ফুটবলের মহারণে লাতিন আর ইউরোপ


99 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ফুটবলের মহারণে লাতিন আর ইউরোপ
ডিসেম্বর ৯, ২০২২ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

আগের রাতে শিশিরের মতো কয়েক ফোঁটা বালুর গায়ে এসে মিশেছে। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে সেটাই নাকি আরাধ্যের ‘মরুর বৃষ্টি’! শুভদিনের আগেই নাকি কেবল বৃষ্টিমুখ দেখা যায়। তাহলে কি আজ কাতারে বিশ্বকাপেরই শুভদিন হতে যাচ্ছে! কিন্তু তা হয় কীভাবে- রাতে গায়ে গায়ে দুই কিলোভোল্টেজের ম্যাচ। শুরুতে ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া, তারপর আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস। নকআউটের মঞ্চ তো রীতিমতো বক্সিংয়ের রিং হয়ে আছে। সেখানে হৃদয়ের ক্ষরণ হবে না, ভালোবাসার বাড়াবাড়ি হবে না- তা কি সম্ভব! গতকাল সকাল থেকেই তো দুই দলের সমর্থকরা রীতিমতো শহর দখলে নেমেছে, ফ্যানজোনে বাড়তি পুলিশ দেওয়া হয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও মেট্রো স্টেশনের সামনেও কড়া নজর। নেইমার-মেসিদের ভাগ্যলিপি লেখার রাতে যেন ফুটবলের ছায়া পড়তে যাচ্ছে পৃথিবীর গায়ে- আজ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সেই ‘ফুটবল গ্রহণ’ চলবে। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালে সেই গ্রহণের সময় আরও ৪৫ মিনিট বাড়তে পারে। দোহার লুসাইল আর এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম থেকে খালি চোখে সেই গ্রহণ দেখা গেলেও বাংলাদেশ থেকে শুধুই টেলিভিশন আর মোবাইল অ্যাপেই দেখা যাবে তা। দুটি ম্যাচে কোন দল শক্তিশালী? নেইমারদের রুখে দেওয়ার সাধ্যি কি আছে ক্রোয়েশিয়ার? মেসিদের কি আটকাতে পারবে নেদারল্যান্ডস? এ নিয়ে ফেসবুক, মহল্লায় যুক্তিতর্ক-কুতর্ক যেমন আছে, তেমনি এ দুটি ম্যাচ নিয়ে পশ্চিমা বাজারের বেটিং সাইটেও অনেক ধরনের প্রেডিকশন রয়েছে। তবে কিনা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এসে প্রতিপক্ষ কাউকেই তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার তর্কে বোধ হয় কেউই যাবে না। বরং ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে দলগুলোর ক্যাম্পের পরিবেশ আর ট্রেনিং দেখে কিছুটা পূর্বাভাস মিলতে পারে।

