গে ১৬ বার ফোনে কথা বলেছেন। এ ছাড়া অসংখ্যবার খুদে বার্তা চালাচালি করেছেন।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, পাঁচজনের সহযোগী হিসেবে হত্যায় অংশ নিয়েছেন মিন্নি। একই সঙ্গে তারা সবাই রিফাতের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এ জন্য কলেজগেটের সামনে সময়ক্ষেপণ করেন মিন্নি। রিফাতকে যখন মারার জন্য আসামিরা নিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বাভাবিক ছিলেন মিন্নি। এতেই প্রমাণিত হয়, মিন্নি হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তারই পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ জন্য তাকেও ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে স্বামীকে হত্যার প্লটে মিন্নির জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। এতে মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হলেন মিন্নি।
গত বছর রিফাত শরীফ হত্যার পর তার বাবা পুত্রবধূ মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ তুললে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। তখনও স্বামীর হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ছিলেন মিন্নি। অবশ্য রিফাত শরীফের বাবাসহ স্বজনরা মিন্নিকে সন্দেহের বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে ১৩ জুলাই রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবি করেন। অভিযোগের ফলে আলোচিত হত্যা মামলাটির নাটকীয় মোড় নেয়। শ্বশুরের সংবাদ সম্মেলনের পরদিন মিন্নি তার বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। মিন্নি বলেন, ‘০০৭ গ্রুপ’ নামে যারা বরগুনায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছেন, তারা খুব ক্ষমতাবান ও অর্থশালী। এই প্রভাবশালীরা বিচারের আওতার বাইরে থাকার জন্য তার শ্বশুরকে চাপ সৃষ্টি করে সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং রিফাত হত্যার বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে। তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মিন্নি।
১৯ জুলাই হেফাজতে নিয়ে মিন্নিকে ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে রিফাত শরীফ হত্যায় মিন্নির সংশ্নিষ্টতা পায় পুলিশ। এরপর ওই দিন রাত ৯টায় স্বামী হত্যা মামলায় মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে ১৪ জুলাই হত্যাকাণ্ডের ৬ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয়ের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রিফাত শরীফ হত্যায় মিন্নির সংশ্নিষ্টতার কথা উঠে আসে। মিন্নিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তদন্তে রিফাত শরীফ হত্যায় স্ত্রী মিন্নির জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। মূল আসামি নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মিন্নি পরিকল্পিভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন। ঘটনার দিন নয়ন বন্ডদের বাড়িতে গিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন মিন্নি। পুলিশের হাতে আসা একটি ফুটেজে দেখা যায়- মিন্নি তার স্বামী রিফাত শরীফকে রক্ষার চেষ্টা করেন। তবে নয়নকে জাপটে ধরলেও মিন্নিকে কেউ কোনো আঘাত করেনি। পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নয়নকে জাপটে ধরেছিলেন মিন্নি, যাতে উপস্থিত লোকজন তার সম্পৃক্ত থাকার কথা বুঝতে না পারে। রিফাত শরীফকে বিয়ের আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিলেন মিন্নি। নয়ন বন্ড স্বামী থাকা অবস্থাতেই রিফাত শরীফকে বিয়ে করেছিলেন।
২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ন কবির ১২৩২ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন আদালতে। এর মধ্যে ৩২ পৃষ্ঠাজুড়ে ছিল মিন্নির কর্মকাণ্ডের বর্ণনা। হত্যার পরিকল্পনা কেন, কোথায় কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, হত্যার আগে-পরে মিন্নির ভূমিকা সম্পর্কেও বর্ণনা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়- রিফাত শরীফ হত্যার মূল কারণ নয়ন বন্ডের জন্মদিনে মিন্নির অংশ নেওয়া এবং নয়নের মুখে মিন্নির মিষ্টি তুলে দেওয়া। মিষ্টি খাওয়ার দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ভিডিও দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন রিফাত শরীফ। হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে মিন্নিকে নিয়ে নয়ন বন্ড ও নিহত রিফাত শরীফের দ্বন্দ্বের উল্লেখ করা হয়েছে। আর এতেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নয়ন বন্ড ও তার সঙ্গীরা। মিন্নিকে অভিযোগপত্রে ৭ নম্বর অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্রে মিন্নির অপরাধ বর্ণনায় বলা হয়- ঘটনার পর মিন্নি রক্তাক্ত রিফাত শরীফকে হাসপাতালে না নিয়ে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ ও জুতা খোঁজায় ব্যস্ত ছিলেন। অভিযোগপত্রে নয়ন বন্ড ও তার বাহিনী ০০৭-এর নানা অপরাধ ও মাদক বাণিজ্যের উল্লেখ ছিল। রিফাত হত্যার পরিকল্পনায় কে কীভাবে যুক্ত হবেন- এসব নির্দেশনা বন্ডের মেসেঞ্জার গ্রুপে আগে থেকেই দেওয়া ছিল।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন শুরু থেকেই তার মেয়েকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রভাবশালী মহলের কারসাজি বলে দাবি করে আসছেন। এরপর নিম্ন আদালতে কয়েক দফা জামিন আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর উচ্চ আদালতে মিন্নির পক্ষে জামিন আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না। গত বছরের ২৯ আগস্ট বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নিকে জামিন দেন। জামিন আদেশে বলা হয়েছিল, মিন্নি তার বাবার জিম্মায় থাকবেন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। গতকাল হলো আলোচিত এ হত্যা মামলার রায়। রায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়ার পর মিন্নিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।