বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আজ


425 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আজ
মার্চ ১৭, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
‘তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/ হৃদয়ে লাগিল দোলা_/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার, সকল দুয়ার খোলা_/ কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি :/ এবারের সংগ্রাম

আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’_ আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যম তাই গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপানো এই কবিকে আখ্যায়িত করেছিল ‘রাজনীতির কবি’ (পোয়েট অব পলিটিক্স) হিসেবে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তিনি, কোটি কোটি বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি, তখন আরও দেব’ বলে। দিয়েছিলেন মুক্তি ও স্বাধীনতা; দিয়েছিলেন নতুন এক রাষ্ট্র। আজ ১৭ মার্চ সেই মহান মানুষটি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে তার জন্ম। গোটা জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবে স্বাধীন রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা পরিচয়ের রূপকার বঙ্গবন্ধুকে। তার জন্মদিন উদযাপিত হবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। জাতি এ দিনটিকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদযাপন করে থাকে। এ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারি ছুটিও থাকছে এ দিবসে।

জাতির পিতার জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে জাতির পিতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার শপথ নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন অসামান্য গৌরবের। স্কুলজীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। কৈশোরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৪০ সালে তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) পড়ার সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সানি্নধ্যে আসেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তিনি ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠনে উদ্যোগী ও সক্রিয় ভূমিকা রাখার ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠনের পর দলটির যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রয়াসে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এ দলের নাম রাখা হয় ‘আওয়ামী লীগ’।

বঙ্গবন্ধু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আটান্নর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বারবার কারাগারেও যেতে হয় তাকে। আওয়ামী লীগপ্রধান হিসেবে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন তিনি। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নামে আগরতলা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠান। ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতি তাকে মুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এ বিজয়কে মেনে নেয়নি। এ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন_ ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১৫ আগস্টের কালরাতে নিজ বাসভবনে এক সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন তিনি। এভাবে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জীবনাবসান ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে পাঁচ জনের ফাঁসির রায় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাসের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে।

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য বঙ্গবন্ধু সারাবিশ্বে সমাদৃত। এসব ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া বিবিসির এক জরিপে বঙ্গবন্ধু সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন।

দিনের কর্মসূচি :দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। তিন বাহিনীর চৌকস দল এ সময় গার্ড অব অনার দেবে। শেখ হাসিনা পরে সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের পাবলিক প্লাজায় গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও গোপালগঞ্জ শিশু একাডেমি আয়োজিত শিশু সমাবেশ, গ্রন্থমেলা, আলোচনা সভা, সেলাই মেশিন বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন। পরে একই স্থানে ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে আলোকচিত্র পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করা হবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন মসজিদে পবিত্র কোরআনখানি, মোনাজাত, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা সভা হবে। সারাদেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে।

তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করবে। সারাদেশে জেলা ও উপজেলা সদরেও রয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ দু’দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতি ও ১০টায় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। আগামীকাল শনিবার বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে সকাল ১০টায় জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিএফইউজে ও ডিইউজের যৌথ উদ্যোগে বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনও আজ পালন করবে বিভিন্ন কর্মসূচি।