টাইব্রেকারে যেতে চাইছে না ব্রাজিল

কাতারে আসার পর প্রতিদিনই ব্রাজিলের ম্যাচ শেষে দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে ব্রাজিলিয়ান এক চ্যানেলের অনুষ্ঠান সঞ্চালন করছেন রোনালদো নাজেরিও। এর বাইরে প্রায়ই ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগোর মোবাইলে টেক্সট পাঠিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। তেমনই টেক্সট পেয়েছেন কাল দানিলোও। কী লিখেছেন তাঁকে রোনালদো? জানতে চেয়েছিলেন এক ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক। ‘তাঁর খেলা দেখেই বড় হয়েছি, যখন ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দেশের পতাকা নিয়ে মিছিল করেছি। তাঁর অনুপ্রেরণামূলক বার্তা আমাদের আরও সাহস জুগিয়েছে।’ আজও যে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই সাহস নিয়েই মাঠে নামবে ব্রাজিল দল, সে কথা বলতে দ্বিধা ছিল না দানিলোর। কিন্তু ক্রোয়াটদের এই দলটির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। নকআউট পর্বের পেনাল্টিতে তাদের নার্ভ বেশ শক্ত। শেষ আটটি গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচে তারা সাতটি জিতেছে টাইব্রেকারে। সর্বশেষ প্রি-কোয়ার্টারেই জাপানকে হারিয়েছে তারা টাইব্রেকারে গিয়ে। গত বিশ্বকাপেও তারা ডেনমার্ক, রাশিয়া আর ইংল্যান্ডকে নকআউট পাঞ্চ বসিয়েছিল পেনাল্টিতে। সে তথ্য হাতে নিয়েই সতর্ক তিতে, ‘আমাদের লক্ষ্যই থাকবে ম্যাচের শুরুতে গোল করা। তাহলে বাকিটা সময় চাপমুক্ত হয়েই খেলা যাবে। আমরা কিছুতেই চাইব না ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াক।’ তিতের কথা শুনে উপস্থিত এক ব্রাজিলিয়ানের প্রশ্ন- তাহলে কি আমরা নিজেদের খেলার স্টাইল থেকে বেরিয়ে আসব? প্রশ্নের ধরনটি বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল তিতের। আসলে ক্রোয়াটদের নিয়ে এতটা সম্মান দেখানোয় বোধ হয় ওই সাংবাদিকের অহমে লেগেছিল। ‘প্রতিপক্ষ কেমন, পরিস্থিতি কেমন- তা নিয়েই আমাকে কৌশল সাজাতে হয়।’ দানিলোও ব্যাপারটি পরিস্কার করেছিলেন এভাবে, ‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা ভার্সেটাইল। তাঁরা যে কোনো প্রতিপক্ষের সামনে, যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের বদলে নিতে পারে। আর এটাই তো ব্রাজিল ফুটবলের সৌন্দর্য।’ ক্রোয়াটদের নিয়ে সতর্ক থাকার কারণও রয়েছে। ক্রোয়েশিয়ায় ব্রজোভিচ, কোভোভিচ আর লুকা মডরিচের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার রয়েছেন। তাঁদের গতি আর ক্ষিপ্রতা প্রতিপক্ষের কাছে আতঙ্কের মতো। জাপানের সঙ্গে ম্যাচটিতে ১৬.৭ কিলোমিটার দৌড়েছেন ব্রজোভিচ! যা কিনা বিশ্বকাপের ইতিহাসেই কোনো ফুটবলারের সবচেয়ে বেশি মাঠ কভার করার রেকর্ড। চার বছর আগে তিনি নিজেই ইংল্যান্ডের সঙ্গে এই রেকর্ড গড়েছিলেন। তা ছাড়া ক্রোয়াটদের ডিফেন্সও বেশ শক্তিশালী। তারা যে কোনো মূল্যে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নিতে চাইবে। ক্রোয়াট কোচ দালিচও জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা তৈরি। ‘বিশ্বকাপের সেরা দল তারা। তবে আমরাও তৈরি। ব্রাজিল কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। বলছি না ম্যাচটি ফিফটি ফিফটি হবে। বলতে চাচ্ছি, আমরা ম্যাচটি জেতার জন্যই নামব।’

তবে যে দলের সামনে নেইমার, রিচার্লিসন, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ক্যাসিমিরো, রাফিনহা থাকবেন- তাঁরা নিশ্চয়ই মুখের কথায় ম্যাচ জিতে যাবে না। ছন্দে থাকা ব্রাজিল ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ঠিক আগের ম্যাচেই টের পেয়েছে সুইজারল্যান্ড।

মেসিকে চাপমুক্ত রাখার কৌশল আর্জেন্টিনার

ব্রাজিল- ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের রেজাল্ট কী হতে পারে? আর্জেন্টিনার কোনো সমর্থকের কাছে প্রশ্নটি করলে হয়তো জানা উত্তরটিই মিলত; কিন্তু আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনি নিশ্চয়ই সেই পথে হাঁটবেন না। ‘ওই ম্যাচে কী হবে, সেটা আমি বলতে পারব না। আমি এখানে এসেছি আর্জেন্টিনার সঙ্গে নেদারল্যান্ডস ম্যাচের কথা বলতে।’ সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজেকে ধরা দেন স্কালোনি। প্রতিপক্ষের ‘টোটাল ফুটবল’ সম্পর্কে অবহিত থেকেই ঘোষণা দেন, তাঁর দল তৈরি যে কোনো ধরনের ডাচ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার। ‘কোয়ার্টার ফাইনালের আটটি দলই বিশ্বকাপ জয়ের দাবি রাখে। এখানে এসে কে ফেভারিট- সেটা বলা যায় না। নেদারল্যান্ডস চাইবে, আমাদের আক্রমণভাগকে আটকে দিয়ে ডিফেন্স ভাঙতে। তাদের সেই শক্তি রয়েছে। তবে আমরাও তৈরি।’ বার্সার হয়ে খেলা নেদারল্যান্ডসের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্ক ডি জং, ডিফেন্ডার ভার্জিন ফন ডাইক, জুরিন টিম্বারের মতো খেলোয়াড় রয়েছেন; যাঁরা কিনা মেসিকে মার্ক করেই খেলবেন আজ। ‘মেসিকে প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ মার্ক করে থাকে। তবে আমরাও তৈরি। আমরা সেভাবে কৌশল সাজাব, যাতে করে ম্যান মার্কিং ভাঙতে সমস্যা না হয়।’ স্কালোনির কথায় আত্মবিশ্বাসের সুর উপস্থিত আর্জেন্টাইনদের খুব বেশি আশ্বস্ত বোধ হয় করতে পারেনি। পাল্টা একটি প্রশ্ন ছিল? আর্জেন্টিনা দলের পেনাল্টি নেওয়ার পাঁচজনকে তৈরি রেখেছেন কি? উত্তরে স্কালোনির সুর খানিক চড়া। ‘আগে তো ম্যাচটি ১২০ মিনিট যেতে হবে, তারপর না হয় টাইব্রেকারের প্রশ্ন আসবে। আমরা সে পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ে যেতে দেব না।’ বোঝাই যায়, পেনাল্টি শুটআউটে দুর্বলতা রয়েছে মেসিদের।

এমনিতে জার্মানির পরই নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার মুখোমুখি হতে হয়েছে আর্জেন্টিনার। যার দুটি করে জয় আর দুটিতে ড্র। ২০০৬ বিশ্বকাপেই শুধু গোলশূন্য ড্র হয়েছিল দুটি দলের। তা ছাড়া প্রতিপক্ষ শিবিরে রয়েছেন লুইস ফন গালের মতো অভিজ্ঞ কোচ, যিনি কিনা ছক বদলে খেলানোর জন্য বিখ্যাত। এই বিশ্বকাপেও ৩-৫-২ এর টোটাল ফুটবল খেলিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, সেনেগাল, ইকুয়েডর, বেলজিয়াম আর পোল্যান্ড- কারও কাছেই হারেনি নেদারল্যান্ডস। গোল পাচ্ছেন কোডি গ্যাকপো। এই দল নিয়ে তাই সতর্ক থাকতেই হচ্ছে স্কালোনিকে। সেই সঙ্গে স্কোয়াড সাজাতেও মাথা ঘামাতে হচ্ছে একটু বেশিই। কেননা ডি মারিয়া আর ডি পলের চোটের খবর আর চাপা রাখতে পারেননি তিনি। এ দু’জনকে কি আজ শুরুর একাদশে দেখা যাবে? বারবার এই উত্তর জানতে চাচ্ছিলেন আর্জেন্টাইন সাংবাদিকরা। আর বারবারই তিনি বলছিলেন, ‘আমরা ক্লোজড ডোর অনুশীলন করেছি। সেখানে আপনারা কীভাবে জানলেন যে ওরা অনুশীলন করেনি! ওরা ফিট আছে। প্রয়োজনে অবশ্যই খেলবে।’ ডি মারিয়া ফিরলে আজ তাঁর সামনে জুলিয়ান আলভারেজ আর পাশে মেসিকে রেখেই ছক সাজাবে আর্জেন্টিনা। তবে তাদের কোচ মনে করিয়ে দিয়েছেন, ডাচ আক্রমণের সামনে ডিফেন্সও জোরালো করতে হবে।